E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: স্কুলের ব্যাগ বড্ড ভারী

সমস্যা শুধু শরীরের নয়, মনেরও। ভারী ব্যাগের মতোই তাদের উপর পড়ার চাপও সুবিশাল। স্কুল ও টিউশন মিলিয়ে সারা দিনে খেলাধুলার সময় তারা পায় না। ছোটরা এখন আনন্দ ভুলে যাচ্ছে।

শেষ আপডেট: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৩৩

নতুন ক্লাসে ওঠার আনন্দ আর নতুন বইয়ের গন্ধে সব ছাত্রছাত্রীর মন খুশিতে ভরে ওঠে। কিন্তু ইদানীং বই ও খাতার সংখ্যা বাড়ার ফলে স্কুলের ব্যাগের ওজন অনেক বেড়ে গিয়েছে। সকালে রাস্তায় বেরোলেই দেখা যায়, শিশুরা পিঠে বিরাট ব্যাগ নিয়ে স্কুলের দিকে যাচ্ছে। ব্যাগগুলো এত ভারী যে, তারা সোজা হয়ে হাঁটতে পারে না। দেখে মনে হয়, তারা যেন বোঝা বইছে। চিকিৎসকদের মতে, শিশুর যা ওজন, ব্যাগের ওজন তার ১০ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত নয়। অর্থাৎ বাচ্চার ওজন ৩০ কেজি হলে ব্যাগ ৩ কেজির বেশি হওয়া যাবে না। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, এর চেয়ে অনেক ভারী ব্যাগ তাদের রোজ বইতে হচ্ছে। অনেক সময় তারা এক কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে হাঁটে। ভারী ব্যাগের ভার এক পাশে পড়লে শরীরের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং ভবিষ্যতে মেরুদণ্ড এক দিকে বেঁকে যাওয়ার মতো মারাত্মক সমস্যা দেখা দিতে পারে। এর ফলে অনেক সময় শিশুদের ঘাড়ে ও পিঠে অসহ্য ব্যথা হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে তাদের শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধিও আটকে যাচ্ছে। অনেক স্কুলে অবৈজ্ঞানিক ভাবে রুটিন তৈরি করা হয়। ফলে প্রতি দিন সব বিষয়ের বই-খাতা নিয়ে যেতে হয়। তৃতীয়ত, কিছু স্কুল বাণিজ্যিক কারণে ক্লাসে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বই ও মোটা খাতা কিনতে বাধ্য করে, যা ব্যাগের ওজন বাড়ায়।

সমস্যা শুধু শরীরের নয়, মনেরও। ভারী ব্যাগের মতোই তাদের উপর পড়ার চাপও সুবিশাল। স্কুল ও টিউশন মিলিয়ে সারা দিনে খেলাধুলার সময় তারা পায় না। ছোটরা এখন আনন্দ ভুলে যাচ্ছে। তারা ক্লান্ত হয়ে পড়ছে সহজেই, মেজাজ খিটখিটে হচ্ছে। আমরা তাদের মানুষ না-বানিয়ে, ভাল রেজ়াল্ট করার যন্ত্র বানাচ্ছি। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ যশপালের নেতৃত্বে কমিটি বহু আগেই ‘বোঝাহীন শিক্ষা’র সুপারিশ করেছিল। এমনকি বিভিন্ন সময়ে উচ্চ আদালত এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রক থেকেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, ক্লাস টু পর্যন্ত কোনও বাড়ির কাজ থাকবে না এবং ব্যাগের ওজন নিয়ন্ত্রিত হবে। দুঃখের বিষয়, অধিকাংশ বেসরকারি স্কুল এই নির্দেশিকাগুলি অগ্রাহ্য করছে।

শিক্ষা দফতর ও স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ, প্রত্যেক স্কুলে লকার বা আলমারির ব্যবস্থা করা হোক, যাতে বাচ্চারা বাড়তি বই স্কুলেই রেখে আসতে পারে। ক্লাসের রুটিন এমন ভাবে করা হোক, যাতে বেশি বই আনতে না-হয়। মোটা খাতার বদলে পাতলা খাতা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হোক। প্রয়োজনে সপ্তাহে এক দিন ‘নো স্কুলব্যাগ ডে’ চালু করা হোক। অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে। অনেক সময় আমরা টিফিন ও জলের বোতল দিয়ে ব্যাগের ওজন আরও বাড়িয়ে ফেলি। শিশুর সুস্থ শরীর ও মন রক্ষা করতে আমাদের সবাইকেই এগিয়ে আসতে হবে।

শুভময় সরকার, কাশিমনগর, মুর্শিদাবাদ

শিক্ষার অপমৃত্যু

‘বাড়ছে স্কুলছুট, কমছে স্কুল’ (১৭-১) শীর্ষক তরুণকান্তি নস্করের প্রবন্ধটি যুক্তিসঙ্গত। কেন্দ্র তো বটেই, রাজ্য সরকারেরও সদিচ্ছা না থাকলে স্কুলগুলির কোনও ভাবেই উন্নতি সম্ভব নয়। প্রদত্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, স্কুলছুটের হারে প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় স্থানে রয়েছে বিজেপি-শাসিত তিনটি রাজ্য। পশ্চিমবঙ্গও খুব একটা পিছিয়ে নেই। স্কুল একত্রীকরণের নামে এ রাজ্যেও প্রায় ৮,২০৭টি স্কুলের অপমৃত্যু ঘটতে চলেছে।

প্রবন্ধে স্পষ্ট, গোটা ভারতে স্কুলছুটের তালিকায় মেয়েদের সমস্যাই বেশি। এর কারণ নানা রকমের— দারিদ্র, অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেওয়ার মানসিকতা, লোকের বাড়িতে পরিচারিকার কাজ, বিভিন্ন কারখানায় সেলাইয়ের কাজ বা ঘরে বসে সোনার বাক্স তৈরি করার মাধ্যমে পরিবারের আয় বৃদ্ধি, বাড়ি থেকে স্কুল অনেক দূরে-র অজুহাত, ছোট ভাইবোনদের দেখাশোনার দায়িত্ব ইত্যাদি। স্কুলছুটে ছেলেরাও খুব একটা পিছিয়ে নেই। অভাবের তাড়নায় অনেক মা-বাবাই ছেলেদের শ্রমিকের কাজে পাঠাতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেক দরিদ্র পরিবারেই বাবা-মায়ের বদ্ধমূল ধারণা, লেখাপড়া শিখে চাকরি-বাকরি কাজকর্ম পাওয়া বড় কঠিন। তাই ছোটবেলা থেকে হাতের কাজ শেখাই ভাল বা ছোটখাটো ব্যবসা করা উচিত। অন্য দিকে, আর্থিক সঙ্গতিপূর্ণ পরিবারগুলি বেসরকারি স্কুলে তাঁদের ছেলেমেয়েদের পাঠাতে আগ্রহী। কারণ সরকারি স্কুলের প্রতি তাঁদের ভরসা কমে গিয়েছে। অনেক সরকারি স্কুলে দেখা যাচ্ছে পরিকাঠামো ভেঙে পড়েছে, কোথাও শিক্ষক আছেন ছাত্র নেই, আবার কোথাও ছাত্র আছে শিক্ষক নেই। অবিলম্বে কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজ্য সরকারগুলি সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে বাঁচাতে কোনও সদর্থক উদ্যোগ না করলে আগামী দিনে স্কুলছুট, স্কুল বন্ধের ঘটনা বাড়বে বলেই আশঙ্কা।

স্বপন আদিত্য কুমার বিশ্বাস, অশোকনগর, উত্তর ২৪ পরগনা

বঞ্চিত

তরুণকান্তি নস্করের লেখা ‘বাড়ছে স্কুলছুট, কমছে স্কুল’ গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ২০১৫ সালে হরিয়ানার পানিপথে ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’ প্রকল্পের সূচনা করে অনেক স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। কন্যাশিশুর জন্মহার হ্রাসের সমস্যার প্রতিকার, নারীর ক্ষমতায়নের প্রতিশ্রুতি ইত্যাদি। কিন্তু বাস্তবে তার রূপায়ণ দেখা যায় না। বরং বিজেপিশাসিত তিনটি রাজ্য গুজরাত, অসম ও উত্তরপ্রদেশে স্কুলছুটের সংখ্যা সর্বাধিক, যার অর্ধেকই কন্যাসন্তান। বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি অনুযায়ী, যে সব স্কুলে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা পঞ্চাশের নীচে নেমে যাচ্ছে, সে সব স্কুল বন্ধ করে অন্য স্কুলের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কাছাকাছি স্কুল না-থাকার জন্য সবচেয়ে আগে মেয়েদের স্কুল যাওয়া বন্ধ হচ্ছে। ঘর সংসারের কাজ, ছোট ভাইবোনদের দেখাশোনা করে তারা আর দূরের স্কুলে যেতে পারছে না। হয় তারা বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছে, নয়তো গৃহশ্রমিকের কাজে নিয়োজিত হচ্ছে। তা হলে ‘বেটি পড়াও’-এর প্রতিশ্রুতি কি রক্ষা হল?

আমাদের রাজ্যেও যে স্কুলগুলি চলছে তার ন্যূনতম পরিকাঠামো নেই। পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির কারণে শিক্ষকদের যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। শিক্ষার এই অবনমন সমাজকে পিছিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। ধনী ঘরের ছেলেমেয়েরা শুধু অনেক টাকা দিয়ে বেসরকারি স্কুলে পড়তে পারছে। অনেক নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অথচ আগে বেশি সংখ্যায় সরকারি স্কুল থাকায় গরিব ঘরের মেধাবী ছাত্রছাত্রীরাও অনেক উন্নতি করত। শিক্ষাব্যবস্থাকে বাঁচাতে হলে কেরল বা দিল্লির মডেল অনুসরণ করা যেতে পারে।

শিখা সেনগুপ্ত, বিরাটি, উত্তর ২৪ পরগনা

ঘুড়ি উৎসব

আকাশ জুড়ে রঙিন ঘুড়ির নাচ, সুতো কাটাকাটির উত্তেজনা, ছাদভর্তি মানুষের হাসি-আড্ডা— এক সময় গ্রামবাংলা ও শহুরে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। বিশেষ করে পৌষ সংক্রান্তি, মাঘী পূর্ণিমা বা বসন্তের আগমনে ঘুড়ি উৎসব মিলনমেলার রূপ নিত। সেই সময় শহরের ছাদগুলো ছিল উন্মুক্ত ও নিরাপদ, যেখানে মানুষ নির্বিঘ্নে ঘুড়ি ওড়াতে পারত। এখন বহুতল ভবন, বিদ্যুতের তার, মোবাইল টাওয়ার ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির কারণে ঘুড়ি ওড়ানো কঠিন। তখন ঘুড়ি তৈরি হত কাগজ ও বাঁশ দিয়ে, যা প্রকৃতির জন্য ক্ষতিকর ছিল না। কিন্তু এখন নাইলনের সুতো, প্লাস্টিকের ঘুড়ি ও কাচ-মেশানো সুতো পরিবেশ ও পাখির জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বহু মানুষ চিনা মাঞ্জার সুতোর কারণে গুরুতর আহত হচ্ছেন, প্রাণহানিও হচ্ছে। ঘুড়ি তাই এখন বিপদেরও কারণ। ঘুড়ি উৎসবকে বাঁচিয়ে তুলতে হলে হাতে তৈরি ঘুড়ি, লাটাই, প্রাকৃতিক রং ও বাঁশের কঞ্চির বাজার তৈরি করতে হবে। এতে গ্রামীণ কারিগর ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা যেমন উপকৃত হবেন, তেমনই মিলনমেলার পরিবেশটিও অক্ষত থাকবে।

মোহিত করাতি, কাঁচরাপাড়া, উত্তর ২৪ পরগনা

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Education system Psychology Health

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy