E-Paper

অগ্নিগর্ভ

২০১৮ সালে তেহরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বেরিয়ে যাওয়ার পর তেল বিক্রয় এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনের উপর আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের অর্থনীতি মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

শেষ আপডেট: ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:০৮

নতুন বছরের শুরু থেকে অগ্নিগর্ভ ইরান। বস্তুত গত বছরের শেষে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শান্তিপূর্ণ ভাবেই গণবিক্ষোভ শুরু হলেও, অচিরেই তা হিংসাত্মক রূপ ধারণ করেছে। ইরানের পুলিশ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর দমননীতির জেরে এ-যাবৎ ৩৬ জন নিহত এবং বারোশোর বেশি মানুষ গ্রেফতার হয়েছেন। বিক্ষোভের মূলে দেশের ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি এবং আমেরিকান ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রা রিয়াল-এর তীব্র অবমূল্যায়ন, যা দুর্বিষহ করে তুলেছে সাধারণ মানুষের জীবনযাপন। এ দিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, ২০২২ সালের মাহশা আমিনির মৃত্যুর পরে নারী-স্বাধীনতা সংক্রান্ত গণবিক্ষোভের মতো এ বারও বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে, ইরানের সরকারকে ছেড়ে কথা বলবেন না। সাম্প্রতিক কালে দেশব্যাপী বিক্ষোভের একের পর এক ঢেউ ইরান সরকার মোকাবিলা করেছে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে। কিন্তু এই প্রথম দেশের শাসক দল আরও জটিল একটি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি— ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং বহিরাগত সামরিক হুমকি।

লক্ষণীয়, ২০১৮ সালে তেহরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বেরিয়ে যাওয়ার পর তেল বিক্রয় এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনের উপর আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের অর্থনীতি মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। গত সেপ্টেম্বরে রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদ নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করার পর, ইরানি মুদ্রার মান আরও কমে যায়। তবে দেশের অর্থনীতির বেহাল দশার এগুলিই একমাত্র কারণ নয়। সে দেশে বিবিধ দুর্নীতির মামলা জনসাধারণের ক্ষোভ বাড়িয়েছে, এবং এই বিশ্বাসকে আরও জোরদার করেছে যে, শাসকগোষ্ঠীর একাংশ এই সঙ্কটকে নিজেদের কাজে লাগাচ্ছে। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক কালে ইরানের বৃহত্তর আঞ্চলিক অবস্থানেরও অবনতি ঘটেছে। ২০২৪-এ শেষে সিরিয়ায় বাশার আল আসাদ-এর পতনের ফলে তেহরান যেমন এক গুরুত্বপূর্ণ মিত্রকে হারিয়েছে, তেমনই ইজ়রায়েলি হামলায় অধিকাংশ শীর্ষ নেতৃত্বকে খুইয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে ইরানের পৃষ্ঠপোষকতায় গঠিত লেবাননের সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিজ়বুল্লা। পাশাপাশি, গত জুনে ইজ়রায়েল ও আমেরিকার যৌথ হামলা ইরানের প্রতিরক্ষা ক্ষমতাকেও মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। অতি সম্প্রতি, আমেরিকার ভেনেজ়ুয়েলা প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো-র সস্ত্রীক অপহরণের অভিযান ইরানের বিদেশে বিকল্পগুলি আরও সঙ্কুচিত করেছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লা আলি খামেনেই বিক্ষোভকারীদের কঠোর ভাবে মোকাবিলা করার কথা বলেছেন বটে, তবে তিনি বিলক্ষণ জানেন এই মুহূর্তে তাঁর আমলের সবচেয়ে অনিশ্চিত মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছেন নিজে। হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের পুনরাগমন এবং ইজ়রায়েলের গাজ়া অভিযানে ট্রাম্পের দেশের সার্বিক সহযোগিতা বুঝিয়ে দিয়েছে, বর্তমান ভূরাজনীতিতে কোনও কূটনৈতিক বা কৌশলগত পথ খোলা নেই তেহরানের জন্য। এ বারের গণবিক্ষোভ হয়তো ইরানের শাসকের পতন ঘটাতে পারবে না, কিন্তু মানুষের জনরোষ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বহিরাগত চাপ এক সঙ্গে তেহরানের সঙ্কটকে বিপজ্জনক ভাবে বেআব্রু করেছে। আপাতত টিকে থাকলেও, ক্রমশই নড়বড়ে তাঁদের বজ্র আঁটুনি।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Tehran Ayatollah Ali Khamenei Ali Khamenei

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy