পশ্চিমবঙ্গ স্কুলশিক্ষা দফতর ও মধ্যশিক্ষা পর্ষদ ঘোষিত ৩ মে থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ক্লাস বন্ধ/ স্কুল বন্ধের নির্দেশনামা নজিরবিহীন। এই দীর্ঘ অবকাশে এতগুলি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপেক্ষিত হল।

১) গরমের শুরুতেই দহনের আশঙ্কা ও তদ্বিষয়ক দাওয়াই হাস্যকর। গরম সবে শুরু; কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া শহর-গ্রাম সর্বত্রই বিদ্যুৎ আছে, উন্নত পরিকাঠামোয় ঘরগুলি উপযুক্ত পরিসরের এবং সেগুলিতে পাখা আছে। ১০:৩০ থেকে ৪:৩০ পর্যন্ত পড়ুয়ারা স্কুলেই ভাল থাকে। তাই ২০ মে থেকে পর্ষদ ঘোষিত গরমের ছুটিই ঠিক ছিল।

২) এ বছর লোকসভা ভোটের জন্য কিছু স্কুল ব্যবহৃত হচ্ছে, বহু শিক্ষক-শিক্ষিকা নির্বাচনী কাজে যুক্ত— এতে পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে সত্য, তবে এটা সার্বিক চিত্র নয়। রাজ্যের বহু স্কুলে পঠনপাঠন চলছে, তাও বন্ধ হল সরকারি বদান্যতায়। ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়ল সাধারণ বাড়ির পড়ুয়াদের।

৩) পড়ুয়াদের সময়ভিত্তিক একটি পাঠ্যসূচি শেষ করতে হয় ও তার মূল্যায়ন হয়। প্রথম মূল্যায়ন পর্ব বিঘ্নিত হল ভোটের জন্য, দ্বিতীয় মূল্যায়ন পর্ব মূল্যহীন হতে চলেছে পঠনপাঠনের সময়াভাবে। এক দিকে বার্ষিক ১০০ ঘণ্টা শিক্ষণের নির্দেশ, শেখার কার্যকারিতা বিশ্লেষণের উদ্যোগ, অন্য দিকে ছুটি বাড়িয়ে কর্মদিবস হ্রাসের প্রয়াস— এ কেমন শিক্ষাভাবনা?

৪) একাদশ শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষার ফল সদ্য প্রকাশিত। ১০ মে-র মধ্যে ফলাফল পাঠাতে হবে সংসদে। স্কুল বন্ধ থাকলে সে কাজ করবে কে? দ্বাদশ শ্রেণিতে উত্তীর্ণ ছাত্রছাত্রীদের ক্লাস হত পাঠ্যসূচি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনে। জুলাই মাসের আগে তাদের ক্লাস শুরু হবে না। এরা বঞ্চিত হল। 

৫) জুন মাসের প্রথমেই মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ। মার্কশিট, সার্টিফিকেট দেওয়া, ফল প্রকাশ-পরবর্তী কাজকর্ম, ভর্তি, বিভাগীয় যোগাযোগ, সরকারি নির্দেশ পালন— ৩০ জুন পর্যন্ত বন্ধ-স্কুল পরিবেশে কী ভাবে সচল থাকবে এ সব কর্মকাণ্ড?

শ্রীদামচন্দ্র জানা

রাজ্য সম্পাদক, পশ্চিমবঙ্গ প্রধানশিক্ষক সমিতি

 

পৃথক ফল

এই ছুটির নির্দেশের জন্য, জনসাধারণের মনে সরকার সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা বাড়ছে। বেসরকারি স্কুলগুলো কিন্তু গ্রীষ্মাবকাশ বাদে গমগমিয়ে চলবে। সরকারি স্কুলের ছাত্রছাত্রী ও তাদের অভিভাবকদের মনে হবে, এক যাত্রায় পৃথক ফল। গ্রামপ্রধান পশ্চিমবঙ্গে অত্যধিক গরমে বেশির ভাগ স্কুল সকালে হয়। শহরেও বেশির ভাগ স্কুল শুধু সেকেন্ডারি। সেখানেও সকালে স্কুল হতে পারে। সমস্যা, যেখানে দুই শিফ্‌টে স্কুল হয়। কয়েকটা স্কুলের জন্য রাজ্য জুড়ে প্রায় দু’মাস ছুটি? শুধু তা-ই নয়, বিদ্যালয়ে এখন মিড ডে মিল, আয়রন ট্যাবলেট, ডি-ওয়ার্মিং ট্যাবলেট, স্বাস্থ্যপরীক্ষা— কত কী প্রজেক্ট। সব দু’মাস বন্ধ।

পরেশ কুমার নন্দ

প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক, টাকি বয়েজ় স্কুল

 

দফারফা

পরিবেশ দূষণের কারণে প্রতি বছর গরম বাড়তেই থাকবে, তাই ছুটি সমাধান হতে পারে না। এ ভাবে যখন-তখন ছুটি ঘোষণা করে সরকারি বিদ্যালয়গুলোর পঠনপাঠনের দফারফা করে দেওয়া হচ্ছে। এক‌ই সঙ্গে শিক্ষকদের সমাজে হেয় করা হচ্ছে। সবার ধারণা হচ্ছে, শিক্ষকরা অনেক ছুটি পান, বিনা পরিশ্রমে বেতন পান। 

সুমন্ত কোঙার

মুগুড়া, পূর্ব বর্ধমান

 

পরিকল্পিত

যখন মনে হয়েছিল এই বিরাট ছুটিতে বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রী না গেলেও, শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিক্ষাকর্মীদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক, তখন সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদের ঢেউ আছড়ে পড়েছিল সোশ্যাল মিডিয়াতে। যেই পরবর্তী নির্দেশিকায় শিক্ষক-শিক্ষিকা, শিক্ষাকর্মীদেরও ছুটি ঘোষণা করা হল, সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বিরাট একটা অংশ ঘুরে গেলেন।

ছুটির আনন্দ সহজাত। প্রত্যেকেই ছুটি পেলে খুশি হই। কিন্তু শিক্ষক হিসাবে সার্বিক দিকটি উপলব্ধি করা জরুরি নয় কি? 

অনেক শিক্ষক-শিক্ষিকা প্রশ্ন করেছেন, কই, অভিভাবকরা তো প্রতিবাদ করছেন না? আপনাদের এত মাথাব্যথা কেন? উত্তরে বলি, অভিভাবকরা সংগঠিত নন। তাই তাঁরা প্রতিবাদে পথে নামছেন না। 

আমার মনে হয়, সরকারের এই পদক্ষেপগুলি কোনওটাই খামখেয়ালি নয়, বরং সুপরিকল্পিত। পরোক্ষ ভাবে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে মানুষের কাছে হেয় প্রতিপন্ন করার মাধ্যমে, অভিভাবকদের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দিকে ঠেলে দেওয়াই এর প্রধান উদ্দেশ্য। ঠিক যেমন ভাবে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার বিরাট একটা অংশকে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দিকে ঠেলে দিয়ে সরকার তার দায়-দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলেছে। প্রায় পঞ্চাশ হাজারের বেশি প্রাথমিক শিক্ষালয় বেসরকারি ভাবে চলছে গ্রামগঞ্জে, শহরে সর্বত্র। ‘অর্থ যার শিক্ষা তার’ এটাই এখন শিক্ষার আঙিনায় বাস্তব সত্য। মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থাকেও যদি সে দিকে ঠেলে দেওয়া যায়, তা হলে শিক্ষার বিপুল দায়ভার থেকে সরকার পুরোপুরি মুক্ত হবে। সাধারণ বাড়ির সন্তানদের মেধা অর্থের কারণে অসহায় হয়ে পড়বে। 

কিংকর অধিকারী

বালিচক, পশ্চিম মেদিনীপুর

 

হাওয়া অফিস!

‘ফণী’র জন্য ৩ ও ৪ মে মিলিয়ে দু’দিনের ছুটি ছিল প্রয়োজনীয় এবং সঙ্গত। সবচেয়ে অবাক কাণ্ড হল, হাওয়া-অফিসের ভূমিকা গ্রহণ করে, শিক্ষা দফতর কল্পনা করে নিয়েছে, ১০ জুন (পূর্বনির্ধারিত গরমের ছুটির শেষে স্কুল খোলার দিন) চরম গরম আবহাওয়া চলবে (নোটিফিকেশনে বলা হয়েছে, "... anticipated extreme weather condition...")। সাধারণত, জুনের মাঝামাঝি বঙ্গে বর্ষা ঢুকে যায়। তা ছাড়া, ১০ জুন স্কুল খোলার পরে মারাত্মক গরম থাকলে, পরিস্থিতি দেখেও তো ছুটি দেওয়া যেত। এই ম্যারাথন ছুটি ছাত্রছাত্রীদের পাঠবিমুখ করবে। শিক্ষক-শিক্ষিকারা সিলেবাস শেষ করতে হিমশিম খাবেন। কম সময়ে ছেলেমেয়েরা বিষয় বুঝে উঠতে সমস্যায় পড়বে। সবচেয়ে সমস্যায় ভুগবে দশম ও দ্বাদশ শ্রেণির ছেলেমেয়েরা। কারণ, পুজোর পরেই তাদের টেস্ট পরীক্ষা। লম্বা ছুটিতে মিড ডে মিল না থাকা, ছেলেমেয়েদের কাজে পাঠিয়ে দেওয়া প্রভৃতি কারণে স্কুলছুটেরও অাশঙ্কা আছে। 

প্রণব কুমার মাটিয়া

পাথরপ্রতিমা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা

 

সময় বদলালেই

এই গরমেও আইসিডিএস সেন্টারগুলি যদি চালু থাকতে পারে, উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলিতে একেবারে দুধের বাচ্চারা গিয়ে যদি বিসিজি টিকা, হামের প্রতিষেধক নিতে পারে, পোলিয়ো খেতে পারে, তা হলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের সকাল ৬টা থেকে ৯:৩০ পর্যন্ত বিদ্যালয়ে আসতে অসুবিধা হত না। মাঝখানে আসল গ্রীষ্মাবকাশ তো আছেই।

মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি

প্রধান শিক্ষক, রাজবল্লভপুর গড়বেড়িয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়

 

ত্বক আলাদা?

গরমের দাপট এমন এক বিষয়, যা একই এলাকার সরকারি স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের আহত করে, কিন্তু বেসরকারি স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের করে না— এমন কোনও গবেষণার রিপোর্ট বেরিয়েছে বলে জানা নেই। বেসরকারি স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের ত্বকের গঠন বিশেষ ভাবে গড়ে ওঠে, কোনও দিন শুনিনি। আবার কোনও সরকারকে বলতে শুনিনি, তারা দুই শ্রেণির নাগরিক গড়তে চায়।

নিখিল কবিরাজ

সহশিক্ষক, চাঁদমারী দেশপ্রিয় শিক্ষায়তন