বাদ পড়িলেন নয়নতারা সেহগল। সর্বভারতীয় মরাঠা সাহিত্য সম্মেলন উদ্বোধন করিতে এই প্রবীণ সাহিত্যিককে আমন্ত্রণ পাঠাইয়াও ফিরাইয়া লইলেন আয়োজকরা। নয়নতারা অংশগ্রহণ করিলে সাহিত্য সম্মেলন বানচাল হইবে, এমন হুমকি ছুড়িয়া দেওয়া হইয়াছে। দেশবাসীর মনে পড়িবে, ঠিক এই ভাবে ২০১২ সালে জয়পুর সাহিত্য সম্মেলনে সলমন রুশদি আসিলে তাঁহাকে হত্যার হুমকি দিয়াছিল মুসলিমদের একটি গোষ্ঠী। ফলে তিনি সম্মেলনে যোগ দিতে পারেন নাই। ভিডিয়ো মারফত তাঁহার বক্তব্য প্রচারও হিংসার ভয় দেখাইয়া বন্ধ করা হয়। পরবর্তী বৎসরগুলি প্রমাণ করিয়াছে, ভয় দেখাইয়া বাক্‌রোধ করিবার কাজে হিন্দুত্ববাদীরাও পিছাইয়া নাই। ২০১৩ সালে গোবিন্দ পানসারে, ২০১৫ সালে নরেন্দ্র দাভোলকর এবং এম এম কালবুর্গি, এবং ২০১৭ সালে গৌরী লঙ্কেশ নিহত হইয়াছেন আততায়ীর গুলিতে। তাঁহারা বর্ণহিন্দুর আধিপত্যের ধারণায় আঘাত করিয়াছিলেন, হিন্দুদের পরমতসহিষ্ণুতাকে গুরুত্ব দিয়াছিলেন। সেই সহিষ্ণুতার ঐতিহ্যের উপর ক্রমাগত আক্রমণ চলিয়াছে নরেন্দ্র মোদীর ভারতে। যাঁহারা হিন্দুধর্ম সম্পর্কে হিন্দুত্ববাদীদের ধারণার বাহিরে গিয়া তথ্য-প্রমাণ পেশ করিয়াছেন, তাঁহাদের বই তুলিয়া লইতে বাধ্য করা হইয়াছে প্রকাশককে। অথবা তাঁহাদের বই বাদ পড়িয়াছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য হইতে। স্বাধীন মত প্রকাশ ক্রমশ ঝুঁকিপূর্ণ হইয়া উঠিয়াছে।

নয়নতারা সেহগল ২০১৫ সালে যুক্তিবাদী, বিজ্ঞানমনস্কদের হত্যার প্রতিবাদে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার ফিরাইয়াছিলেন। অসহিষ্ণুতার দাপটের প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী মোদীর নীরবতা এবং সাহিত্য অকাদেমির নিষ্ক্রিয়তার সমালোচনা করিয়াছিলেন তিনি। প্রায় পঞ্চাশ জন সাহিত্যিক ও শিল্পী সরকারি পুরস্কার ফিরাইবার কথা ঘোষণা করিলে বিতর্কের ঝড় ওঠে। সেই সময়ে প্রতিবাদকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলিয়া আখ্যা দিয়াছিলেন শাসক-ঘনিষ্ঠরা। যে কোনও প্রতিবাদকে ‘রাজনৈতিক’ ছাপ দিলে ভারী সুবিধা। তাহাতে যে কোনও বিতর্ক দলীয় কোন্দলে পরিণত হয়। কোনও মতের বিচার, কোনও তথ্যের সত্যতার সন্ধান, কোনও প্রচলিত রীতির গ্রহণযোগ্যতা লইয়া বাদানুবাদের প্রয়োজন হয় না। তর্ক তুলিলে, প্রশ্ন করিলেই তাহা রাজনৈতিক বিরোধিতা, এই সরল সমীকরণ মোদীর ভারতের পরিচয়।

সেই ধারাতেই শ্রদ্ধেয় সাহিত্যিককে সম্মানপ্রদর্শন ‘বিপজ্জনক’ প্রতিপন্ন হইল। নয়নতারা নেহরু পরিবারের সদস্য হইয়াও ইন্দিরা গাঁধীর জরুরি অবস্থার প্রতিবাদ করিয়াছিলেন। তিন বৎসর পূর্বে অপরকে চুপ করাইবার প্রতিবাদ করিয়াছিলেন যিনি, আজ তাঁহাকেই চুপ করানো হইল। আবারও প্রধানমন্ত্রী নীরব। তাঁহারই দল মহারাষ্ট্রে ক্ষমতাসীন, কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডণবীসও নিশ্চুপ। মাঝখান হইতে সরব হইয়াছে শিবসেনা, কিন্তু সে-ই রাজনৈতিক হিসাব কষিয়াই। বিজেপিকে বিপদে ফেলাই এখন এই দলের রাজনীতির অস্ত্র, তাই এই সরবতা। তবে দুর্বৃত্তদের নিয়ন্ত্রণ করিতে কেহই আগাইয়া আসে নাই, যে যাহার রাজনীতির চর্যা করিতেছে। দুর্বৃত্তরা প্রশ্রয় পাইবে, বিপন্ন হইবেন সাহিত্যিক-শিল্পী-বিজ্ঞানীরা, ইহাই আজ প্রত্যাশিত। সাহিত্য মঞ্চে আজ নয়নতারারা না থাকিলেই আয়োজকরা নিশ্চিন্ত হইতে পারেন, রাজনীতি সমাজের এই অবস্থাই করিয়াছে।