E-Paper

বিচ্যুত

১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি সংবিধান সভার শেষ বৈঠকে সদ্যমনোনীত রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ ও প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু একত্রে ব্রিটিশ ডমিনিয়ন থেকে ভারতীয় প্রজাতন্ত্রে পরিণত হওয়ার মুহূর্তটি রচনা করেছিলেন।

শেষ আপডেট: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:১৬

সাম্রাজ্যবাদী শাসকের কব্জা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর ভারতভূমির যে নতুন যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেখানে প্রধান যে নীতিগুলি সামনে রাখা হয়েছিল, তার মধ্যে ছিল গণতন্ত্র, প্রজাতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। স্বভাবতই প্রথম ও তৃতীয় নীতি নিয়ে যত আলাপ-আলোচনা তর্ক-বিতর্ক শোনা যায়, প্রজাতন্ত্র নিয়ে তার সিকি ভাগও নয়। ছাব্বিশে জানুয়ারি প্রজাতন্ত্র দিবসের বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান ছাড়া এই শব্দটি সাধারণত জনপরিসরে শোনা যায় না। তার কারণ এই নয় যে, প্রজাতন্ত্রের নীতিটি বিতর্কোর্ধ্ব। বরং, এমন ভাবার অবকাশও আছে যে প্রজাতন্ত্র এতটাই বিপন্ন ও অরক্ষিত হয়ে পড়ছে দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে যে, তা নিয়ে ভাবনাচিন্তার পরিসরটিও আর রাখা হচ্ছে না। এই বিশাল দেশের নানা প্রান্তের জনসমাজকে যে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে, সেই রাষ্ট্রে যে তাদেরই অধিকার সর্বোচ্চ ও প্রশ্নাতীত, শাসক যে এখানে রাজা নয়, কেবল প্রজানিযুক্ত বা জনসাধারণ দ্বারা নিযুক্ত— এই বোধটি ইদানীং কালে গভীর ভাবে বিপন্ন। জনসমাজ থেকে তা হারিয়ে যেতে বসেছে বলেই এই আলোচনাও হারিয়ে যেতে বসেছে। এই কারণে ৭৭তম ভারতীয় প্রজাতন্ত্র দিবসে ভারতের প্রজাতন্ত্রের ভবিষ্যৎটিকে আবার গোড়া থেকে পর্যালোচনা অত্যন্ত জরুরি।

১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি সংবিধান সভার শেষ বৈঠকে সদ্যমনোনীত রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ ও প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু একত্রে ব্রিটিশ ডমিনিয়ন থেকে ভারতীয় প্রজাতন্ত্রে পরিণত হওয়ার মুহূর্তটি রচনা করেছিলেন। নেহরু বলেছিলেন: পুরনো পর্ব এখানেই শেষ হল, এ বার নতুন দেশের অপেক্ষা…। সংবিধান সভার উপর যবনিকাপাত হল, কনস্টিটিউশন হল-এর আলোগুলি নিবিয়ে দেওয়া হল। আবার যখন আলো জ্বলল, তা নতুন ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের আলো, যেখানে প্রতি দেশবাসীর কথা বলার অধিকার, মতপ্রকাশের অধিকার, রাষ্ট্রের অঙ্গীভূত হওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হল— অন্তত তেমনই ঘোষণা ছিল ভারতের সংবিধানে। সংবিধানকে একটি মুহূর্তে বেঁধে না ফেলে দেশবাসীর কথা মনে রেখে তাদের সুস্থতর ও ন্যায্যতর জীবনের জন্য সংবিধানকেও অঙ্গীকৃত করা হল। তখনও ভারতীয় নারীদের অধিকার সম্পূর্ণত স্বীকৃত নয়, তখনও দেশের বহু জনগোষ্ঠী স্বাস্থ্য-শিক্ষা-জীবিকার অধিকারবঞ্চিত। ফলে সংবিধানকে সেই মুহূর্তে লৌহবন্ধনে বেঁধে তাকে ‘কোডিফাই’ না করে, বরং জনকল্যাণের লক্ষ্যে তার মূল নীতিগুলি অবলম্বন করে যাতে এগোনো যায়, সেই জন্য অনেকখানি নমনীয়তা রাখা হল। এই নমনীয়তা ভারতীয় সংবিধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য— সাম্প্রতিক সংবিধান-গবেষকরা বলেন। ভারতের যে বিশাল বিপুল জনসমাজ শিক্ষালোকবঞ্চিত, দারিদ্রপীড়িত, অধিকার-অসচেতন অবস্থাতেই একটি গণতান্ত্রিক প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ‘নাগরিক’ হিসাবে চিহ্নিত হলেন, তাঁদের ক্রমশ সচেতন করার সম্ভাবনা তৈরি হল এই নমনীয় সংবিধানের মাধ্যমে।

প্রশ্ন হল, যে সংবিধান মানুষকে অধিকার দিয়েছে, সেই সংবিধানে মানুষেরই অধিকার, কোন পথে এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্থাপন করা সম্ভব। কে নাগরিক, কে নয়— তা নিয়েই যখন দেশ তোলপাড়, তখন সেই সম্পর্ক কী ভাবেই বা পুনরর্জন করা যায়। সাধারণ মানুষের মনে এ সব প্রশ্ন থাকলেও কোন পথে সেগুলি তুলতে হবে তাঁরা জানেন না, সুতরাং তাঁদের কথা শোনা, বলা এবং পৌঁছে দেওয়ার কাজটি সামাজিক ও রাজনৈতিক সমাজেরই, সংবাদমাধ্যমেরও। এই দায়িত্ব পালনে ত্রুটি ঘটলে তা কেবল স্খলন নয়, তা এক মহা অপরাধ। ভারতীয় রাষ্ট্র প্রজাতান্ত্রিক, তার সর্বোচ্চ দায় জনসাধারণের কাছে— যে জনসাধারণ কোনও অদৃশ্য বা অনুভবাতীত সমষ্টি নয়, বরং রক্তমাংসে তৈরি ব্যক্তিমানুষের সমাহার। সেই মানুষের স্বার্থ এবং অধিকার অস্বীকৃত হলে সেও কি এক প্রকার ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতা’ নয়?

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Democracy Republic day

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy