Advertisement
E-Paper

এ রাজ্যে মহার্ঘভাতা নেই, উন্নয়নও নেই

উন্নয়ন খাতে ব্যয়ের নিরিখে বাম আমলে পশ্চিমবঙ্গ যেখানে ছিল, এখনও সেখানেই আছে। দেশের মুখ্য রাজ্যগুলির তালিকায় একেবারে তলানিতে। তা হলে, মহার্ঘভাতার টাকা কোথায় গেল?কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের তুলনায় এ রাজ্যের সরকারি কর্মীদের মহার্ঘভাতার হারের ব্যবধান বর্তমান সরকারের আমলে বেড়েছে, তা নিয়ে সংশয় নেই। রাজ্য রাজনীতিতে এ বিষয়ে অসংখ্য যুক্তি-প্রতিযুক্তি মানুষ শুনেছেন।

জিকো দাশগুপ্ত ও শুভনীল চৌধুরী

শেষ আপডেট: ১০ মে ২০১৬ ০০:০৮
যেন না রই দূরে। সরকারপন্থী বুদ্ধিজীবীদের সাংবাদিক সম্মেলনে অভিরূপ সরকার (বাঁ দিকে প্রথম, বসে)।

যেন না রই দূরে। সরকারপন্থী বুদ্ধিজীবীদের সাংবাদিক সম্মেলনে অভিরূপ সরকার (বাঁ দিকে প্রথম, বসে)।

কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের তুলনায় এ রাজ্যের সরকারি কর্মীদের মহার্ঘভাতার হারের ব্যবধান বর্তমান সরকারের আমলে বেড়েছে, তা নিয়ে সংশয় নেই। রাজ্য রাজনীতিতে এ বিষয়ে অসংখ্য যুক্তি-প্রতিযুক্তি মানুষ শুনেছেন। ব্যবধান বাড়ছে কেন, বর্তমান রাজ্য পে কমিশনের চেয়ারম্যান অভিরূপ সরকার তার একটি ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন (‘মহার্ঘভাতা বনাম উন্নয়নের খরচ,’ ২১-৪)। তাঁর মতে, উন্নয়নের খরচ বাড়ানোয় মহার্ঘভাতায় খরচ করা যাচ্ছে না। লেখকের ব্যাখ্যা, তৃণমূল সরকার যেহেতু ‘খোলাখুলি গরিবের পক্ষে’, তাই ‘মধ্যবিত্ত’ সরকারি কর্মচারীদের মহার্ঘভাতা না দিয়ে তারা ‘গরিব মানুষের জন্য’ এবং ‘সর্বজনীন উন্নয়নের’ লক্ষ্যে সামগ্রিক উন্নয়নের খরচ বাড়াতে আগ্রহী। রাজ্য সরকারের এই নীতির মধ্যে লেখক ‘গরিবের সঙ্গে মধ্যবিত্তের একটা শ্রেণিসংগ্রাম’-ও খুঁজে পেয়েছেন।

‘গরিব মানুষের জন্য’ এবং ‘সর্বজনীন উন্নয়নের’ লক্ষ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার রাজ্যের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের কত অংশ সামগ্রিক উন্নয়নের পেছনে খরচ করছে? অভিরূপবাবু যে দুটি বছরের কথা উল্লেখ করেছেন, তুলনার খাতিরে আমরা সে দুটি বছরের পরিসংখ্যানই দেখব। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের রিভাইসড এস্টিমেট বা সংশোধিত অনুমান অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ সালে পশ্চিমবঙ্গে রাজ্যের মোট উৎপাদনের ৯.৫% খরচ হয়েছিল উন্নয়ন খাতে। সেখানে বিহার, উত্তরপ্রদেশ, ঝাড়খন্ড এবং ওড়িশার মতো রাজ্যের খরচ যথাক্রমে ২০.৬%, ১৭%, ১৭% এবং ১৮.৪%। ১৮টি মুখ্য রাজ্যের মধ্যে উৎপাদনের অনুপাতে উন্নয়নমূলক খরচের নিরিখে পশ্চিমবঙ্গের স্থান ১৪। ২০১০-১১’তেও ১৭টি রাজ্যের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের স্থান ছিল ১৪ নম্বরে। অর্থাৎ, অন্য রাজ্যের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়নমূলক খরচ নেহাতই নগণ্য এবং এই পরিস্থিতির বিশেষ ‘পরিবর্তন’ তৃণমূল সরকারের আমলে ঘটেনি।

অন্য রাজ্যের তুলনায় না হয় কমই হল, কিন্তু বাম আমলের সঙ্গে তুলনাতেও কি তৃণমূলের আমলে উন্নয়ন খাতে ব্যয় বাড়ল? যদি প্রকৃত খরচের পরিসংখ্যানের দিকে তাকাই, তা হলে ২০১৬-১৭ সালের বাজেট থেকে দেখা যাচ্ছে, ২০১৪-১৫ সালে পশ্চিমবঙ্গের প্রকৃত উন্নয়নমুলক খরচ ছিল সংশোধিত অনুমানের চেয়ে অনেক কম— মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ৮.৭%। ২০১০-১১ সালে এই অনুপাত ছিল ৮.২%। অর্থাৎ, অনুপাতটি প্রায় অপরিবর্তিত। অন্য দিকে, বেতন খাতে ব্যয় কমেছে প্রভূত পরিমাণ। ২০১০-১১ সালে সরকারি কর্মীদের বেতন দিতে অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ৫.৪% খরচ হত। ২০১৪-১৫ সালে সেই অনুপাতটি কমে দাঁড়ায় ৩.৯%। যে ১৩টি মুখ্য রাজ্য বেতনের ওপর খরচের পরিসংখ্যান দিয়েছে এই বছরে, তাদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের স্থান নবম। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, ‘মধ্যবিত্ত’-র ওপর সরকারি খরচ কমে গেল, কিন্তু ‘সর্বজনীন উন্নয়নের’ লক্ষ্যে খরচও প্রায় একই থেকে গেল।

তা হলে রাজ্যের বাড়তি রাজস্ব আয় খরচ হচ্ছে কোথায়? কোথাও না। অভিরূপবাবু দেখিয়েছেন যে রাজ্যের রাজস্ব আয়ের অনুপাতে বেতন দেওয়ার খরচ ২০১০-১১ সালের তুলনায় ২০১৪-১৫ সালে কমেছে। কিন্তু, বেতনের খাতে এই বাঁচানো টাকা যদি সম্পূর্ণ ভাবে অন্য কোথাও খরচ হত, তা হলে রাজ্যের রাজস্ব আয়ের অনুপাতে খরচ একই থাকত। কিন্তু, ২০১০-১১ থেকে ২০১৪-১৫ সালের মধ্যে রাজস্ব আয়ের অনুপাতে প্রাথমিক রাজস্ব খরচ এবং প্রাথমিক খরচ, অর্থাৎ সুদ ব্যতিরেকে মোট খরচ যথাক্রমে কমেছে ১২.৫ এবং ৫.৪ শতাংশ-বিন্দু। অর্থাৎ, যথাযথ হারে মহার্ঘভাতা না দিয়ে রাজ্য সরকার ‘সর্বজনীন উন্নয়নে’ বাড়তি টাকা খরচ করছে না, আসলে তার রাজস্ব ঘাটতি কমাচ্ছে।

যে রাজ্যে শিক্ষা-স্বাস্থ্য-খাদ্যের মতো নূন্যতম চাহিদা থেকে অধিকাংশ মানুষ বঞ্চিত এবং সামগ্রিক ভাবে গোটা অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই ভুগছে ক্রয় ক্ষমতার অভাবে, সেখানে খরচ কমিয়ে সরকারি ঘাটতি কমানোর কোনও সঙ্গত যুক্তি নেই। বরং, আয়ের তুলনায় খরচ কমালে সঙ্কুচিত হয় সার্বিক চাহিদা, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত হন গরিব মানুষও। তাই এই কৃচ্ছসাধন নীতির মধ্যে কোনও ‘গরিবের সঙ্গে মধ্যবিত্তের’ শ্রেণিসংগ্রাম নেই। এই নীতি উভয় শ্রেণিকেই মারছে।

মহার্ঘভাতায় রাশ টানার এই আসল কারণটি অভিরূপবাবু চেপে গিয়েছেন। তিনি সরকারি কর্মীদের ‘দক্ষতা’ এবং ‘সংখ্যা’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সরকারি কর্মীদের একাংশের যদি দক্ষতার অভাব থাকে, তা হলে কর্মসংস্কৃতি উন্নত করার লক্ষ্যে যথাযথ প্রশাসনিক পদক্ষেপ করা দরকার। তার বদলে সকলের মহার্ঘভাতা ছেঁটে ‘একাংশের’ এই ‘অদক্ষতার’ সমাধান কী ভাবে করা হবে, অভিরূপবাবু খোলসা করেননি। সরকারি কর্মীদের “মিটিং মিছিলে” যাওয়াকেই তিনি ‘অদক্ষতা’র প্রমাণ ঠাউরেছেন। এটি রাজনৈতিক বক্তব্য, যার সমর্থনে যুক্তি বা তথ্য নেই।

অন্যান্য খরচ না কমিয়ে যথাযথ হারে মহার্ঘভাতা দিতে হলে, অভিরূপবাবুর হিসেব অনুযায়ী, সরকারকে বছরে ১৫০০০ কোটি টাকা বাড়তি খরচ করতে হবে। ২০১৪-১৫ সালের হিসেব ধরলে, টাকার এই পরিমাণটি রাজ্যের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ১.৯%। সেই একই বছরে উৎপাদনের অনুপাতে পশ্চিমবঙ্গের মোট এবং প্রাথমিক খরচ (অর্থাৎ, সুদ বাদ দিয়ে সরকারের মোট যে খরচ) যথাক্রমে ছিল ১৫% এবং ১২.৩%। দেশের মুখ্য রাজ্যগুলি এই দুটি খাতে গড়ে খরচ করেছে যথাক্রমে ১৮.৪% এবং ১৬.৭%। শুধু তাই নয়, উৎপাদনের অনুপাতে মোট এবং প্রাথমিক খরচের নিরিখে ১৮টি মুখ্য রাজ্যের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের স্থান যথাক্রমে ছিল ১৫ এবং ১৬। অর্থাৎ, খরচ করার নিরিখে পশ্চিমবঙ্গ অন্য সব রাজ্যের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। কেন? কারণ খরচ করার মতো টাকা সরকার আয় করতে পারছে না। অমিত মিত্র রাজস্ব ব্যয় ছেঁটেছেন, কিন্তু রাজস্ব আদায় করতে পারেননি। ফলে, নুন আনতে পান্তা ফুরোচ্ছে।

প্রাথমিক খরচের সঙ্গে মোট খরচেও এই রাজ্য অনেক পিছিয়ে। তাই খরচ করার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ার কারণ একমাত্র ‘বামফ্রন্টের ঋণের বোঝা’ হতে পারে না। মোট খরচের মধ্যে ধার মেটানোর খরচও অন্তর্ভুক্ত, যা উৎপাদনের অনুপাতে এমনিতেও বিগত দশ বছর ধরে কমে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গ বেহাল, কারণ অন্য রাজ্যের তুলনায় বাংলার নিজস্ব কর আদায়ের পরিমাণ অত্যন্ত কম। ২০১৪-১৫ সালে নিজস্ব কর আদায়ের পরিমাণের নিরিখে দেশের ১৮টি মুখ্য রাজ্যের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের স্থান ছিল সর্বনিম্ন, ১৮ নম্বরে। বাম আমলের শেষের দিকেও রাজ্যের নিজস্ব কর আদায়ের পরিস্থিতি একই ছিল।

কেন পশ্চিমবঙ্গ নিজস্ব কর আদায়ের পরিমাণে দেশে সবচেয়ে পিছিয়ে? সংগঠিত শিল্পের অভাবই এই ব্যর্থতার একমাত্র কারণ নয়। ২০১৪-১৫ সালে পশ্চিমবঙ্গে মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ৩.৯% এসেছিল সংগঠিত শিল্পক্ষেত্র থেকে এবং নিজস্ব কর আদায়ের পরিমাণ ছিল অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ৫%। অন্য দিকে, বিহারে অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে সংগঠিত শিল্পের অবদান মাত্র ১.৩% হলেও তাদের নিজস্ব কর আদায়ের পরিমাণ উৎপাদনের ৬.৪% ছিল। কেরলে অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে সংগঠিত শিল্পের অবদান পশ্চিমবঙ্গের থেকে কিছুটা কম, অথচ ২০১৪-১৫ সালে এই রাজ্যে নিজস্ব কর আদায় ছিল উৎপাদনের ৭.৭%।

এই ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হল, এ রাজ্যে বড় পুঁজি এবং রিয়েল এস্টেটকে বিপুল কর ছাড় দেওয়া হয়। যথাযথ কর বসিয়ে পশ্চিমবঙ্গ যদি অন্তত কেরলের মতোও কর আদায় করতে পারত, তা হলে ২০১৪-১৫ সালের হিসেবে মহার্ঘভাতা দিয়েও বাঁচত আরও ৬৪০৭ কোটি টাকা, যা উন্নয়নমূলক কাজে খরচ করা যেত।

অভিরূপবাবু যে শ্রেণিসংগ্রামের কথা বলছেন, তা কাল্পনিক। আসলে রাঘব বোয়ালদের তুষ্ট রাখার জন্য নিজস্ব কর কম রেখে রাজ্য সরকার মধ্যবিত্ত ও গরিব, দুই শ্রেণির মানুষকেই ভাতে মারছেন। কর কম আদায় করার দরুন খরচ বেশি করা যাচ্ছে না। সংগ্রামটা আসলে মধ্যবিত্ত বনাম গরিব মানুষের নয়, লড়াইটা হল মধ্যবিত্ত ও গরিব বনাম রাঘব বোয়ালদের। সরকার কোন পক্ষে, বুঝতে অর্থনীতিবিদ হতে হয় না।

লেখকরা আইডিএসকে-তে যথাক্রমে অর্থনীতির গবেষক ও শিক্ষক। মতামত ব্যক্তিগত

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy