E-Paper

মুখের ভাষা

ভাষার সেতুবন্ধ গড়ে জনসংযোগই উদ্দেশ্য, এমন ভাবাটা ভুল নয়, তবে তা শেষ কথাও নয়।

শেষ আপডেট: ২৭ মার্চ ২০২৬ ০৯:২৫
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

কোচবিহারে জেলা প্রশাসন আসন্ন বিধানসভা ভোটের জন্য মোতায়েন কেন্দ্রীয় বাহিনীকে বলেছে, প্রথামাফিক টহল তথা রুট মার্চের সময় স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করতে: ‘কেমন আছেন?’, ‘ভাল আছেন তো?’, ‘সব কিছু ঠিক আছে তো?’ ইত্যাদি বাংলা বাক্যগুলি শিখে তার প্রয়োগ করতে। শুধু তা-ই নয়, রুটিন টহলের সময় তাঁরা যেন গ্রামে ও শহরে, বাজারঘাট ও অন্য প্রকাশ্য স্থানে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে স্বাভাবিক হাবভাব বজায় রাখেন, শিশুদের সঙ্গে আন্তরিক আচরণ করেন, বলা হয়েছে তা-ও। ভোটের আবহে জনজীবনে অনেক সময় যে উত্তেজনা ও ভয়ের আবহ তৈরি হয়, কেন্দ্রীয় বাহিনীর আগমন ও উপস্থিতিতে তা যাতে বেড়ে না যায়, তাই এই পরামর্শ। তদুপরি অবাঙালি সেনা বাংলা ভাষায় টুকটাক কথা বললে, যন্ত্রবৎ বা পাথরের মতো মুখ করে না থেকে একটু হাসলে তা দু’পক্ষের অপরিচয়ের বরফ গলাতে সাহায্য করবে, সেও বোধগম্য।

ভাষার সেতুবন্ধ গড়ে জনসংযোগই উদ্দেশ্য, এমন ভাবাটা ভুল নয়, তবে তা শেষ কথাও নয়। পাঁচ বছর আগের শীতলকুচির স্মৃতি এখনও মুছে যায়নি— ২০২১-এর বিধানসভা ভোট চলাকালীন কোচবিহারেরই এই জায়গাটির এক ভোটকেন্দ্রে উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে কর্তব্যরত সিআইএসএফ কর্মী গুলি চালালে চার জন সাধারণ নাগরিক মারা গিয়েছিলেন। পঞ্চায়েত, বিধানসভা বা লোকসভা যে নির্বাচনই হোক, পশ্চিমবঙ্গে ভোট-হিংসা নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে, কোচবিহারের মতো এ রাজ্যের কিছু কিছু এলাকা ভোট-হিংসার জেরে বিশেষ স্পর্শকাতর বলেও চিহ্নিত। তা বলে ভোটকেন্দ্রে শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষণের দায়ভার যাঁদের, তাঁদেরই হাতে সাধারণ মানুষের রক্ত ঝরাটা যেমন দুর্ভাগ্যের, তারও বেশি আতঙ্কের— এবং এমন একটি ঘটনাই মানুষের ভবিষ্যৎ বিশ্বাস ও ভরসার ভিত নড়িয়ে দিতে পারে। কোচবিহার জেলা প্রশাসনের মাথায় সে ভাবনা যে থাকবে না তা মনে হয় না, এ বার ভোটের আগে কেন্দ্রীয় বাহিনীর আধিকারিকদের সঙ্গে সভায় তাই আলাদা করে ভাষিক ও আন্তরিক জনসংযোগের উপর জোর দেওয়া হল।

ভারতের মতো দেশে বহুভাষা-সংস্কৃতি যেমন তার সৌন্দর্য, ভাষা-রাজনীতি তেমনই এক গুরুতর সমস্যাও— বাংলা ও হিন্দি, কিংবা হিন্দি ও দক্ষিণী ভাষাগুলির সাম্প্রতিক বনামতন্ত্র রাজনীতি ছাপিয়ে জনজীবনেও প্রভাব ফেলছে। বিশেষত ভোটের আবহে ভাষার ভিন্নতা রীতিমতো চর্চিত ব্যাপার, অন্য বড় বিষয়গুলির পাশাপাশি প্রার্থীদের ভাষিক পরিচিতি রাজনৈতিক দলগুলির প্রচার-বয়ানে বড় জায়গা নিচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক কালের নির্বাচনী আবহে ভাষা এক অনস্বীকার্য ‘অস্ত্র’, কিন্তু এত কাল তা মূলত নির্বাচনে প্রার্থীদের মাপজোখেই প্রযুক্ত হত। ভোট-পূর্ব কোচবিহারে এই ধারায় নতুন উদাহরণ যুক্ত হল— ভিন্নভাষী সেনাকর্মীরা যদি বাংলা ভাষায় আন্তরিক ভাবে কথা বলেন, তবে সাধারণ মানুষের একটু হলেও স্বস্তি মেলে। এই স্বস্তি বহুকাঙ্ক্ষিত, এবং অধরা— এ রাজ্যের নেতা, মন্ত্রী ও জনপ্রতিনিধিদের মুখের ভাষা ইদানীং যা দাঁড়িয়েছে, তাতে সাধারণ মানুষের স্বস্তি মেলে না, লজ্জা বাড়ে। এই বাজারে কিছু দিনের জন্য ভোট সামলাতে আসা সশস্ত্র কেন্দ্রীয় বাহিনীর মুখে বাংলায় ‘চিন্তা করবেন না’ শোনা-ও শান্তির— সে যতই প্রশাসনের শিখিয়ে-পড়িয়ে দেওয়া লব্জ হোক।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

central force Cooch Behar

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy