বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ্যে আসার পরে অভিনেত্রী রূপাঞ্জনা মিত্রের কিছু মন্তব্য নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক দিকে, তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লড়াইয়ের কথা লিখেছেন। আবার অন্য দিকে, বিজেপি নেতা শমীক ভট্টাচার্যেরও মন্তব্য ভাগ করে নিচ্ছেন। অভিনেত্রী দুই দলের সঙ্গেই ভিন্ন সময়ে থেকেছেন। রূপাঞ্জনাকে নিয়ে তাই প্রশ্ন উঠছে, ফের কি তিনি গেরুয়া শিবিরে ফিরতে চান? উত্তর দিলেন অভিনেত্রী নিজেই।
প্রথমেই রূপাঞ্জনা ক্ষোভপ্রকাশ করে বলেন, “আমাকে কদর্য আক্রমণ করা হচ্ছে।” তার পরেই বলেন, “আমি এককালে যে দল করতাম, তারাই ক্ষমতায় এসেছে। দলে যখন ছিলাম, তাদের সঙ্গে আমার নীতি ও আদর্শ মেলেনি। আমাদের অন্য ভাবে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আমার সন্তান আছে। আমার পরিবারও চায় না, আমি আর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকি। যখন যা প্রতিবাদ করার ছিল, করেছিলাম।”
২০০০ সাল থেকে অভিনয় শুরু করেছিলেন রূপাঞ্জনা। তখন থেকেই নানা বিষয় নিয়ে সরব হতেন। এর কয়েক বছর পরে আসে নন্দীগ্রাম আন্দোলন। সেই সময় তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষ নিয়েছিলেন রূপাঞ্জনা। সেই সময় এক সিপিএম সমর্থক অভিনেত্রী তাঁকে ফোনে গালিগালাজ করেছিলেন বলেও দাবি করেছেন অভিনেত্রী।
২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের আগমন। তার আগে থেকেই তৃণমূল নেত্রীর লড়াইয়ে মুগ্ধ ছিলেন রূপাঞ্জনা। তাঁর কথায়, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লড়াকু স্বভাব ভাল লেগেছিল। কিন্তু ২০১৪ সাল থেকে আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে নানা সমস্যার শুরু হয়। তখন থেকেই সরকারি অনুষ্ঠানে যাওয়া কমিয়ে দিয়েছিলাম। আমন্ত্রণ পেতাম, কিন্তু আমি যেতাম না।”
স্টুডিয়োগুলির বাইরের চাকচিক্য বাড়তে থাকে। কিন্তু ২০১৪ সালের পর থেকে ইন্ডাস্ট্রির অন্দরে অন্য সমস্যা দেখতে পান বলে জানান তিনি। দিনের পর দিন পারিশ্রমিক পেতেন না। অভিনেত্রীর স্বীকারোক্তি, “বুঝলাম, এ বার নিজেকেই ঘুরে দাঁড়াতে হবে। ২০১৪ থেকেই বিজেপি আমাকে চেয়েছিল। শেষপর্যন্ত আমি যোগ দিই।” বেশ কয়েকদিন গেরুয়া শিবিরে থাকার পরে রূপাঞ্জনার অন্য উপলব্ধি হয়। তিনি বললেন, “ইন্ডাস্ট্রির যে সমস্যা তার কোনও সমাধানের পথ দেখছিলাম না। এরা আসলে এমন লোক চাইছিল, যারা শুধু রাজনীতিটাই করবে। ঘৃণার রাজনীতি করতে চাইছিল ওরা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুর্নাম করতেও বলা হয়েছিল। কিন্তু ওঁর সঙ্গে আমার সুসম্পর্ক। আমাকে তিনি কখনও অসম্মান করেননি।”
রূপাঞ্জনা জানান, ২০১৯ সালের পরে বিজেপি থেকে দূরত্ব বৃদ্ধির জন্য আমেরিকা চলে গিয়েছিলেন। ফিরে আসার পরেও তাঁকে দলে সক্রিয় ভাবে যোগ দেওয়ার কথা বলা হতে থাকে। কিন্তু রূপাঞ্জনা তত দিনে বুঝেছিলেন, বিজেপির থেকে তাঁর মতাদর্শ ভিন্ন। তাঁর কথায়, “ওদের উগ্র রাজনীতির সঙ্গে মেলাতে পারছিলাম না। সিপিএমের আমলে এমন দেখিনি। তৃণমূলও সমতা বজায় রাখার চেষ্টা করেছিল। আমি সুস্থ সমাজে থাকতে চাই, যেখানে ধর্ম নিয়ে বিভাজন করা হবে না। তাই মতাদর্শের জন্যই দূরে সরে যাই।”
ফের ২০২৫ সালে তৃণমূলের ২১ জুলাইয়ের মঞ্চে দেখা যায় রূপাঞ্জনাকে। সেই সময়ে কটাক্ষের মুখে পড়তে হয় তাঁকে। অভিনেত্রীর উত্তর, “আমি কোনও রাজনৈতিক দলের থেকে একটা টাকা নিইনি। জনপ্রিয় মুখ দেখে মানুষকে ডাকা হয়। প্রথমে বুঝিনি। পরে দেখলাম, মমতাদি মানুষ হিসাবে অনেক ভাল। কিন্তু তৃণমূল নিয়ে কিছু বলছি না।”
ভবিষ্যতে নিজেকে কোথায় দেখছেন? তৃণমূলেই থাকবেন, না কি নতুন করে ভাববেন? এখনই বা ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে রূপাঞ্জনা? অভিনেত্রীর উত্তর, “বাংলার রাজনীতিতে আমি আর থাকছি না। দেখে নিয়েছি বঙ্গ রাজনীতি। আর নয়। মানুষের কাজ আমি এমনিতেই করি। সেটা চালিয়ে যাব।” তবে কি জাতীয় স্তরে কিছু ভাবছেন রূপাঞ্জনা? তাঁর উত্তর, “যে বিষয়গুলিকে কেন্দ্র করে এখানে রাজনীতি হয়, তাতে আসলে বড় কিছু হয় না। সিপিএমের আমলে অন্তত চেষ্টা করা হয়েছিল শিল্প নিয়ে ভাবার। বেশ কিছু ভাল সংস্থা এসেছিল। তার পরে এই বাংলায় আর কিছু হয়নি। আর ধর্ম নিয়ে যে রাজনীতি হয়, তা অত্যন্ত খারাপ। সংখ্যালঘুদের ছোট করে দেখা হয়। সেই জন্যই দিদির দলে গিয়ে মুক্ত মনে হয়েছিল নিজেকে।”
যদিও জাতীয় স্তরে রাজনীতি করার পরিকল্পনা রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট করেননি রূপাঞ্জনা। বর্তমানে নতুন সরকারকে নিয়ে আশাবাদী তিনি। তাঁর কথায়, “বিজেপি বলেছে, চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে নাক গলাবে না। সিপিএমের আমলেও এই পরিবেশ ছিল না। অনেক স্বাধীন ভাবে কাজ করতাম। তৃণমূলের আমলে কিছু বড় মাথারা এসে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করেছে। বিজেপি সেটা না করলে সাধুবাদ জানাব। সবচেয়ে বেশি শুভেচ্ছা জানাব রুদ্রনীল ঘোষকে। অনেক লড়াই করে এই জায়গায় এসেছে ও। ওর ভাল চাই।”