E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: জীবনের সঙ্গীত

স্বাদে ও মৌলিক ভাবনায় মনোমুগ্ধকর বেশ কিছু ছোট গল্পও লিখেছেন শংকর। পদ্মপাতায় জল, যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ বা এক দুই তিন গ্রন্থে সঙ্কলিত গল্পগুলি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। নাটকীয় পরিসমাপ্তিসম্পন্ন পুরোহিত দর্পণ তাঁর একটি অনন্য গল্প।

শেষ আপডেট: ২৯ মার্চ ২০২৬ ০৫:৫৩

উত্তর-সম্পাদকীয় প্রয়াণলেখ ‘শ্রীমণিশংকর মুখোপাধ্যায় (১৯৩৩-২০২৬)’ (২১-২), একই দিনে প্রকাশিত শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘পাঠকের প্রতি দায়বদ্ধতা ছিল দেখার মতো’ ও যশোধরা রায়চৌধুরীর ‘স্বতন্ত্র জগতের খোঁজ’ শীর্ষক প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা।এ-কথা ঠিকই যে, জীবন ও জগতের অভিজ্ঞতাজাত লেখনীই শংকরের কথাসাহিত্যের প্রাণ। তিনি কংক্রিটের জঞ্জালে শুনিয়েছেন জীবনের গান। ইটের পাঁজরে সঞ্চিত শোষণ, যন্ত্রণা, বেদনা ও আনন্দ— সবই তাঁর নিপুণ বিশ্লেষণী দক্ষতায় প্রাণ পেয়েছে। আসলে বিচিত্র ও চমকপ্রদ অভিজ্ঞতা, নানা রকম নরনারী এবং তাদের ঘিরে স্মৃতিরঞ্জিত আলেখ্য— এই সবই তাঁকে জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছে দিয়েছিল। তিনি উন্মোচন করেছিলেন একের পর এক নতুন দিগন্ত।

তাঁর লেখনীতে ধরা পড়েছে মধ্যবিত্তের নৈতিক বিচ্যুতি, আত্মকেন্দ্রিকতা, অধোগতি, বেকারত্বজনিত হতাশা, অন্তর্দহন ও উদ্‌ভ্রান্তির ছবি। নৈতিক ভালমন্দকে বিসর্জন দিয়ে উচ্চাশা পূরণের বিবেকবর্জিত কাহিনি সীমাবদ্ধ আজও সমান প্রাসঙ্গিক। বুদ্ধিজীবী সমাজের অন্যায়ের সঙ্গে গোপন আপসের জ্বলন্ত দলিল হিসাবেও সীমাবদ্ধ-র সাফল্য প্রশ্নাতীত। চৌরঙ্গী, জন-অরণ্য বা সীমাবদ্ধ-র পাশাপাশি শংকর লিখেছেন স্বাধীনতা-পরবর্তী স্বল্পবিত্ত মানুষের জীবনসংগ্রামের কথাও— যেখানে শুধু তথ্য নয়, তিনি পৌঁছেছেন মানবিক অনুভূতির গভীরতর স্তরে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর অসহায়তার হৃদয়বিদারক কাহিনি উঠে এসেছে নগরনন্দিনী ও সীমান্ত সংবাদ-এ। আত্মমর্যাদা ও আত্মপ্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে যেখানে হেরে যায় অনুপমা, পারমিতারা।

স্বাদে ও মৌলিক ভাবনায় মনোমুগ্ধকর বেশ কিছু ছোট গল্পও লিখেছেন শংকর। পদ্মপাতায় জল, যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ বা এক দুই তিন গ্রন্থে সঙ্কলিত গল্পগুলি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। নাটকীয় পরিসমাপ্তিসম্পন্ন পুরোহিত দর্পণ তাঁর একটি অনন্য গল্প। ভুললে চলবে না, শংকর অসংখ্য ছোট রম্যরচনারও খ্যাতিমান লেখক। এক ব্যাগ শংকর কিংবা শিশুদের জন্য তাঁর নানা আয়োজন পাঠককে সমান ভাবে আকৃষ্ট করেছে। জানা দেশ অজানা কথা, মানব সাগর তীরে— এই ভ্রমণসাহিত্যও তাঁরই সৃষ্টি।

শেষ পর্বে ডুব দিয়েছিলেন রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের জীবনামৃতেও, সেখান থেকেও তুলে এনেছেন খাঁটি সোনা। রেখে গেলেন গভীর শূন্যতা।

সুদেব মাল, তিসা, হুগলি

কালোত্তীর্ণ

বাংলা সাহিত্যে জনপ্রিয় লেখক বলতেই যে ক’টি নাম উচ্চারিত হয়, তার মধ্যে শংকর অবশ্যই অন্যতম। সে দিক থেকে ৯২ বছরে তাঁর চলে যাওয়া এক বড় ক্ষতি। তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল অতুলনীয়। জীবদ্দশাতেই সেই বিপুল জনপ্রিয়তা ঈর্ষণীয়, সমালোচনাকেও স্বাগত জানিয়েছেন। এমনিতেই শিল্প-সাহিত্যে জনপ্রিয়তাকে উচ্চ মূল্য দেওয়া হয় না; বরং তাকে অনেক সময় বিরূপ দৃষ্টিতেই দেখা হয়। শংকরের ক্ষেত্রেও এই প্রবণতা লক্ষণীয়। তাঁর উপন্যাস অবলম্বনে সত্যজিৎ রায়ের মতো মহান পরিচালকের চলচ্চিত্র নির্মিত হলেও, তা তাঁকে বাংলা সাহিত্যের উচ্চাসনে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি; প্রাতিষ্ঠানিক সাহিত্য-আলোচনাতেও সে ভাবে সাড়া মেলেনি। অথচ পাঠকমহলে তাঁর জনপ্রিয়তা ক্রমশ বেড়েই চলেছে।

তাঁর বই এক ব্যাগ শংকর শুধু উপহার হিসাবেই বিপুল সমাদর লাভ করেছে। শুধু জনপ্রিয়তা অর্জনই নয়, তাকে ধরে রাখা আরও কঠিন— সে পরীক্ষাতেও শংকর নিজের স্বকীয় প্রতিভায় অনায়াসে উত্তীর্ণ হয়েছেন। বহু জনপ্রিয় লেখকই জীবিত কালেই বিস্মৃতির আড়ালে চলে যান; সেখানে শংকর আজীবন জনপ্রিয় থেকেছেন, যেন রাজার মতোই বিদায় নিয়েছেন।

অন্য দিকে, তাঁর আসল নাম মণিশংকর মুখোপাধ্যায়। তাকে ছেঁটে এমন ছোট করে নেওয়ার দৃষ্টান্তও বিরল। বিপুল জনপ্রিয়তাই তাঁর প্রকট অস্তিত্বের সাক্ষ্য বহন করে। এ বার নিশ্চয়ই শংকরকে নতুন করে আবিষ্কারের পথ চলা শুরু হবে।

স্বপনকুমার মণ্ডল, পুরুলিয়া

হৃদয়ে থাকবে

বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, আমাদের প্রিয় সাহিত্যিক শংকর চলে গেলেন। তাঁর প্রয়াণ শুধু এক জন লেখক-জীবনেরই নয়, এক যুগের অবসান। শংকর মানেই শহর কলকাতার অন্তরাত্মার কণ্ঠস্বর। তাঁর অমর সৃষ্টি চৌরঙ্গী আমাদের শিখিয়েছে, একটি শহর কেবল ইট-কাঠ-পাথরের সমষ্টি নয়— সেখানে আছে অসংখ্য অজানা মানুষ, অগণিত স্বপ্নভঙ্গ, অপ্রকাশিত প্রেম আর গভীর বেদনার ইতিহাস। শাহজাহান হোটেলের আলো-আঁধারিতে তিনি যে চরিত্রদের জীবন্ত করে তুলেছিলেন, তারা আজও আমাদের হৃদয়ে স্পন্দিত।

আবার কত অজানারে-তে তিনি সাধারণ মানুষের সংগ্রাম, অপমান, আত্মমর্যাদা ও জয়ের কাহিনি এমন ভাবে তুলে ধরেছেন, যা আমাদের নিজের জীবনকেই নতুন করে চিনতে শেখায়। তাঁর ভাষা ছিল সহজ অথচ তীক্ষ্ণ; আবেগময় অথচ সংযত। তিনি কাঁদাতে জানতেন, আবার আশার আলোও দেখাতে জানতেন।

সীমাবদ্ধ-তে তিনি কর্পোরেট জগতের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও নৈতিক সঙ্কটের নির্মম বাস্তবতা উন্মোচন করেছেন। জন-অরণ্য-এ শহুরে যুবকের বেকারত্ব, হতাশা ও সমাজের জটিলতা গভীর মানবিক বোধে চিত্রিত হয়েছে। আবার নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি-তে বিজ্ঞান, আদর্শ ও মানবিক টানাপড়েন এক অনন্য মাত্রা পেয়েছে। তাঁর বহু রচনা চলচ্চিত্রে রূপ পেয়েছে— বিশেষ করে চৌরঙ্গী, সীমাবদ্ধ ও জন-অরণ্য— যা নতুন প্রজন্মের কাছেও তাঁকে পরিচিত করেছে।

তাঁর প্রয়াণে বাংলা সাহিত্য শোকাহত, কিন্তু তাঁর কলমের আলো নিবে যায়নি। বইয়ের পাতায় পাতায় তিনি বেঁচে থাকবেন, পাঠকের হৃদয়ে জেগে থাকবেন। নতুন প্রজন্ম যখন আবার চৌরঙ্গী খুলবে, তখন তারা শুধু একটি উপন্যাস পড়বে না; তারা অনুভব করবে এক সময়, এক সমাজ, এক হৃদয়ের স্পন্দন।

শংকর আমাদের শিখিয়েছেন— জীবন যতই কঠিন হোক, মানুষের স্বপ্ন কখনও মরে না।

সুশান্ত রায়চৌধুরী, কলকাতা-৭৮

চিত্তমুক্তির দূত

ঈশিতা ভাদুড়ীর লেখা ‘এক সেরা নারীবাদী বাঙালিনি’ (১৪-৩) প্রসঙ্গে দু’-চার কথা।

না, রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন কোথাও তাঁর নামের আগে ‘বেগম’ শব্দটি ব্যবহার করেননি। যদিও তাঁর কর্মযজ্ঞ তাঁকে সেই সম্মান এনে দিয়েছিল। “বাঙালি মুসলিম সমাজের আত্মা এবং বিবেকবুদ্ধি এমনভাবে একটি নারী-প্রতিমা রূপে প্রকাশ পাইয়াছে; একালে হিন্দু সমাজেও এমন নারী চরিত্র বিরল”— রোকেয়ার মূল্যায়ন করতে গিয়ে এই কথাগুলি বলেছিলেন কবি-সমালোচক মোহিতলাল মজুমদার। তিনি অবশ্য শামসুন নাহার মাহমুদের রোকেয়া জীবনী গ্রন্থের সমালোচনা প্রসঙ্গে উদ্ধৃতিতে ‘বেগম রোকেয়া’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু রোকেয়া তাঁর লেখা বহু পত্রের শেষে কোথাও নিজের নামের আগে ‘বেগম’ শব্দটি প্রয়োগ করেননি।

নারী শিক্ষার ইতিহাসে কলকাতায় ২১ জন ছাত্রী নিয়ে ক্যালকাটা ফিমেল স্কুল (পরে বেথুন স্কুল) প্রতিষ্ঠিত হলেও অবিভক্ত বাংলার অন্যত্র মহিলা বিদ্যালয় ছিল বিরল। এর একটি বড় কারণ, তখনও হিন্দুদের অন্দরমহল এবং মুসলমানদের জেনানামহল একই সামাজিক বাঁধনে আবদ্ধ ছিল। মুসলমান মেয়েরা আরবি ভাষায় প্রাথমিক পাঠ পর্যন্ত গেলেই বিবাহের পিঁড়িতে বসার ‘ডিগ্রি’ পেত। কৃষিনির্ভর গ্রামাঞ্চলে, বাংলা ভাষায় হোক বা আরবি-ফারসি— মেয়েদের শিক্ষার তেমন কোনও প্রচলন ছিল না। ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে কুমিল্লায় নবাব ফয়জ়ুন্নেসা চৌধুরানী এবং ১৮৯৭ সালে কলকাতায় মুর্শিদাবাদের নবাব বেগম ফেরদৌস মহল মেয়েদের জন্য বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ করেন।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর-এর সমকালীন হিন্দু সমাজে নারী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে নারী-মুক্তি আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন কামিনী রায়, স্বর্ণকুমারী দেবী, মানকুমারী বসু, সরলা দেবী চৌধুরানী-সহ একাধিক বিশিষ্ট নারী।

চিত্তমুক্তির দূত হিসাবে রোকেয়া প্রতিকূল পরিবেশে, এক ভাড়া বাড়িতে মাত্র আট জন ছাত্রী নিয়ে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন— যা পরবর্তী কালে নারীশিক্ষার ইতিহাসে এক মাইলফলক হয়ে ওঠে।

রমজান আলি, মিঠাপুকুর, পূর্ব বর্ধমান

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

manishankar mukhopadhyay Bengali Author

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy