×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

৩০ জুলাই ২০২১ ই-পেপার

ইস্পাত-কঠিন

২২ জুন ২০২১ ০৫:১২
ফাইল চিত্র।

ফাইল চিত্র।

মৌন সর্বদাই সম্মতির লক্ষণ নহে। কেন্দ্রের ইস্পাতমন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান যে ভাবে পশ্চিমবঙ্গের অর্থমন্ত্রীর প্রশ্ন এড়াইয়াছেন, তাহাতে নীরব অসম্মতির ইঙ্গিতই মিলিতেছে। অমিত মিত্র চিঠিতে আশ্বাস চাহিয়াছিলেন যে, স্টিল অথরিটি অব ইন্ডিয়া (‘সেল’) তাহার কাঁচামাল সরবরাহকারী বিভাগের প্রধান দফতর কলিকাতা হইতে সরাইবে না। উত্তরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী লিখিয়াছেন, দুর্গাপুর এবং বার্নপুরের ইস্পাত কারখানা দুইটি সুলভ মূল্যে আকরিক লৌহ পাইবে, তাহাদের উৎপাদন ব্যাহত হইবে না। মূল প্রশ্নটিতে তিনি নিরুত্তর। কেন দফতর সরাইবার সিদ্ধান্ত, তাহাও ‘সেল’ কর্তৃপক্ষ অথবা ইস্পাত মন্ত্রক জানায় নাই। ইস্পাত শিল্পের এক কর্তা জানাইয়াছেন, কলিকাতার দফতরটি চালাইতে বৎসরে পঞ্চাশ কোটি টাকা খরচ হয়। সেল-এর ওড়িশার খনিগুলি রৌরকেলা ইস্পাত কারখানা, এবং ঝাড়খণ্ডের খনিগুলি বোকারো ইস্পাত কারখানার অধীনে আসিলে খরচ কমিবে। অর্থাৎ যুক্তি ব্যয়সঙ্কোচ, দক্ষতা বৃদ্ধি, পরিচালনায় অধিক পেশাদারিত্বের। তদ্ব্যতীত কেহ বলিতে পারেন, ঔপনিবেশিক আমলে পূর্ব এবং উত্তর-পূর্ব ভারতে কলিকাতাই একমাত্র বড় শহর ছিল। এখন বহু রাজ্যে প্রধান শহরগুলির পরিকাঠামো এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হইয়াছে। কলিকাতা হইতে দফতর সরিতেই পারে।

প্রশ্ন হইল: এই সব যুক্তি কতটা গ্রহণযোগ্য? যদিও ‘সেল’ পরিচালকদের বৈঠকে কলিকাতা হইতে দফতর সরাইবার সিদ্ধান্ত গৃহীত হইয়া গিয়াছে, তবু বিতর্ক উঠিবেই। সেল-এর দফতরটি ঔপনিবেশিক যুগের নহে, তাহা কলিকাতায় স্থাপিত হইয়াছিল ১৯৮৯ সালে। উদ্দেশ্য ছিল সেল-এর ইস্পাত কারখানাগুলির মধ্যে আকরিক লৌহ এবং অন্যান্য খনিজ উপকরণের সুষম বণ্টন। তৎপূর্বে এক একটি কারখানার অধীনে এক বা একাধিক খনি ছিল। মন্দ মানের আকরিক লৌহের খনির সহিত সংযুক্ত কারখানার ইস্পাত উৎপাদন তাহাতে বিঘ্নিত হইত। কেন্দ্রীয় ভাবে খনিজ ক্রয় ও বণ্টনের দ্বারা সব কয়টি কারখানার ইস্পাতের মান বাড়াইবার লক্ষ্য লইয়াছিল ‘সেল’। আজ পুরাতন কাজেই ফিরিতেছে সংস্থাটি: ইস্পাত কারখানার নিয়ন্ত্রণে আনিতেছে খনি পরিচালনা ও খনিজ বণ্টনকে। ইহা কী করিয়া ‘অগ্রগতি’ হইল, স্পষ্ট নহে।

পশ্চিমবঙ্গের জন্য এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ইস্কোর সহিত সেল-এর সংযুক্তিকরণের পরে ২০০৬ সাল হইতে দুর্গাপুর ও বার্নপুরের ইস্পাত কারখানার নিয়ন্ত্রণে কোনও খনি নাই। এই দুইটি সংস্থা রৌরকেলা এবং বোকারোর ইস্পাত কারখানার উপর নির্ভরশীল হইয়া পড়িল। ইহার ঝুঁকি কম নহে। যদি নিয়মিত আকরিক লৌহের জোগান না মেলে, তবে অনেক অধিক দামে তাহা বাজার হইতে ক্রয় করিতে হইবে, যাহা পশ্চিমবঙ্গের দুইটি ইস্পাত উৎপাদককে অলাভজনক সংস্থায় পরিণত করিবে। শিল্পের মানচিত্রে রাজ্যের অধোগতি হইবে, কর্মহীনতা বাড়িবে। আশ্চর্য এই যে, রাজ্যের শিল্প এবং কর্মনিযুক্তির জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি রাজ্য সরকারের সহিত আলোচনা না করিয়াই গৃহীত হইল। ইহা রাজনৈতিক বিরোধিতার পরিণাম, আশঙ্কা করিয়াছেন অমিত মিত্র। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা খাতায়-কলমে স্বতন্ত্র, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গিয়াছে, সেগুলির পরিচালকদের উপর কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের প্রভাব যথেষ্ট। অতএব কলিকাতা হইতে একটি বৃহৎ, লাভজনক বাণিজ্যিক সংস্থার দফতর সরাইবার পশ্চাতে কেবলই ব্যয়সঙ্কোচের লক্ষ্য কাজ করিতেছে কি না, সে প্রশ্ন উঠিতে বাধ্য। নরেন্দ্র মোদীর শাসনকালে একের পর এক বৃহৎ রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা, এবং অন্তত দুইটি বড় ব্যাঙ্কের প্রধান দফতর সরিয়াছে কলিকাতা হইতে। আরও কয়েকটি সংস্থার প্রধান দফতর সরিতে পারে, আশঙ্কা রাজ্যের অর্থমন্ত্রীর। রাজ্যবাসীও এই সংশয়ের শরিক।

Advertisement


Tags:

Advertisement