আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সব ক’টি কেন্দ্রীয় ইউনিয়ন শ্রম বিধির প্রতিবাদে সাধারণ ধর্মঘট ডেকেছে। একে ‘আরও একটি ধর্মঘট’ বলে দেখা ঠিক হবে না। ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ আন্দোলনের স্লোগান ছিল ‘তোমরা ১ শতাংশ, আমরা ৯৯ শতাংশ’। সঙ্কটগ্রস্ত পুঁজিতন্ত্রের অসাম্যের রূপটি প্রকাশ করেছিল ওই আন্দোলন। ধনকুবেরদের হাতে সম্পদের চূড়ান্ত কেন্দ্রীকরণ ও অসম বণ্টন-ব্যবস্থা এর কারণ। বর্তমানে বিশ্বের মোট সম্পদের সিংহভাগ মালিকানা রয়েছে জনসংখ্যার মাত্র ১ শতাংশ বিত্তশালীর হাতে। চারটি শ্রম বিধিকে এই অসাম্যের প্রেক্ষিতে দেখতে হবে। সরকারের যুক্তি, শিল্পে বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে শ্রমের বাজারে নমনীয়তা জরুরি। অথচ, অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুসারে ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে কর্পোরেট লাভের সঙ্গে জিডিপি-র অনুপাতের নিরিখে কর্পোরেট লাভ ছিল ১৫ বছরে সর্বোচ্চ। অন্য দিকে, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ক্রমাগত কমছে।
১৯৯১ সালের পর বিশ্বায়নের কারণে ভারতের জনসংখ্যার ধনীতম ১০ শতাংশ-সহ উপরের দিকের ৪০ শতাংশের আয় ধারাবাহিক ভাবে বেড়েছিল। কিন্তু ওই ৪০ শতাংশের আয় ২০১৭ থেকে কমতে শুরু করেছে, যেখানে শীর্ষের ১০ শতাংশ আরও ধনী হচ্ছে। এর কারণ পুঁজির কেন্দ্রীকরণ। বিপুল অঙ্কের টাকা অল্প কয়েকটি কোম্পানির কোষাগারে যাচ্ছে। বাজারে এই সব কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে গিয়ে পরের স্তরের বৃহৎ কোম্পানিগুলি শ্রমিক-কর্মচারীদের মজুরি কমিয়ে, কাজের ঘণ্টা বাড়িয়ে, চুক্তিভিত্তিক ও অস্থায়ী শ্রমিক নিয়োগ করে লাভ বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
শ্রম বিধি বস্তুত তারই সুযোগ করে দিচ্ছে। ব্রিটিশ শাসনকাল থেকে আজ পর্যন্ত ভারতের শ্রমজীবীরা সংগ্রামের বিনিময়ে যে অধিকারগুলি অর্জন করেছিলেন, শ্রম বিধি সেগুলি কেড়ে নিচ্ছে। সরকার শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা চায় না, অথচ নানা অনলাইন ডেটাবেস-এ শ্রমিকদের সম্পর্কে খুঁটিনাটি তথ্য চায়। আন্দাজ হয়, গোটা দেশের শ্রমশক্তিকে ডিজিটাল ডেটাবেস-এ আবদ্ধ করে পুঁজির চাহিদা অনুযায়ী জোগান দিতে চায় কেন্দ্রের সরকার। স্থায়ী কাজ ক্রমশ অস্থায়ী, ‘গিগ’ প্রকৃতির কাজে পরিণত হবে।
আজকের ভারতে সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ, বিরোধী মত দমন-পীড়ন, ধর্মীয় বিভাজন, সব কিছুর সঙ্গে এসেছে চারটি শ্রম বিধি, যা শ্রমজীবীদের শতবর্ষের অর্জিত অধিকারগুলিকে আক্রমণ করেছে। তাই সামগ্রিকতার বিচারে শ্রম কোডের বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুধুমাত্র শ্রমজীবীদের সংগ্রাম নয়, ভারতের গণতন্ত্র রক্ষার সংগ্রাম, ফ্যাসিবাদের বিপদ ঠেকানোর সংগ্রাম।
উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায়, কলকাতা-৮৪
সরকারি প্রকল্প
আমাদের রাজ্যে কুড়ি লক্ষের বেশি প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষের বসবাস। অধিকাংশ প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষের সামনে কঠিন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। সরকারি ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের সুযোগ ক্রমশ সঙ্কুচিত হচ্ছে। বেসরকারি ক্ষেত্রে সংরক্ষণ নীতি প্রযোজ্য নয়। একশো দিনের কাজের প্রকল্প বন্ধ। এই অবস্থায় অনেকটাই ভাতার উপর নির্ভরশীল হয়ে বেঁচে আছেন এই সব অসহায় মানুষজন। তেলঙ্গানা, মহারাষ্ট্র, পঞ্জাব, দিল্লির মতো রাজ্যে প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য ভাতার হার অনেকটা বেশি হলেও আমাদের রাজ্যে এখনও এর পরিমাণ মাসিক হাজার টাকা। এর অনেকটাই চলে যায় বিদ্যুৎ বিল মেটাতে। রাজ্য সরকার আর্থিক ভাবে দুর্বল মানুষের জন্য ‘হাসির আলো’ বলে একটি প্রকল্প চালু করেছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যায়। প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষদের এই প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত করলে এঁদের অনেকেই উপকৃত হবেন।
অজয় দাস, উলুবেড়িয়া, হাওড়া
পরিস্রুত জল
একটি শহর পরিচ্ছন্নতার মাপকাঠিতে শীর্ষে থাকলেই যে নাগরিক জীবন নিরাপদ— এই ধারণা সাম্প্রতিক ইন্দোরের পানীয় জল বিপর্যয় ভেঙে দিল। একাধিক মানুষের অসুস্থতা ও মৃত্যুর খবরে আমরা শিউরে উঠি, কিন্তু ঘটনাটিকে যদি কেবল একটি দুর্ঘটনা হিসেবে দেখি, তা হলে আসল সমস্যাটিকে এড়িয়ে যেতে হয়। এই বিপর্যয়ের কেন্দ্রে রয়েছে আমাদের নগর ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘ দিনের এক অবহেলিত বাস্তবতা— পানীয় জল ও নিকাশি ব্যবস্থার ভয়ঙ্কর সান্নিধ্য। শহরের নানা জায়গায় আজও এমন পরিকল্পনাহীন নির্মাণ দেখা যায়, যেখানে পরিচ্ছন্নতার নাম করে স্থায়ী ঝুঁকি তৈরি করা হয়।
প্রশ্নটা তাই শুধু কে দোষী, তা নয়, প্রশ্ন হল, এমন ঝুঁকি তৈরি হওয়ার পথ কেন আগেই বন্ধ করা হয়নি। নিরাপদ পানীয় জল কোনও অনুগ্রহ নয়, এটি নাগরিক জীবনের মৌলিক শর্ত। অথচ, বাস্তবে আমরা দেখি, জল সরবরাহ ব্যবস্থার স্বাস্থ্য পরীক্ষার বিষয়টি নিয়মিত তদারকির বাইরে থেকে যায়। জল পরীক্ষা প্রায়ই অঘটনের পর হয়, আগাম সতর্কতা হিসেবে নয়। এই দেরিই প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। উল্লেখযোগ্য যে, নীতি আয়োগের ‘কম্পোজ়িট ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট ইন্ডেক্স’ (২০১৮) আগেই সতর্ক করেছিল— ভারতের প্রায় ৭০ শতাংশ পানীয় জল কোনও না কোনও ভাবে দূষিত, তবু সেই সতর্কতার প্রতিফলন নগর জল-ব্যবস্থাপনায় কার্যত দেখা যায়নি। আমরা গর্বের সঙ্গে শহরের পরিচ্ছন্নতার র্যাঙ্কিং প্রচার করি, কিন্তু শহরের নীচে থাকা পুরনো পাইপ, ক্ষয়প্রাপ্ত নিকাশি ব্যবস্থা এবং অপর্যাপ্ত নজরদারি নিয়ে তেমন আলোচনা হয় না। অথচ যে কোনও বিশেষজ্ঞ জানেন— পুরনো পাইপলাইনে চাপ কমে গেলে পাশের নোংরা জল ঢুকে পড়ার আশঙ্কা প্রবল ভাবে বেড়ে যায়। এই ঝুঁকি নতুন নয়, কিন্তু গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এমন ঘটনা আমাদের আরও একটি অস্বস্তিকর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়— পানীয় জল এখনও রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক অগ্রাধিকারের তালিকায় নেই। রাস্তা, আলো, সৌন্দর্যায়ন দৃশ্যমান; জল ব্যবস্থাপনা দৃশ্যমান নয়। তাই তার অবহেলাও নীরবেই চলতে থাকে, যত ক্ষণ না কোনও মৃত্যুর খবর আমাদের চেতনায় ধাক্কা দেয়।
এই প্রসঙ্গে প্রশ্ন তোলা জরুরি— শহরের বিভিন্ন সরকারি নির্মাণ ও পরিকাঠামোর ক্ষেত্রে পানীয় জল লাইনের নিরাপত্তা যাচাই কি বাধ্যতামূলক নয়? নাগরিকদের কাছে জল পরীক্ষার রিপোর্ট কি প্রকাশ্যে আনা হয়? এই প্রশ্নগুলির উত্তর না-পাওয়া পর্যন্ত ‘দোষীদের শাস্তি’ ঘোষণার নৈতিক ভিত্তি দুর্বলই থেকে যায়। ইন্দোরের ঘটনাটি কোনও একক শহরের ব্যর্থতা নয়, এটি আমাদের নগর ব্যবস্থাপনার এক বৃহত্তর অসুখের লক্ষণ। পরিচ্ছন্নতার সনদ দিয়ে নাগরিক নিরাপত্তার অভাব ঢেকে রাখা যায় না। উন্নয়নের মানদণ্ড যদি মানুষের জীবন সুরক্ষিত রাখতে না পারে, তবে সেই উন্নয়নের অর্থ নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
অলোক কুমার মুখোপাধ্যায়, সোদপুর, উত্তর ২৪ পরগনা
সম্প্রসারণ
হাওড়া ময়দান থেকে সল্ট লেক সেক্টর ফাইভ পর্যন্ত মেট্রো পরিষেবা চালু হওয়ায় হাওড়া, কলকাতা ও সল্ট লেকের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থায় অভূতপূর্ব সুবিধা হয়েছে। অল্প সময়ে ও কম খরচে মানুষ এখন শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় যাতায়াত করতে পারছেন। এ দিকে হাওড়া স্টেশনের বিকল্প হিসেবে সাঁতরাগাছি রেল স্টেশনের সম্প্রসারণ, বাবুঘাট বাসস্ট্যান্ড সাঁতরাগাছিতে স্থানান্তরের পরিকল্পনা এবং কোনা এক্সপ্রেসওয়ের ছয় লেনের উড়ালপুল নির্মাণ— সব মিলিয়ে অদূর ভবিষ্যতে সাঁতরাগাছি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবহণ কেন্দ্রে পরিণত হতে চলেছে। এই পরিস্থিতিতে হাওড়া ময়দান থেকে সাঁতরাগাছি পর্যন্ত মেট্রো রেল পরিষেবা সম্প্রসারণ করা হলে হাওড়া স্টেশন, কলকাতা, শিয়ালদহ ও সল্ট লেকের মধ্যে যাতায়াত আরও সহজ ও দ্রুত হবে। তাই মেট্রো রেল কর্তৃপক্ষের কাছে এই বিষয়ে সদর্থক সিদ্ধান্তের আবেদন জানাচ্ছি।
অপূর্বলাল নস্কর, ভান্ডারদহ, হাওড়া
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)