বিশেষ ভাবে সক্ষমদের সমাজের মূল স্রোতের অংশ করে তোলা এবং তাঁদের দৈনন্দিন যাপনে স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে আসা কল্যাণকামী রাষ্ট্রের কর্তব্য। অথচ এ দেশে ২০১৬ সালের প্রতিবন্ধী মানুষদের অধিকার সুরক্ষা আইনের উপস্থিতি সত্ত্বেও তাঁদের সুরক্ষা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করার প্রচেষ্টাটির দেখা মেলে না হামেশাই। সম্প্রতি যেমন দেখা গেল কুলিক এক্সপ্রেসে বিশেষ ভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের জন্য নির্দিষ্ট কামরা প্ল্যাটফর্মের বাইরে থাকার অভিযোগ জানিয়েছেন দুই দৃষ্টিহীন যাত্রী। হাওড়া স্টেশনে ট্রেনটিতে প্রতিবন্ধী কামরা প্ল্যাটফর্ম ছাড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকায় ট্রেনে উঠতে অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছিলেন তাঁদের মতো অনেকেই। এই ঘটনাকে নিছক ভ্রান্তি বললে সমস্যাটিকে লঘু করে তোলা হয়। ট্রেনের কামরা প্ল্যাটফর্মের বাইরে থাকলে সাধারণ যাত্রীদেরও প্রবল অসুবিধায় পড়ার কথা। বিশেষ ভাবে সক্ষমদের ক্ষেত্রে সমস্যাটি কত গুণ বৃদ্ধি পেতে পারে, তা বলা বাহুল্য। তা সত্ত্বেও যে এমন কামরাকে ট্রেনের একেবারে শেষে ঠাঁই দেওয়া হল, এবং অভিযোগ না-জানানো অবধি বিশেষ ভাবে সক্ষম যাত্রীদের অসুবিধার দিকটি ভাবাও হল না, তাতেই তাঁদের প্রতি প্রশাসনিক স্তরে সমানুভূতির অভাবটি প্রকট হয়ে ওঠে।
রাষ্ট্রের আধুনিক হয়ে ওঠা শুধুমাত্র ডিজিটাল দুনিয়ায় তার স্বচ্ছন্দ বিচরণেই নির্ধারিত হয় না। সমাজের দুর্বলতর অংশকে যে দেশ, সমাজ উপযুক্ত সম্মান জানাতে শেখে, সে-ই প্রকৃতার্থে উদার, আধুনিক। সেই মাপকাঠিতে ভারত এখনও পিছিয়ে। ক’টি সাধারণ স্কুলে বিশেষ ভাবে সক্ষম শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো রয়েছে? বিশেষ ভাবে প্রশিক্ষিত স্পেশাল এডুকেটরের অভাবের কথা ইতিপূর্বে বহু আলোচিত। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধীদের চলাফেরার উপযোগী র্যাম্প, পৃথক শৌচালয়ের ব্যবস্থা সীমিত হওয়ায় অনেকেরই উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন অধরা থেকে যায়। এই সবই অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার পথে প্রতিবন্ধকতা স্বরূপ। উপেক্ষা আরও নানাবিধ। রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের পূর্বে বিভিন্ন সামাজিক কল্যাণমূলক প্রকল্পে বরাদ্দ বৃদ্ধি হলেও প্রতিবন্ধী ভাতা সেই তালিকায় জায়গা পায়নি। প্রধান বিরোধী দলগুলির নির্বাচনী ইস্তাহারে তাঁদের জন্য কোনও সুস্পষ্ট, সুসংহত নীতির উল্লেখও নেই। অথচ, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন সংক্রান্ত হয়রানি থেকে তাঁদের ছাড় মেলেনি।
গণপরিবহণ, এখনও, হুইলচেয়ারে আসীনদের যাতায়াতের পক্ষে উপযুক্ত নয়। ফুটব্রিজ, আন্ডারপাসগুলিতে চলমান সিঁড়ি হয় নেই, নয়তো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অকেজো। প্রতিবন্ধী-অধিকার সমাজের এই শ্রেণির মানুষদের স্বনির্ভরতা, মর্যাদার কথা বলে। অথচ, বাস্তব চিত্র তার উল্টো সাক্ষ্য দেয়। ভারতীয় রেলের সামগ্রিক অব্যবস্থাও এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য। প্রায়শই প্ল্যাটফর্ম থেকে ট্রেনের কামরার উচ্চতা বেশি হওয়ায় ওঠা-নামার সমস্যা, অশক্ত, শারীরিক সমস্যাযুক্তদের উঁচু বার্থে ওঠার অসুবিধা, স্টেশনে পর্যাপ্ত হুইলচেয়ার, যাত্রীবহনের গাড়ির অভাব, অকেজো লিফ্ট ট্রেনে যাতায়াতকে সমস্যাসঙ্কুল করে তোলে। অথচ, এ দেশের এক বৃহৎ সংখ্যক মানুষ যাতায়াতের জন্য রেলের উপরেই নির্ভরশীল। এবং তাঁদের সকলেই সক্ষম, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী নন। রেলকে সর্বসাধারণের ব্যবহারের উপযোগী করে তুলতে হলে যাত্রী-স্বাচ্ছন্দ্যের বিভিন্ন দিক নিয়ে সদর্থক ভাবনা প্রয়োজন। অবিলম্বে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)