পশ্চিমবঙ্গে বাংলা ক্যালেন্ডারের মৌলিক পরিবর্তন দরকার৷ এখন শুধু ছুটির দিনগুলি লাল রঙে চিহ্নিত করা হয়৷ নতুন ক্যালেন্ডারে শুধু কাজের দিনগুলি লাল রঙে চিহ্নিত করলে রাজ্যবাসীর সুবিধে হবে৷ দুর্গা, কালী, সরস্বতী, শীতলা, মনসা ইত্যাদি মহাতারকা দেবীরা ছাড়াও এ বছর গণেশ এবং হনুমান পুজোও বারোয়ারি হয়েছে দেখে খুশি হলাম৷ এখন আর দেবতাদের ক্ষেত্রে লিঙ্গবৈষম্য হবে না৷
এ ছাড়াও অনেক সুপার স্টার দেবদেবী আছেন যেমন ইন্দ্র, মিত্র, বরুণ, বগলা, ছিন্নমস্তা, সন্তোষী মা ইত্যাদি৷ এঁদের প্রত্যেকের জন্য একটা দিন ধার্য করা যেতে পারে৷ প্রত্যেক পুজোই উৎসবের দিন হবে৷ এর সঙ্গে ল্যাংচা, ইলিশ, ভেটকি, ফুচকা, পিঠেপুলি, নলেন গুড়, ঘুঁটে, রান্না পূজা ইত্যাদি উৎসব তো রয়েইছে৷
এ ছাড়া অত্যধিক পরিশ্রমে ক্লান্ত সরকারি কর্মচারীদের দু’মাস গ্রীষ্মের ছুটি দিতে পারা যেতে পারে৷ ক্রিসমাসে অবশ্যই দশ দিন ছুটি দিতে হবে৷ মোট ছুটি বাদ দিলে কাজের দিন দু’মাসের বেশি হবে না৷ তাও ছট পুজো, মহরম, ইদ, বুদ্ধপূর্ণিমা, মহাবীর জয়ন্তী ও মহাপুরুষদের জন্মদিন ধরলে বছরে মোট ত্রিশ দিনের বেশি কাজের দিন থাকবে না৷ এর ফলে যে লাভ হবে তা হল:
১) সারা বছর বেকার যুবকরা উৎসবে মেতে থাকবেন৷ চাকরির জন্য কলকারখানা খোলার দরকার নেই৷
২) এগারো মাস অফিস বন্ধ থাকলে বিদ্যুৎ খরচা বাঁচবে৷ অফিসে খুব কম কর্মচারী লাগবে৷ মাইনে ও পেনশন বাবদ যা ব্যয় হয় তার আশি শতাংশ সাশ্রয় হবে৷
৩) খুন, ধর্ষণ, ডাকাতি, হাসপাতালে আগুন বা ব্রিজ ভেঙে পড়া, এ সব ছোটখাটো বিষয়ে আর লোক মাথা ঘামাবে না৷
৪) যে ক’টা দিন স্কুল খোলা থাকবে তখন বিজ্ঞান বা সাহিত্য কম পড়ালেও চলবে৷ ‘গীতাঞ্জলি’র বদলে অনুরূপ আর এক কবির কাব্যগ্রন্থ অবশ্যপাঠ্য৷ ইকনমিক্সের গেম থিয়োরিতে তোলাবাজি ও সিন্ডিকেটের অর্থনীতি অবশ্যপাঠ্য হবে৷ কী পদ্ধতিতে তোলাবাজিতে সকলের ‘উইন উইন’ সিচুয়েশন হয় তা অবিলম্বে বার করতে হবে৷ আর ডারউইনের থিয়োরি নৈব নৈব চ৷ লোকটা বলে কিনা বাঁদর থেকে মানুষের উদ্ভব হয়েছে! তা হলে এত দেবদেবীর কী হবে৷ মানুষ প্রশ্ন করবে এঁরা কিসের থেকে উদ্ভব হয়েছেন! কোনও প্রশ্ন নয়৷
উপরোক্ত পদক্ষেপগুলি করলে বাংলা আবার শস্যশ্যামলা ও সোনার বাংলা হবে৷ দেশি বিদেশি বহু পর্যটক আসবেন এই স্বর্গরাজ্য দেখতে। রাজস্ব আদায় প্রচুর হবে এবং আরও বহু উৎসবের কথা ভাবা যেতে পারে৷


রাজকুমার রায়চৌধুরী
কলকাতা-৭৫

নেতাজির নামে


সম্প্রতি আজাদ হিন্দ সরকারের ৭৫ বর্ষপূর্তি উপলক্ষে লাল কেল্লায় বছরে দ্বিতীয় বার জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং নেতাজির টুপির আদল অনুকরণ করে দেশবাসীর সামনে আবারও এক চমক হাজির করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সস্তা চমকের আড়ালে সত্যের অপলাপ করার আর্ট তিনি ভালই রপ্ত করেছেন। এটা চলতে চলতে এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে সর্বজনশ্রদ্ধেয় নেতাজিকেও তার রাজনৈতিক সুবিধাবাদ চরিতার্থ করার হাতিয়ারে পরিণত করতে চাইছেন। খোদ নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নামকেও এই প্রকল্পে জড়িয়ে নেওয়ার এই রাজনীতির সামনে নীরব থাকলে অপরাধ হবে।
মোদীজি অভিযোগ করেছেন, স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতাজির অবদানকে জাতীয় কংগ্রেস উপযুক্ত স্বীকৃতি দেয়নি। প্রসঙ্গত বলতে হয়, শুধু কংগ্রেস কেন, স্বাধীনতার পর যত রাজনৈতিক দল বিভিন্ন রাজ্যে বা কেন্দ্রে দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হয়ে বসেছে, তারা কেউই নেতাজির সংগ্রামকে মর্যাদা দিয়েছে কি? মোদীজি যে বিজেপির প্রতিনিধিত্ব করেন, তাদের মাতৃপ্রতিম আরএসএস ও হিন্দু মহাসভা এই বিষয়ে কোন মেরুতে অবস্থান নিয়েছিল? আজকের সময়েও তাদের দৈনন্দিন কর্মে প্রতিফলিত সংস্কৃতির সঙ্গে নেতাজির আদর্শের কোনও মিল আছে কি?
আজ এ কথা নতুন করে অবতারণা করা নিষ্প্রয়োজন যে তাদের রাজনীতির মূল বক্তব্যই হল ধর্মের ভিত্তিতে দেশ গঠন। এ প্রসঙ্গে নেতাজির বক্তব্য কী ছিল? দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তিনি বলছেন, ‘‘ধর্মকে সম্পূর্ণরূপে রাজনীতি থেকে বাদ দেওয়া উচিত। ধর্ম ব্যক্তি বিশেষের বিষয় হওয়া উচিত, ...ধর্মীয় কিংবা অতীন্দ্রিয় বিষয়ের দ্বারা রাজনীতি পরিচালিত হওয়া উচিত নয়।’’(ক্রসরোডস)
নেতাজিকে উপযুক্ত মর্যাদা দিতে গেলে তাঁর এই বক্তব্য সর্বাগ্রে শিরোধার্য করতে হয়। মোদীজি এ কথা মানেন কি?
নেতাজি আরও বলছেন, ‘‘...হিন্দু ও মুসলমানের স্বার্থ পৃথক— এর চেয়ে মিথ্যা বাক্য আর কিছু হতে পারে না। বন্যা, দুর্ভিক্ষ, মড়ক ইত্যাদি বিপর্যয় কাউকে রেহাই দেয় না। ...হিন্দুরা ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে ‘হিন্দু রাজ’-এর ধ্বনি শোনা যায়, এগুলি সর্বৈব অলস চিন্তা।’’ মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।
আবার লক্ষ করুন, মোদীজি দাবি করেছেন নেতাজির বিশেষ নজর ছিল উত্তরপূর্বের রাজ্যগুলির প্রতি। আসলে কি তাই? ব্রিটিশকে আক্রমণের বাস্তব অবস্থা ভিত্তি করে গৃহীত একটা স্ট্র্যাটেজি দিয়ে অজ্ঞানতার অন্ধকারে নিমজ্জিত রাখা দেশবাসীকে ভোলানো সহজ, কিন্তু সচেতন মানুষ তো এত সহজে ভুলবেন না।
স্বাধীনতা সম্পর্কে নেতাজির স্পষ্ট ধারণা: ‘‘গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়গত খণ্ড চিন্তা নয়, সমগ্র জাতিকে জড়িয়েই চিন্তা করতে ও অনুভব করতে আমাদের শিখতে হবে। সামাজিক ও আর্থিক ক্ষেত্রের যে সত্যটি সম্বন্ধে আমাদের নিরক্ষর দেশবাসীর চোখ আমাদেরই খুলে দিতে হবে, তা হল— ধর্ম, জাত ও ভাষার পার্থক্য থাকলেও আর্থিক সমস্যা ও অভাব অভিযোগগুলি আমাদের সকলেরই এক। ...দারিদ্র ও বেকারি, অশিক্ষা ও রোগগ্রস্ততা, কর ও ঋণের বোঝা সব সমস্যাই হিন্দু ও মুসলমান-সহ অন্যান্য সম্প্রদায়ের জনগণকে একই ভাবে আঘাত করে এবং এগুলির সমাধানও সর্বাগ্রে রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানের উপর নির্ভর করে।’’ (ক্রসরোডস)
অর্থাৎ, স্পষ্টতই, নেতাজির কাছে উত্তরপূর্ব ভারত আলাদা কোনও সমস্যা নয়, বরং তাদেরও সমস্যার সমাধান সারা দেশের সমস্যা মোচনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত। অথচ জাতীয় নাগরিক পঞ্জির নাম করে একটা অন্যায় ও অমানবিক নীতিকে জোর করে বৈধতা দেওয়ার জন্য, উত্তরপূর্বের মানুষের ‘মিত্রোঁ’ সাজা এখন আশু দরকার। তাই নেতাজির মতো মানুষকে টেনে আনা ও তাঁর মুখে একটা মনগড়া কথা লাগিয়ে দিয়ে নিজেকে তাঁর সমতুল প্রতিপন্ন করার প্রচেষ্টা।
শ্যাম মুন্সী
সল্টলেক

উত্তরাধিকারী?


 প্রধানমন্ত্রী বললেন, নেতাজির ভাবাদর্শের প্রকৃত উত্তরাধিকারী তাঁর সরকার। যত দূর জানি, মোদী সরকার আরএসএস-এর ভাবাদর্শে চলে। আর এই আরএসএস স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় নেতাজিকে সমর্থন সহযোগিতা না করে বিরুদ্ধতাই করেছে। দু’টি কারণে।
এক) নেতাজি হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে এক জাতি গঠনের জন্য ব্রিটিশের বিরুদ্ধে লড়ছিলেন। কিন্তু আরএসএস চাইছিল শুধু হিন্দু জাতি গঠন করতে যা এখনও চাইছে।
দুই) নেতাজি সাম্প্রদায়িকতার চরম বিরোধী ছিলেন। আর আরএসএস যে কেমন উগ্র সাম্প্রদায়িক তা বর্তমান সময়কালের দিকে তাকালেই প্রমাণ পাওয়া যায়।
নেতাজি সব সময় চাইতেন, ধর্মকে রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ রূপে বাদ দিতে। তিনি মনে করতেন, রাজনীতি পরিচালিত হবে বৈজ্ঞানিক অর্থনৈতিক বিচারবুদ্ধি দ্বারা। 
আসলে মানুষকে ডাইভার্ট করতেই নেতাজি আবেগ নিয়ে মোদীজিরা এখন মাঠে নেমেছেন।


আব্দুল জলিল সরকার
বক্সীগঞ্জ, হলদিবাড়ি, কোচবিহার

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা
সম্পাদক সমীপেষু, 
৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, 
কলকাতা-৭০০০০১। 
ইমেল: letters@abp.in
যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ইমেল-এ পাঠানো হলেও।