E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: রাজাসনে অপসংস্কৃতি

গত দেড় দশক সময়কালে এই বাংলায় পুরস্কারপ্রাপকদের (বিভিন্ন ক্ষেত্রে) ভিড়ে পুরস্কারপ্রাপ্তির কারণটাই প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে।

শেষ আপডেট: ২৪ মার্চ ২০২৬ ১০:০৭

ঈশানী দত্ত রায়ের ‘সংস্কৃতির ভণ্ডামি ও ন্যাকামি’ (৩-৩) প্রবন্ধ প্রসঙ্গে কিছু কথা। ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে আমরা বাঙালিরা যে গর্ববোধ করে থাকি, সেই ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে কি আমরা আদৌ চিন্তিত ও যত্নবান? মনে হয় না। আমাদের প্রতি দিনের জীবনচর্যায় তার সাক্ষ্য তো মেলে না। যে কোনও ভাষাই সেই ভাষাভাষী মানুষের কাছে গর্বের বিষয় হওয়াই স্বাভাবিক। সেই নিয়মেই আমরা গর্বিত বোধ করি বাংলা ভাষা নিয়ে। তবে তা এখন বিশেষ একটি দিনের প্রথামাফিক কিছু কর্মসূচির মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। বহিরঙ্গে ঘাটতি না রাখলেও আন্তরিকতায় যে ঘাটতি থেকে যায়, তা আড়াল করার উপায় রাখি না আমরা। বেআব্রুই হয়ে পড়ি।

গত দেড় দশক সময়কালে এই বাংলায় পুরস্কারপ্রাপকদের (বিভিন্ন ক্ষেত্রে) ভিড়ে পুরস্কারপ্রাপ্তির কারণটাই প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। কেন পুরস্কৃত হলেন, তা বুঝতে গেলে যেন গবেষণার প্রয়োজন পড়ে। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির জগতের অভিভাবকত্বের দায়িত্ব এক সময় পালন করতেন সেই জগতের উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বরা। সত্যজিৎ রায়, শম্ভু মিত্র, তৃপ্তি মিত্র, উৎপল দত্ত, শোভা সেন, শেখর চট্টোপাধ্যায়, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, সলিল চৌধুরী, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন— এঁদের পাশাপাশি ছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, দেবব্রত বিশ্বাস, সুচিত্রা মিত্র, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সমরেশ বসু। আরও ছিলেন উত্তমকুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সুচিত্রা সেন, মাধবী মুখোপাধ্যায়, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়। নিজ নিজ শিল্পকর্মের প্রতি এঁরা এতটাই আন্তরিক ছিলেন যে দর্শক, শ্রোতা ও অনুরাগীদের মনের অন্দরমহলে ছিল এঁদের সহজ বাস। এঁরা কারও অনুগ্রহের প্রত্যাশী ছিলেন না। ধারে ও ভারে তাঁরা ছিলেন বহু যোজন এগিয়ে। এখনকার সঙ্গে সেই তুলনা চলে না। সুতরাং প্রয়োজন হলে এঁরা প্রশাসনের সমালোচনায়ও মুখর হতে পারতেন। শাসক দলের রোষকে ভয় পেতেন না। আবার কলাকুশলীদের স্বার্থরক্ষার প্রশ্নে কিংবা খরা, বন্যা বা অন্য কোনও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতেও তাঁরা দ্বিধাবোধ করেননি কখনও।

বর্তমানে যাঁরা পুরস্কারপ্রাপক, তাঁদের অনেককেই সে ভাবে সরব হতে দেখা যায় না। বাস্তবিকই আজ সংস্কৃতির ক্ষেত্রে রাজনীতির পদচারণার এক কুৎসিত প্রদর্শন চলছে। হিসাব কষে চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের নায়ক-নায়িকাদের দিয়ে লোকসভা, রাজ্যসভা বা বিধানসভার আসন ভরানোর কাজ চলছে। গণতন্ত্রে এর বৈধতা নেই— তা নয়। কিন্তু এই কথাও কি অস্বীকার করা যায় যে, আইনসভায় যেখানে সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও জীবনধারণের মৌলিক বিষয়গুলির আলোচনা প্রাধান্য পাওয়ার কথা, সেখানে তথাকথিত তারকার সমাবেশ ঘটিয়ে রাজনৈতিক আলোচনার পরিসরকে সচেতন ভাবেই সঙ্কুচিত করে দেওয়া হচ্ছে না? সুতরাং ধর্মের নামে অধর্মের অনুশীলন চলুক, সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে চলুক অপসংস্কৃতির মহড়া। পাড়ার ক্লাবে নাটকের মহড়ার প্রয়োজন নেই, বরং যেমন চলছে চলতে থাকুক বিভিন্ন অনুদানের কৃপায় বিরিয়ানি ও মাংসের মোচ্ছব, সঙ্গে দুর্গাপূজা।

অতীতে কমিউনিস্ট দলের নেতাকর্মীদের আচার-আচরণে এবং তাঁদের পত্রপত্রিকায় এক ধরনের সুশীল, সুসংস্কৃতির ছোঁয়া পাওয়া যেত। এখন সেখানেও খানিকটা হলেও যেন ভাটার টান। এও কম পরিতাপের বিষয় নয়। তবুও এ কথাটি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, এই দুঃসহ পরিস্থিতি থেকে মুক্তির আলো যদি কোথাও দেখা সম্ভব হয়, তবে তা দেখতে ও দেখাতে পারে এই বামপন্থীরাই, যদি তাঁরা সে বিষয়ে উদ্যোগী হন।

বরুণ কর, ব্যান্ডেল, হুগলি

অবক্ষয়ের মূলে

ঈশানী দত্ত রায়ের লেখা ‘সংস্কৃতির ভণ্ডামি ও ন্যাকামি’ প্রবন্ধটি পড়ে বাঙালি জাতি সম্পর্কে তাঁর পর্যবেক্ষণকে সাধুবাদ জানাই। বাঙালির অতীত গরিমা আজ শুধুই অতীত। তা নিয়ে বিলাপ আর হাহাকার হৃদয়কে শুধু ব্যথাতুর করে তোলে, কোনও সদর্থক পদক্ষেপে উদ্বুদ্ধ করে না। এত দ্রুত, এত দূরে অবনমন শুধু অবাক করে না, আমাদের শিউরে উঠতেও বাধ্য করে।

এর নিশ্চয়ই অনেক কারণ আছে। তবু কিছু প্রধান কারণের মধ্যে অন্যতম বলে মনে হয় ভিন্ন সংস্কৃতির মিশ্রণ। বাংলার পুরনো জীবনযাপনের সঙ্গে প্রভূত পরিমাণে মিশে গিয়েছে অন্যান্য প্রদেশের সম্পূর্ণ ভিন্ন জীবনচর্যা। বাঙালি সমাজের অবিন্যস্ত, অগোছালো কিন্তু হাসিমুখে জীবন কাটানোর স্বভাব এবং বাঙালি ছেলেমেয়েদের ভদ্রতা, নম্রতা ও মার্জিত ব্যবহার বদলে যেতে শুরু করল, যখন কলকাতা তথা সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে বসবাস শুরু হল বিপুল সংখ্যায় ভিন রাজ্যের মানুষের। তাঁদের জীবনযাপন ও বাঙালির যাপন যে এক নয়, ক্রমে তা স্পষ্ট হয়ে উঠল। কোথাও কোথাও এক রুক্ষ, অমার্জিত ও শালীনতাবর্জিত জীবনযাপনের ছবিও চোখে পড়তে শুরু করল। হয়তো জীবনধারণের মরিয়া প্রয়াসেই, তাঁদের সঙ্গে লড়ে নেওয়ার তাগিদে যে প্রতিযোগিতা ও ছিনিয়ে নেওয়ার সংগ্রাম তৈরি হল, তার মধ্যেও সংস্কৃতির এই অধঃপতনের কিছু কারণ লুকিয়ে থাকতে পারে।

অন্য বড় কারণ বলে মনে হয় সমাজমাধ্যমের প্রভাব। বাঙালি সমাজজীবনে যে সামান্য ভদ্রতা, সভ্যতা, লজ্জা, শালীনতা ও সম্মানবোধ ছিল, সমাজমাধ্যমে তার অনেকটাই যেন ধূলিসাৎ হয়ে গেল। বাঙালি ক্রমে ক্রমে পরিচিত হয়ে উঠল অশালীন ভাষা, অশ্লীল ছবি, নিম্নরুচির মন্তব্য এবং ব্যক্তিগত অভব্য আক্রমণের সঙ্গে। যুক্তির বিচারবোধ বা পড়াশোনালব্ধ জ্ঞানের গুরুত্ব কমে গিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াল অশিক্ষা, ব্যক্তিগত কুৎসা এবং জ্ঞানহীন মন্তব্য। সংবাদমাধ্যমেও, বিশেষত টেলিভিশনের আলোচনায়, দিনের পর দিন অশিক্ষিত ও দুর্বিনীত রাজনৈতিক নেতাদের অবাঞ্ছিত উক্তি বাঙালির সংস্কৃতির অবনমনের জন্য অনেকাংশে দায়ী। বাঙালির নির্লিপ্ত ও নিরুত্তাপ মনোভাবও আর একটি বড় কারণ। কিছুতেই যেন আর আঘাত লাগে না। এই সব কিছুর সম্মিলিত প্রভাবেই বাঙালির সংস্কৃতিতে এমন গভীর অবক্ষয়।

সুরজিৎ কুন্ডু, উত্তরপাড়া, হুগলি

বাঙালির বদল

ঈশানী দত্ত রায়ের লেখা ‘সংস্কৃতির ভণ্ডামি ও ন্যাকামি’ প্রসঙ্গে কিছু কথা। অন্য প্রদেশে বাঙালিদের যে হেনস্থা করা হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে উচ্চকিত প্রতিবাদ কোথায়? আমরা তো বাচ্চাদের বোধের সময়ে চোখ দেখিয়ে বলি ‘আই’, কলা দেখিয়ে বলি ‘ব্যানানা’। আর স্কুলে পড়ার বয়স হতেই ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করে দিই। নিজের গায়ে আঘাত না লাগা পর্যন্ত সহনাগরিকের দুঃখে কাতর হই না। অথচ বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে আমাদের গরিমার অন্ত নেই।

শিরদাঁড়া সোজা রাখা দামাল স্বাধীনতা সংগ্রামীদের উত্তরসূরি আমরা। অথচ শাসকের কাছ থেকে সম্মান বা উপাধি পেলেই শিরদাঁড়া নুইয়ে ফেলি। সাহিত্যসম্রাটকে ‘বঙ্কিমদা’ বলি, আবার পয়লা বৈশাখে সিদ্ধিদাতা গণেশকে স্মরণ না করে বিভিন্ন জায়গায় গণেশের বড় বড় মূর্তি বানিয়ে, ডিজে বাজিয়ে উদ্দাম নেচে পুজো করি। সব দেখেশুনে বলতে ইচ্ছে করে, হায় রে, সেই বাঙালি আর নাই।

শিখা সেনগুপ্ত, বিরাটি, উত্তর ২৪ পরগনা

মাঠেই স্বীকৃতি

ক্রিকেট খেলায় ‘প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ’ পুরস্কারটি সাধারণত বিজয়ী দলের কোনও খেলোয়াড়ই পেয়ে থাকেন। কিন্তু পরাজিত দলের সেরা খেলোয়াড়কে কি আলাদা কোনও পুরস্কার দেওয়া যায় না? হতে পারে সেটির নাম ‘ফাইটার অব দ্য ম্যাচ’। এতে হারলেও খেলোয়াড়ের কৃতিত্ব স্বীকৃতি পাবে।

সঞ্জীব কুমার মণ্ডল, কলকাতা-৪৯

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

parliament celebrities

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy