গণতন্ত্র সরকার চালনার নিকৃষ্টতম ব্যবস্থা, কেবল অন্য ব্যবস্থাগুলিকে বাদ দিলে— ব্রিটিশ রাজনীতিক উইনস্টন চার্চিলের বহুচর্চিত উক্তিটিকে ঈষৎ পরিমার্জন করিয়া বলা চলে: প্রচলিত নির্বাচন পদ্ধতি সংসদীয় গণতন্ত্রের নিকৃষ্টতম প্রকরণ, অন্য প্রকরণগুলিকে বাদ দিলে। প্রচলিত রীতির সমস্যা ও দুর্বলতা বিস্তর। তাহা লইয়া আলোচনাও অনেক হইয়াছে। বিশেষত, ভোটের হিসাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হইতে অনেক দূরে থাকিয়াও সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনের জোরে শাসনক্ষমতা অর্জনের সুযোগ প্রতিনিধিত্ব-নির্ভর পরোক্ষ গণতন্ত্রের নৈতিক মহিমাকে অনেকখানি ম্লান করিয়া দেয়। এহ বাহ্য, সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনের নৈতিকতা লইয়াও অত্যন্ত সঙ্গত প্রশ্ন রহিয়াছে; নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাও যে সমাজকে সর্বদা ন্যায়সম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছাইয়া দিতে পারে না, তাহা অকাট্য যুক্তিতে প্রমাণিত হইয়াছে, আজ নহে, ফরাসি বিপ্লবের সমকালীন সুদূর অতীতে। তাহার পরেও নির্বাচনের এমন মাহাত্ম্য কেন? সহজ উত্তর: প্রতিনিধি নির্ধারণের এমন কার্যকর পন্থা আর দুইটি নাই।

অতএব আগামী আড়াই মাস আসমুদ্রহিমাচল শতবীণাবেণুরবে নির্বাচন চলিবে। ১১ এপ্রিল হইতে ১৯ মে, প্রায় ছয় সপ্তাহের দীর্ঘ ভোটপর্বের তুল্য কোনও ঘটনা দুনিয়ায় কোথায়ও ঘটে না, কারণ— চিনের দোহাই— নির্বাচনী গণতন্ত্রের পরিসরে এমন বিপুল জনসংখ্যার দেশ আর দুইটি নাই। ১৯৫২ সালে স্বাধীন দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের সময় হইতেই এই একটি বিষয়ে ভারত অতুলনীয়। তবে যত দিন গিয়াছে, নির্বাচন আয়োজনের প্রক্রিয়া স্বাভাবিক ভাবেই তাহার অভিনবত্ব বহুলাংশে হারাইয়াছে, এমনকি ইলেকট্রনিক ভোটযন্ত্রও এখন পুরানো। কিন্তু শত অভ্যাসেও যে বস্তুটির আকর্ষণ হারায় নাই, বরং উত্তরোত্তর বাড়িয়া চলিয়াছে তাহার নাম নির্বাচনী প্রচার। পঞ্চাশের দশকের মানুষ যদি আজ ভোটের প্রচার দেখিবার বা শুনিবার সুযোগ পাইতেন, স্তম্ভিত হইতেন। মিছিল ও জনসভার পুরানো প্রকরণের জাঁকজমক বহুগুণ বাড়িয়াছে, কিন্তু তাহার পাশাপাশি প্রবল হইতে প্রবলতর আকার ধারণ করিয়া চলিয়াছে সংবাদমাধ্যম ও অধুনা সোশ্যাল মিডিয়ার অকল্পিতপূর্ব বিস্ফোরণ। একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকের নির্বাচনী প্রচার দেখিলে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বোধ করি বিশ্বরূপ দেখাইবার বাসনা সংবরণ করিতেন। আপাতত ভারতবাসী ফলিত গণতন্ত্রের বিশ্বরূপ দর্শন করিবেন।

সেই রূপ কেমন হইবে, তাহার পূর্বাভাস ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। সুদিন আনিবার প্রতিশ্রুতি দিয়া ক্ষমতায় আসিয়া পাঁচ বছর রাজ্যপাট চালাইবার পরে শাসক দলের নেতা ও নেত্রীরা তাঁহাদের মহানায়কের পরিচালনায় নির্বাচনী প্রচারের মূল সুরটি বাঁধিয়া দিয়াছেন ‘জাতীয় নিরাপত্তা’র তারে, কার্যত যাহা পাকিস্তান-বিরোধিতায় পর্যবসিত। কৃষকের সমস্যা, কর্মসংস্থানের ঘাটতি, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যের মতো প্রাথমিক পরিষেবার সরবরাহে ও গুণমানে ব্যাপক এবং গভীর অপূর্ণতা— সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনের প্রকৃত সমস্যাগুলির বিষয়ে সৎ ভাবে কথা বলিতে তাঁহাদের প্রবল অনাগ্রহ, কারণ তাহা হইলে জবাবদিহির দায় থাকে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি সাফ সাফ বলিয়া দিয়াছেন, সব বিষয়ে সরকারের নিকট কাজের হিসাব চাহিবার ‘আধুনিক ফ্যাশন’ তাঁহার মোটে পছন্দ নহে, সব কাজ সরকার করিবে কেন? নাগরিক জানেন, এমনকি সীমান্ত পার হইয়া বিমান হানার ফল কী হইল, সেই বিষয়েও প্রশ্ন করিলে দেশদ্রোহের সরকারি তকমা মিলিবে। নির্বাচনী প্রচারকে এই শ্বাসরোধকর উগ্র অতিজাতীয়তার কবল হইতে মুক্ত করিয়া সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক অভাব অভিযোগ এবং প্রত্যাশা বিষয়ে গণতান্ত্রিক বিতর্কের পরিসরে মুক্ত করিবার প্রয়াসই এখন সমস্ত শুভবুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিক, প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক দলের প্রথম দায়িত্ব।