E-Paper

সঙ্কট

ফসলের বাজার চলা উচিত তার নিজস্ব নিয়মে। সরকারের ভূমিকা সেখানে নির্ণায়ক হয়ে ওঠা কাম্য নয়। কিন্তু আলুর ক্ষেত্রে সরকারি নিয়ন্ত্রণ অনেকখানি— ফসল মজুতের ব্যবস্থা, রফতানি এবং দাম নির্ধারণ, সবেতেই প্রাধান্য পায় সরকারি সিদ্ধান্ত।

শেষ আপডেট: ২৩ মার্চ ২০২৬ ০৬:৫৪

রাখাল আড়ি স্ত্রীর গয়না বন্ধক দিয়ে চার বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। ফলন হয়েছিল ভাল, কিন্তু বাজারে আলুর দাম তলানিতে, তাই আত্মহত্যা করেছেন মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনার ওই ভাগচাষি। সংবাদটি মর্মন্তুদ, তবে তা মনোযোগ দাবি করে অন্য একটি কারণে। তা হল, রাখালের পরিবারকে দু’লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্য পাঠিয়েছেন তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তা হলে পশ্চিমবঙ্গ সরকার কি একে ‘কৃষক আত্মহত্যা’ বলে স্বীকার করছে? গত এক দশকেরও বেশি সময়ে জাতীয় ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর কাছে প্রেরিত তথ্যে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ‘কৃষক আত্মহত্যা’র খাতে যে সংখ্যাটি দেখিয়ে আসছে, তা হল শূন্য। সরকারি তদন্তে কৃষক আত্মহত্যার ঘটনাগুলি হয়ে ওঠে পারিবারিক অশান্তির পরিণাম। দলের তহবিল থেকে আত্মঘাতী চাষিকে ‘আর্থিক সহায়তা’ অতএব এক কৌশলী চাল; তাতে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষোভ সামাল দেওয়া গেল, আবার চাষের চূড়ান্ত বিপর্যয়ে রাজ্যের দায়ও স্বীকার করতে হল না। অন্যান্য রাজ্যে আত্মঘাতী কৃষকের পরিবারকে সহায়তা দেওয়া হয় রাজকোষ থেকে, তার অঙ্ক অন্ধ্রপ্রদেশে ৭ লক্ষ টাকা, উত্তরপ্রদেশ, কর্নাটকে ৫ লক্ষ টাকা। কিন্তু টাকার অঙ্কটা বড় কথা নয়, সরকারের তরফে এই ক্ষতিপূরণ বস্তুত রাজ্যের কৃষিক্ষেত্রে সঙ্কটের সরকারি স্বীকৃতি। পশ্চিমবঙ্গ শূন্য আত্মহত্যা দেখিয়ে রাজ্যের কৃষিক্ষেত্রকে সঙ্কটশূন্য দেখানোর যে চেষ্টা চালাচ্ছে, রাখালের মৃত্যু সম্ভবত তাতে পরিবর্তন আনতে পারবে না।

ফসলের বাজার চলা উচিত তার নিজস্ব নিয়মে। সরকারের ভূমিকা সেখানে নির্ণায়ক হয়ে ওঠা কাম্য নয়। কিন্তু আলুর ক্ষেত্রে সরকারি নিয়ন্ত্রণ অনেকখানি— ফসল মজুতের ব্যবস্থা, রফতানি এবং দাম নির্ধারণ, সবেতেই প্রাধান্য পায় সরকারি সিদ্ধান্ত। পাশাপাশি, আলু চাষের মরসুমে বীজ, সার প্রভৃতির কালোবাজারি প্রায় বাঁধাধরা, সেই অসাধু চক্রের নিয়ন্ত্রণেও সরকার ব্যর্থ। ফলে আলু চাষে বিপর্যয়ের দায় অনেকটাই এসে পড়ে সরকারের উপরে। এ বছর রাজ্যে প্রায় দেড় কোটি টন আলু উৎপাদন হয়েছে, গত বছরের থেকে ৩০ শতাংশ বেশি। রাজ্যের হিমঘরে এত আলু মজুত করার জায়গা নেই। ফলে খোলা বাজারে আলুর যা দাম, তাতে উপকরণের খরচের অর্ধেকও উঠছে না, চাষির শ্রমের মূল্য তো দূরের কথা। লক্ষণীয়, সরকার যে দাম ঘোষণা করেছে (৯৫০ টাকা কুইন্টাল) তাতেও শ্রমের মূল্য স্থান পায়নি। উপরন্তু, সরকার মাত্র ১২ লক্ষ টন আলু কেনার লক্ষ্য নিয়েছে। অভাবী বিক্রি আটকাতে তা পর্যাপ্ত কি না, সে প্রশ্ন উঠতে বাধ্য। উপরন্তু, সহায়ক মূল্যে আলু কেনার আর্থিক দায় প্রাথমিক ভাবে এসে পড়েছে হিমঘর মালিকদের উপরে। মালিকদের নানা সংগঠনের দরদস্তুরে নষ্ট হয়েছে অনেকখানি সময়। তার মধ্যে ঠিকা চাষি, ভাগচাষি, ক্ষুদ্র চাষিরা হয় বিপুল ক্ষতিতে ব্যবসায়ীর কাছে আলু বিক্রিতে বাধ্য হয়েছেন, না হলে আলু ফেলে রেখেছেন মাঠে।

এক সময়ে পশ্চিমবঙ্গের আলুর ভাল বাজার ছিল ভিন রাজ্যে। ২০১৪ সালে আলুর দাম নিয়ন্ত্রণ করার তাগিদে রাজ্যের সীমান্তে পুলিশি ধরপাকড় করে আলুর ট্রাক আটকায় তৃণমূল সরকার। তার পর নানা সময়ে আলু রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এর ফলে ওড়িশা, ঝাড়খণ্ডের মতো রাজ্যে পশ্চিমবঙ্গের আলুর বাজার অনেকটাই নষ্ট হয়েছে। আলুর দাম কম রাখার রাজনৈতিক লক্ষ্য আলু ব্যবসায়ী ও চাষি, দু’তরফকেই বিপন্ন করেছে। পাশাপাশি, কেন্দ্র ২২-২৩টি ফসলের সহায়ক মূল্য ঘোষণা করলেও রাজ্য কেন প্রধানত ধান, এবং কিছু পাট ক্রয়েই সীমাবদ্ধ থাকে, সে প্রশ্নটাও করা দরকার। সহায়ক মূল্যে তৈলবীজ, ডাল প্রভৃতির ক্রয়ে বৃদ্ধি চাষিকে ভিন্ন ধরনের চাষে উৎসাহিত করবে, ধান-আলুর উপর নির্ভরতা কমাবে। নিষেধাজ্ঞা জারি করে বাজারকে বিপর্যস্ত না করে, ফসল-বৈচিত্র এনে চাষকে লাভজনক করতে সহায়ক মূল্যকে ব্যবহার করুক সরকার।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Farmers Death Farmers Indian Agricultural West Bengal government potato farmers

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy