ভারতীয় রাষ্ট্র এই মুহূর্তে কেন্দ্র বনাম রাজ্য দ্বন্দ্বে যতখানি নিমজ্জিত, স্বাধীন ভারতে তা অভূতপূর্ব বললে খুব ভুল হবে না। নিঃসন্দেহে এসআইআর-সংক্রান্ত সমস্যা ও সঙ্কট এই দ্বন্দ্বের প্রধান মঞ্চ হয়ে উঠেছে। কিন্তু তার সঙ্গে আরও অনেক ক্ষেত্রে চলছে একই রকম দড়ি টানাটানি, যা কার্যত ভারতীয় রাষ্ট্রের যুক্তরাষ্ট্রীয় নীতিটিকে গভীর ভাবে বিপন্ন করে চলেছে। উদাহরণ, সাম্প্রতিক সিএপিএফ বিল। এই বিলে অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ ও সমস্যাজনক অংশ আছে, যেমন বিএসএফ, সিআরপিএফ, সিআইএসএফ ইত্যাদির ক্ষমতা অনেকাংশে খর্ব করে আইপিএস অফিসারদের সংখ্যা ও ক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়াস। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের বিরুদ্ধে গিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের আইপিএস ক্ষমতাবৃদ্ধির এই পদক্ষেপ স্বাভাবিক ভাবেই বহু প্রশ্ন তুলেছে— যার মধ্যে অন্যতম প্রধান উল্লিখিত বাহিনীগুলির মনোবল হ্রাসের সম্ভাবনা। কেন্দ্রাধীন একটি বিভাগের ক্ষমতা অনেক দূর বাড়িয়ে বাকিদের ক্ষমতা হ্রাসের মধ্যে কেন্দ্রীকরণের একটি আপত্তিজনক ঝোঁক অনেকেই দেখতে পাচ্ছেন। উল্লেখ্য, কেন্দ্রের দিক থেকে অন্যতম যুক্তি, আইপিএস অফিসার নিয়োগের অনেক সুবিধার মধ্যে একটি নাকি— কেন্দ্র-রাজ্য ক্ষমতার সামঞ্জস্য রক্ষা।
যুক্তি বস্তুটি বাস্তবিকই কৌতূহলোদ্দীপক। কখন যে কোন যুক্তিটি কোন দিকে কাটে, তা বলা মুশকিল। আপাতদৃষ্টিতে কেন্দ্রীয় সরকারের আইপিএস-বিষয়ক বয়ান শুনলে তা সঙ্গত মনে হওয়াই স্বাভাবিক, এও মনে হওয়া সম্ভব যে কেন্দ্র-রাজ্য সংহতি তথা যু্ক্তরাষ্ট্রীয় নীতি অনুসরণে বর্তমান শাসক অতীব মনোযোগী। অথচ, লক্ষণীয়, এই যুক্তরাষ্ট্রীয় কার্যধারাই কিন্তু প্রবল ভাবে ব্যাহত হচ্ছে বিএসএফ-এর নিয়ন্ত্রণক্ষেত্র বাড়ানোর মাধ্যমে। মনে করা যেতে পারে, এই নরেন্দ্র মোদী সরকারের সৌজন্যেই ২০২১ সালের সংশোধিত বিএসএফ আইনে বিএসএফ-এর নিয়ন্ত্রণ ১৫ কিলোমিটার থেকে বাড়িয়ে ৫০ কিলোমিটার করা হয়েছিল, যার ফলে রাজ্য সরকারগুলির নিয়ন্ত্রণ থেকে অনেকখানি জায়গা বেরিয়ে গিয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের মতো বিরোধীশাসিত রাজ্যে এ নিয়ে বড় দ্বন্দ্বের পরিসর তৈরি হয়েছিল, কেননা প্রাদেশিক ক্ষমতা সঙ্কোচনের নিশ্চিত অর্থ— যুক্তরাষ্ট্রীয় নীতি থেকে বিচ্যুতি। ২০২১ সালের পর পশ্চিমবঙ্গ ও পঞ্জাব থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে রাজ্য সরকারের ক্ষমতাপরিসরে হস্তক্ষেপের অভিযোগ তোলা হয়েছিল। স্বভাবতই, কেন্দ্রীয় শাসক দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ফুৎকারে সেই বিরোধিতা উড়ে যেতে বিলম্ব হয়নি।
গত বুধবার রাজ্যসভায় বিরোধী দলগুলির প্রবল আপত্তির মধ্যেই সিএপিএফ বিল পেশ হল। তৃণমূল কংগ্রেস ও অন্য বিরোধী দলগুলি সঙ্গত প্রশ্ন তুলেছে: কেন এমন একটি গুরুতর বিল আনার আগে অন্য দলগুলিকে জানানো পর্যন্ত হয়নি, কেন কোনও আলোচনার সুযোগ দেওয়া হয়নি— এ কি সংসদীয় কার্যধারা অমান্য করা নয়? ‘সংসদীয় কার্যধারা’ বলতে যা বোঝায়, গত বারো বছরের মোদী জমানায় অবশ্য অতি স্বল্পই তার দেখা মিলেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিল সম্পূর্ণ বিনা আলোচনায়, কিংবা অত্যল্প আলোচনার পরই পাশ করা হয়েছে। এমনকি, যে সমস্ত বিষয়ে সরাসরি রাজ্যের স্বার্থ জড়িত, তেমন ক্ষেত্রগুলিও বাদ পড়েনি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে কেন্দ্র ও রাজ্য উভয়ের স্বার্থই প্রত্যক্ষ ও গুরুতর, ঠিক যেমন পঞ্জাব, অসম বা পশ্চিমবঙ্গের আন্তর্জাতিক সীমানা নিয়ে কেন্দ্রের মাথাব্যথা সহজবোধ্য। বিশেষত বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সেই উদ্বেগ নিঃসন্দেহে অনেকাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও রাজ্যের সঙ্গে যথাযোগ্য আলোচনা ব্যতীত রাজ্যের ক্ষমতা সঙ্কুচিত করে রাজ্যের ভূমিতে কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো চলে না, কেন্দ্রীয় বাহিনীর একচেটিয়া তত্ত্বাবধান কায়েম করা যায় না। যুক্তরাষ্ট্রীয় ভারতের মূলে কুঠার হানছে বর্তমান সরকার।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)