E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: নির্দেশ পালন

এই মাস্টারমশাই শিক্ষকতা করতেন সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত একটি স্কুলে। নির্দিষ্ট দিনক্ষণ মেনে মাইনে পাওয়ার কোনও নিশ্চয়তা ছিল না।

শেষ আপডেট: ০৪ জুলাই ২০২৬ ০৬:৩৫

‘নৈতিকতার প্রশ্ন’ (১৬-৬) সম্পাদকীয় পড়তে পড়তে মনে পড়ল ষাটের দশকের এক জন স্কুলশিক্ষকের গল্প। শিক্ষকমশাইয়ের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে তাঁর এক জন আত্মীয় গিয়েছিলেন এক পাত্রীর বাবার কাছে। যথাযথ আপ্যায়নের পর পাত্রের পরিচয় দিয়ে সেই আত্মীয় পেশ করলেন প্রস্তাব। স্কুলের চাকরির কথা জেনে পাত্রীর বাবা জোড়হস্তে জানালেন, পাত্র মন্দ নয়। তবে একটা উপযুক্ত চাকরি পেলে যেন বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসেন।

এই মাস্টারমশাই শিক্ষকতা করতেন সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত একটি স্কুলে। নির্দিষ্ট দিনক্ষণ মেনে মাইনে পাওয়ার কোনও নিশ্চয়তা ছিল না। যখন যেমন টাকাপয়সা পাওয়া যেত, ভাগযোগ করে শিক্ষক ও অন্য শিক্ষাকর্মীদের দেওয়া হত। কাজেই তাঁকে গৃহশিক্ষকতা করতেই হত। ছাত্রদের মাসমাইনে দেওয়ার কথা থাকলেও যাদের আর্থিক অবস্থা খারাপ, তারা তা পারত না। মেধাবী অথচ গরিব পড়ুয়াদের দয়া-দাক্ষিণ্যের ব্যাপারও থাকত। টাকার লেনদেন অনিয়মিত হলেও পড়ুয়াদের গাছের কলা কি খেতের মুলোর আগমন ছিল নিয়মিত। তাতে টেনেটুনে মাস্টারমশাইয়ের সংসারটা চলে যেত। এই মাস্টারমশাইরা ছিলেন প্রকৃত বিদ্যানুরাগী। অন্তরসম্পদে ধনী। তাঁদের সাধনাই ছিল পাঠ এবং পাঠদান। গৃহিণী সকালবেলা বাজার যাওয়ার জন্য চাপ দিলে মাস্টারমশাই হামেশাই বলতেন আলু আর ডিম দিয়ে সে দিনটা কোনও মতে চালিয়ে নিতে। যোগ্য পাত্রীর বিচক্ষণ বাবাদের এত সব ভাবাদর্শ বা শিক্ষানুরাগ বুঝলে চলত না। তাই উল্লিখিত সেই পাত্রীর বাবা বিদায় জানিয়েছিলেন পাত্রের আত্মীয়কে।

সেই ছবি পাল্টে গিয়েছে আমূল। সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলে ব্যাপক পরিবর্তন আসে পরবর্তী কালে। বেতনের উন্নতি এবং নির্দিষ্ট দিনে তা দেওয়ার বন্দোবস্ত হয়। তখন থেকেই প্রশাসন নানা ভাবে চেষ্টা করেছে স্কুল এবং বাড়িতে একই পরিষেবার জন্য দু’বার অর্থ আদায় বন্ধ করতে। সেই জন্য সরকারি শিক্ষকদের গৃহশিক্ষকতা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে বার বারই নির্দেশিকা জারি হয়। কিন্তু শিক্ষকদের একাংশ তাকে অগ্রাহ্য করেন। ফলে শিক্ষায় সবার সমান অধিকার— এই নীতি মুখ থুবড়ে পড়ে। সম্পন্ন অভিভাবকেরা পড়তে পাঠান বেশির ভাগ সময় ওই স্কুলেরই শিক্ষকের কাছে। শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতীদের দিয়ে পড়ালে সবার পক্ষেই ভাল হত। কিন্তু সহজবোধ্য কারণেই তা হয় না বেশির ভাগ ক্ষেত্রে। সম্পন্ন ছাত্রদের প্রাইভেটে পড়তে যাওয়া প্রভাব বিস্তার করে আর্থিক সঙ্গতিহীনদের উপরেও। সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্নে মশগুল হয়ে তাঁরাও সেই চেষ্টায় ব্রতী হন। এই ভাবে সরকারি স্কুলশিক্ষাকে ধীরে ধীরে রক্তশূন্য করে তোলা হয়েছে।

এই প্রবণতা বন্ধ করতে সরকারের সাম্প্রতিকতম নির্দেশটি অক্ষরে অক্ষরে কার্যে রূপায়িত হোক। সরকারি ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলে শিক্ষকদের একাংশের গৃহশিক্ষকতা বন্ধ করতেই হবে। কিন্তু রোগটি পুরনো। তাই চিকিৎসা-প্রক্রিয়াতেও সময় লাগবে।

বিশ্বনাথ পাকড়াশি, শ্রীরামপুর, হুগলি

বিকল্প পথ

‘নৈতিকতার প্রশ্ন’ সম্পাদকীয়টিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক উত্থাপিত। সরকারি শিক্ষকদের গৃহশিক্ষকতা নিয়ে নৈতিক প্রশ্ন অবশ্যই আছে। কিন্তু নৈতিকতার পাশাপাশি বাস্তবের ছায়াগুলিও দেখা প্রয়োজন। গৃহশিক্ষকতা আসলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার অন্তর্নিহিত সঙ্কটের লক্ষণ। অধিকাংশ বিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত অসম। যেখানে শিক্ষকের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম, সেখানে ব্যক্তিগত পরিচর্যার সুযোগ সীমিত। অনেক ছাত্র পাঠ বুঝতে না পেরে নীরব থাকে, প্রশ্ন করতে সঙ্কোচ বোধ করে। কেউ পিছিয়ে পড়লে তাকে ধরে এগিয়ে দেওয়ার মতো সময় বা পরিকাঠামো সব ক্ষেত্রে থাকে না। ফলে অভিভাবকেরা বিকল্প পথ খোঁজেন। এখানেই জন্ম নিয়েছে এবং বাড়বাড়ন্ত হয়েছে গৃহশিক্ষকতার।

রাষ্ট্র প্রশিক্ষিত শিক্ষকের গৃহশিক্ষকতা রোধ করতে চায়। অথচ, বহু অপ্রশিক্ষিত ‘টিউটর’, অনিয়ন্ত্রিত কোচিং কেন্দ্র এবং পরীক্ষামুখী পাঠ্যক্রম অবাধে বিস্তার লাভ করছে, যাদের শিক্ষাগত প্রাসঙ্গিকতা রাষ্ট্র বিচার করেনি। অভিভাবকেরা কোচিং সেন্টারে ভিড় করছেন স্বেচ্ছায় নয়, অনেক সময় প্রয়োজনের তাগিদে। কারণ তাঁরা সন্তানের শিক্ষায় ধারাবাহিক ভাবে নজরদারি করতে পারবেন না। প্রয়োজন ছোট পরিসরের শিক্ষার পরিবেশ এবং ব্যক্তিগত সহায়তা। তাই কেবল নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সমাধান খোঁজা যথেষ্ট নয়। বিদ্যালয়ের ভিতরে পুনরাবৃত্তিমূলক পাঠদান, পরামর্শ দান, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবকের মধ্যের সংযোগকে শক্তিশালী করা জরুরি।

সায়ন কর্মকার, বাঁকুড়া

নম্বরসর্বস্ব

‘নৈতিকতার প্রশ্ন’ সম্পাদকীয়ের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। একদা এ রাজ্যে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বেতনচিত্র ছিল করুণ। বাম জমানায় সমাজের গঠনকর্তা হিসাবে তাঁদের বেতন কাঠামো ঢেলে সাজানো হয়। সমাজ গড়ার কারিগরেরা অর্থনৈতিক বিচারে তাঁদের প্রাপ্য সম্মান পেতে শুরু করেন। আজ রাজ্যের শিক্ষাঙ্গন বেসরকারি পুঁজিতে ভরপুর। স্বাভাবিক ভাবেই সমাজের এক শ্রেণির বিত্তবান মানুষের কাছে সরকারি শিক্ষার চাহিদা কমেছে। তৃণমূল জমানায় প্রায় আট হাজার স্কুলের অবলুপ্তি ঘটেছে। একদা বাম আমলে এ রাজ্যে প্রাথমিক শিক্ষার কিছু উন্নতি হয়েছিল। তার পর ক্ষমতা ও মধুর স্বাদ পেয়ে শিক্ষাব্যবস্থায় উন্নতির লক্ষ্য যখন কেন্দ্রচ্যুত হল, রাজনৈতিক লাভ বা রাজনৈতিক স্থায়িত্বই মূল লক্ষ্য হয়ে উঠল, এবং মানুষের সততা নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার চেয়ে আনুগত্য ও রাজনৈতিক সমর্থনই সরকারের কাছে প্রধান হয়ে উঠল, তখন উন্নতি অগ্রগতি বিকাশ মুখ লুকোতে শুরু করল। মহান নেতাদের অনুসরণ করে ব্যক্তিগত তহবিল বৃদ্ধির দিকেই শিক্ষক-শিক্ষিকাদের একাংশ নজর দিলেন।

পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে সরকারি, সরকারপোষিত ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলের শিক্ষকদের গৃহশিক্ষকতা নিষিদ্ধ করার নির্দেশ জারি করেছে। একদা মিত্র কমিশনের নমুনা সমীক্ষা থেকে জানা গিয়েছিল কলেজ পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদের শতকরা একাত্তর ভাগ প্রাইভেট টিউশন-নির্ভর। শিক্ষার বাজারে এই কোচিং নির্ভরতা ছড়িয়ে আছে সারা দেশেই। গৃহশিক্ষকতার একটা বিশাল চাহিদা আছে। স্কুল-কলেজে পঠনপাঠনের মানে অবনমন যদি এ চাহিদার একটি কারণ হয়, তবে পরীক্ষা-কেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় নম্বর বাড়ানোর তাগিদ অবশ্যই অপর কারণ।

নম্বর বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় স্কুলকলেজ ও কোচিং সেন্টারের মধ্যে কার অবদান বেশি, সেই হিসাব কষতে বসলে শুধুমাত্র আইন করে অভিভাবকদের আটকানো যাবে না। কারণ, চাকরির বাইরে অন্য কিছু ভাবতে অনভ্যস্ত বাঙালির কাছে এখনও বেশি নম্বরটাই জরুরি।

সঞ্জয় রায়, দানেশ শেখ লেন, হাওড়া

মুখস্থবিদ্যা

বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের মেধা ও সৃষ্টিশীলতা যাচাইয়ের বদলে কেবল মুখস্থবিদ্যায় পারদর্শী করে তুলেছে। ফলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের মৌলিক চিন্তা হারিয়ে ফেলছে। আমি দশম শ্রেণিতে পড়ি। দেখেছি, স্কুলে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে পড়ানো হলেও তাঁরা শিক্ষাকে কোন দৃষ্টিতে দেখতেন, তা সম্পর্কে বিন্দুমাত্র আলোচনা করা হয় না। আমরা চাঁদ ও অন্যান্য গ্রহে রকেট পাঠানোর কথা ভাবছি, কিন্তু সাইকেলে সামান্য কিছু ত্রুটি হলে তা বোধগম্যের সীমা অতিক্রম করে। দেখছি বিভিন্ন ওষুধ তৈরি করে জীবন দীর্ঘায়িত করার স্বপ্ন, কিন্তু হাত কেটে রক্ত পড়লে কী করা উচিত, তা বইয়ে মুখস্থবিদ্যার বাইরেই থেকে যায়।

জ্যোতিরাজ দাস, শালতোড়া, বাঁকুড়া

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Private Tutors

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy