মোহিত রায়ের লেখা ‘বাস্তবে ফেরার সময়’ (১০-১২) প্রসঙ্গে কিছু কথা। জীবাশ্ম-জ্বালানির অপরিকল্পিত ব্যবহার প্রসঙ্গে উল্লেখ করা দরকার— মানুষের স্বার্থ সুরক্ষিত করতে ইন্দিরা গান্ধীর সরকার ১৯৬৯ সালে ব্যাঙ্ক জাতীয়করণ, কয়েক বছরেই কোকিং কয়লা খনি (১৯৭১ সালে অধিগ্রহণের পর) জাতীয়করণ এবং ১৯৭৩ সালে নন-কোকিং কয়লা খনির জাতীয়করণ করে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কয়লা উত্তোলন সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকলে পরিবেশ-দূষণ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে দারিদ্র-দূষণ নিয়ন্ত্রণের কাজটাও সহজসাধ্য হয়। ইদানীং জাতীয়করণের বদলে সরকার-অধিগৃহীত সংস্থা কর্পোরেটকরণের প্রবণতাই সরকারি পরিকল্পনায় বেশি করে প্রতিফলিত হচ্ছে। বিশেষ করে ২০১৪ থেকে বেসরকারিকরণ হয়েছে প্রতিরক্ষার সরঞ্জাম, টেলিযোগাযোগ, বেসরকারি বিমান পরিষেবা, খনির মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে। এই বিপরীত পথে হাঁটার ফলে সাধারণ নাগরিকদের স্বার্থ ও সুরক্ষা প্রশ্নচিহ্নের সামনে দাঁড়িয়েছে। কর্পোরেটকরণের সঙ্গে দারিদ্র ও পরিবেশ দূষণ কিন্তু সম্পর্কহীন নয়।
প্রবন্ধকার অবশ্য শেষ পর্যন্ত পরিবেশ রক্ষায় চিনের পথে হাঁটতে পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন যে, সে-ক্ষেত্রে কাজটা করতে হবে “চিনের একনায়কতন্ত্রকে বর্জন করে”। কিন্তু একটি সর্বাত্মক ভাবে ‘টোটালিটারিয়ান’ রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামো বর্জন করে তার উন্নয়ন কাঠামো গ্রহণ করার পদ্ধতিটা তিনি ব্যাখ্যা করেননি! ভারতের উন্নয়ন কাঠামো প্রসঙ্গে বলা যায় যে, ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে ১৯৭৬ সালের ৪২তম সংশোধনী আইনের মাধ্যমে ভারতীয় সংবিধানের প্রস্তাবনায় ‘সমাজতান্ত্রিক’ এবং ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দ দু’টি সংযোজন করায় ভারত ‘সার্বভৌম সমাজতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র’-এ রূপান্তরিত হয়। এই পদক্ষেপ রাষ্ট্রীয় কল্যাণকামিতা, ধর্মীয় নিরপেক্ষতার প্রতি রাষ্ট্রের গভীর প্রতিশ্রুতি প্রতিফলিত করে, ফলে একটি সুদৃঢ় উন্নয়ন কাঠামোর পথ প্রশস্ত হয়।
জীবাশ্ম-জ্বালানির ব্যবসায় কয়েকটি ভারতীয় কর্পোরেট-এর আধিপত্য ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দে আপত্তির কারণ অনুমেয়। কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণে জীবাশ্ম-জ্বালানির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবসার সুযোগ করে দিতেই কি ‘সমাজতান্ত্রিক’ শব্দটিতেও কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকদের এ-হেন আপত্তি? বিশেষত শব্দটি কিন্তু কর্পোরেট স্বার্থবিরোধী বলে অনেকেরই ধারণা।
অনিরুদ্ধ রাহা, কলকাতা-১০
বিশাল ফাঁক
মোহিত রায়ের লেখা ‘বাস্তবে ফেরার সময়’ প্রবন্ধ প্রসঙ্গে কিছু কথা। বিশ্ব উষ্ণায়ন নিয়ে নীতি ও তার বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে বড় ফাঁকই হল মূল সমস্যা। আসলে কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আমাদের জ্বালানি-নির্ভর অর্থনীতি। ভারতে মোট শক্তির ৭০ শতাংশেরও বেশি কয়লা, তেল ও গ্যাসের উপর নির্ভরশীল। নবীকরণযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি নীতিগত দিক দিয়ে যথার্থ হলেও গ্রিড ব্যালান্সিং, শক্তি সঞ্চয়ের প্রযুক্তি এবং শক্তির সঞ্চালনের উন্নত পরিকাঠামো ছাড়া তার বাস্তবায়ন প্রায় অসম্ভব।
পরিবহণখাত দ্বিতীয় বৃহত্তম দূষণকারী। প্রতি দিন শহরে বিপুল ‘সচল ঘণ্টা’ নষ্ট হয়, যার প্রায় ৪০ শতাংশই ঘটে যানজটজনিত অদক্ষতার কারণে। গাড়ি ‘চালু-বন্ধ’ করার প্রবণতা কার্বন নিঃসরণ তিন থেকে পাঁচ গুণ বাড়ায়— এই তথ্যকে নীতিনির্ধারকেরা যথেষ্ট গুরুত্ব দেন না। গণপরিবহণের অভাব, সাইকেল চলাচলের পথ না থাকা, শহর পরিকল্পনায় হাঁটার উপযোগী পথের ঘাটতি— এ সবই পরিবহণ খাতে কার্বনের ব্যবহার না কমার কারণ। শহুরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া অপ্রতুল ভাবে ব্যবহৃত। জৈব ও অজৈব বর্জ্য পৃথক না করলে মিথেন নিঃসরণ হঠাৎ বৃদ্ধি পায়। মিথেন উষ্ণায়নের কারণ। তা কার্বন ডাইঅক্সাইডের তুলনায় ২৮-৩৬ গুণ বেশি তাপ ধারণ করে।
পরিবেশ নীতিকে সফল করতে নাগরিকের আচরণগত পরিবর্তনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনঅভ্যাস না বদলানোর কারণে ৩০-৪০ শতাংশ পরিবেশ আইন ব্যর্থ হয়। মানুষ যতক্ষণ না বিদ্যুৎ সাশ্রয়, গণপরিবহণ ব্যবহার, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, বর্জ্য আলাদা করা— এ সব অভ্যাসে পরিণত করছে, তত ক্ষণ আইন কাগজেই থেকে যাবে।
অলোক কুমার মুখোপাধ্যায়, সোদপুর, উত্তর ২৪ পরগনা
কেন দুর্ভেদ্য
যোগেন্দ্র যাদব ‘আসল লক্ষ্য বাংলা’ (৮-১২) প্রবন্ধে লিখেছেন, “...পশ্চিমবঙ্গের রয়েছে সাম্প্রদায়িক হানাহানির অতীত। এ হল বিজেপির একেবারে হোম গ্রাউন্ড...”। সেই ‘নিজস্ব জমি’কে কেন কব্জা করতে পারল না বিজেপি? কারণ, পশ্চিমবঙ্গ কখনওই তার নিজস্ব জমি নয়। সাম্প্রদায়িক হানাহানিই তো পশ্চিমবঙ্গের একমাত্র তথা সত্যিকারের অতীত নয়, তার সত্যিকারের অতীত নবজাগরণ, স্বাধীনতা আন্দোলন ও বিপ্লবী ধারা এবং দীর্ঘ বামপন্থী আন্দোলন। সাম্প্রদায়িক হানাহানিটা এই গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যের এক বিচ্যুতি।দেশভাগ দেশের সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা ছিল না।
নবজাগরণের, স্বাধীনতা আন্দোলনের এই প্রভাব বাংলার মানুষের মনে যত দিন থাকবে তত দিন গেরুয়ার বঙ্গ বিজয়ের স্বপ্ন সফল হবে না। তাই বারে বারে সেই জায়গাটিতেই আঘাত আসছে। তাই তাদের সংগঠিত প্রচার যে, বাংলাভাষীমাত্রেই বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী। বাংলা ভাষাকে ‘বাংলাদেশি ভাষা’ বলাটাও কোনও অজ্ঞতা প্রসূত নয়, একই পরিকল্পনার অঙ্গ। এর মধ্য দিয়ে যেমন মুসলিমদের আতঙ্কগ্রস্ত করা হল, তেমনই দেশ জুড়ে হিন্দুদের মধ্যেও সংখ্যালঘু হয়ে যাওয়ার আতঙ্ক তৈরি করে মুসলিমবিরোধী মানসিকতাতে ইন্ধন জোগানো গেল। আবার বাংলার মানুষের মধ্যে যে সম্প্রীতির মনটি রয়েছে সেটিতেও আঘাত করে বিভেদের জমি প্রস্তুত করা গেল। এ ভাবে বাংলার মানুষের সাম্প্রদায়িক ঐক্য নষ্ট করে হিন্দুভোটকে একত্রিত করাই হয়তো লক্ষ্য। সঙ্গে এসআইআর-এর মাধ্যমে যদি বেছে বেছে কিছু নাম বাদ দেওয়া যায় তবে তো সোনায় সোহাগা। কিন্তু ভোটে কোন দল জয়ী হবে তার থেকেও বড় কথা, গেরুয়া দলটি এই প্রচেষ্টায় জয়ী হলে বাংলার মানুষের পক্ষে দীর্ঘ সংগ্রামের সমস্ত অর্জনকে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কূপে বিসর্জন দেওয়া হবে।
সমরেন্দ্র প্রতিহার, কলকাতা-২
নির্বুদ্ধিতার বিপদ
সম্পাদকীয় ‘বর্জ্য (অ)ব্যবস্থা’ (৩-১২) পড়তে পড়তে মনে পড়ল কিছু দিন আগে প্রায় সকালেই কানে আসত গৃহস্থের সঙ্গে বর্জ্যসংগ্রাহকের উচ্চগ্রামে বাদানুবাদ। গৃহস্থরা কেউ কেউ পচনশীল ও অ-পচনশীল বর্জ্যের জন্য নির্ধারিত আলাদা রঙের বালতিতে বর্জ্য না-দেওয়ার ফলে ঝামেলায় পড়ছেন বর্জ্যগ্রাহকেরা। প্রাণপণে তাঁরা বোঝাতে চান, কর্তৃপক্ষ কেন অতিরিক্ত বালতি দিয়েছেন। দু’রকমের বর্জ্য পুনর্ব্যবহার করে পুরোপুরি কাজে লাগানোর জন্য কত রকম পরিকল্পনা নিয়েছেন কর্তৃপক্ষ। আবছা অথবা পুরোটা জেনেও এক শ্রেণির গৃহস্থ কিছুতেই সহযোগিতা করতে চান না। খেয়াল করে দেখলাম, সম্প্রতি আর বাদানুবাদ বা গোলযোগ নেই। সম্ভবত, বর্জ্যগ্রাহক ক্ষান্ত দিয়েছেন। কিছু নাগরিককে অন্তত, সচেতনতার পাঠ দেওয়া তাঁর কম্ম নয়। সচেতনে চেতনাদান আর জাগন্তকে জাগিয়ে তোলা পৃথিবীতে দুরূহতম কর্মের মধ্যে পড়ে।
ফলে বিশাল ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। জানা গেল, নগরজীবনে উৎপন্ন বর্জ্যের সিকিভাগেরও কম পরিকল্পনামাফিক প্রক্রিয়াকরণের ফলে কাজে লাগছে। বাকিটা ফেলা যাচ্ছে। বাড়তে-থাকা বর্জ্যপাহাড়ের ফলে জনস্বাস্থ্যের সমস্যা ভয়াল হয়ে উঠছে, যে কোনও সময়ে নাগরিক জীবনে অসুখ-বিসুখের বিপর্যয় নেমে আসা বিচিত্র নয়। নির্বুদ্ধিতা ও বিবেচনার অভাব তবুও ঘোচে না।
বিশ্বনাথ পাকড়াশি, শ্রীরামপুর, হুগলি
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)