সাধারণত বৈশাখের সঙ্গে রুদ্র শব্দটি যায় ভাল, কবিতায়, গানে, এমনকি গদ্যেও— বৈশাখের মৃদুমন্দ হাওয়া, আম্রমুকুলসৌরভ কিংবা কালবৈশাখীর হঠাৎ-পাওয়া ধনের পাশাপাশিই অনায়াস সেই রুদ্রের স্থান। তবে কিছু কিছু বৈশাখ ব্যাপকতর অর্থে রুদ্র, যেমন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের সূচনা। এই মুহূর্তে বাঙালি বিশ্ব বিপুল সঙ্কটের মধ্য দিয়ে চলেছে, সীমান্তের এ-পারে ও-পারে দুই বাংলাতেই, এবং দুই পারেই চলেছে তার তীব্র মোকাবিলা। বাঙালির আত্মপরিচয় সংক্রান্ত প্রশ্নে আর সংশয়ে দীর্ণ এখন দুই দেশের বাঙালি। তবে যে কোনও সংশয়ের মধ্যেই থাকে বিচার-বিবেচনার নতুন সম্ভাবনা, তাই এই সময়টি নবোদ্যমে নিজেদের দিকে ফিরে তাকানোর সময়ও বটে। মনে রাখার সময় যে, রবীন্দ্র-অধ্যুষিত নববর্ষ উদ্যাপনের বহু দশকব্যাপী নাগরিক রীতি, ‘এসো হে বৈশাখ’ সহযোগে প্রভাতফেরি, কিংবা সান্ধ্য সাংস্কৃতিক আসর, শুভ নববর্ষ বার্তার তুমুল আদানপ্রদান, অলঙ্কৃত ঘট ও রঙিন হাতপাখা সজ্জিত খাদ্যবিপণির বাঙালি ভোজ, বহু কলরবের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি, এর সবই অতিপরিচিত ও অতিব্যবহৃত হলেও অপ্রয়োজনীয় কিংবা মূল্যহীন নয়। কেননা, আজকের সঙ্কটের সামনে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট— নতুন প্রজন্মের বাঙালি কিংবা বাংলাবাসী পুত্রকন্যাদেরও এই সংস্কৃতি-রীতির সঙ্গে পরিচিত করা একটি বড় কাজ। কে-ই বা অস্বীকার করে যে, এই ধরনের উদ্যাপনের মধ্য দিয়েই একটি জাতির আত্মপরিচয় তৈরি হয়, শিকড়চেতনা জন্মায়। এই সব উৎসব চেতনাই ব্যক্তি ও সমষ্টি উভয়কে আত্মপ্রত্যয়ের পথে এগিয়ে দিতে পারে, কিছু দূর হলেও।
তবে এও মনে রাখতে হবে, এ-হেন উদ্যাপনের বিপদও কম নয়। উদ্যাপন যদি সমানেই বিনোদনে পরিণত হয়— যা বিশ্বায়িত ধনবাদী সমাজে অধুনা সর্বদা ও সর্বথা হয়ে থাকে— তা হলে সহজেই তা নিছক ব্যক্তিকেন্দ্রিক সঙ্কীর্ণ জীবনশৈলীতে রূপান্তরিত হয়ে যেতে পারে। ফলে এক স্বতন্ত্র উদ্যাপনও জরুরি, যে উদ্যাপনের সতর্ক আত্মদর্শন বাঙালিকে মনে করিয়ে দিতে পারে যে দুই পারের বাংলাতেই কিন্তু নববর্ষ উৎসবটি কেবল বাঙালি উচ্চশ্রেণির সংস্কৃতিতে সীমাবদ্ধ নয়, এমনকি তার থেকে উৎসারিতও নয়, বরং এর মূলটি বিছিয়ে আছে অনেক গভীরে, দেশজ সংস্কৃতির শিকড়ে। সাম্প্রতিক কালে কলকাতা ও ঢাকা শহরে মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে— যে বিতর্ক অতিক্রম করে বাঙালি বর্ষবরণের সামূহিক আনন্দময়তাকে অক্ষুণ্ণ রাখা নিঃসন্দেহে উচিত কাজ। কিন্তু তার সঙ্গে, তাকে পেরিয়ে বর্ষবরণের দেশীয় ধারাটিকে স্মরণ করা ও তার মর্যাদা রক্ষা করাও সমধিক জরুরি। কোন সময় থেকে বঙ্গাব্দ শুরু, কোন রাজার সৌজন্যে সেই সূচনা হয়েছিল, ইত্যাকার বিতর্কে সময়াতিপাত না করে বরং মনে রাখা দরকার, কী ভাবে অনেক শতক ধরে বৈশাখ মানেই বাংলার গ্রামীণ মেলা, হালখাতা, যাত্রাগান, পালাগান, পুতুলনাচ, লোকসঙ্গীত সমগ্র বাংলাদেশের কোণে কোণে বিচিত্র সমারোহে উদ্ভাসিত। লোকসংস্কৃতিই যে কোনও অঞ্চলের প্রকৃত চরিত্র নির্ধারণ করে, তাই সে দিকে তাকালেই আজকের বিভিন্ন তর্কের মূলে পৌঁছনো সম্ভব। নববর্ষ আসলে বাঙালি হিন্দুর উৎসব— এই মর্মে বাংলাদেশে যে আপত্তি ইতস্তত উঠে আসে সেই পূর্ব পাকিস্তান আমল থেকেই, কখনও প্রবল স্বরে, কখনও স্তিমিত ভাবে, তারও প্রতিবাদ দরকার। দেশজ বর্ষবরণের ধারাটিই দেখিয়ে দেয়, দুই বাংলার হিন্দু ও মুসলমান সমাজ জুড়ে বৈশাখ আবাহনের সাদৃশ্য ও সামঞ্জস্য। ফলে আনুষ্ঠানিকতা প্রয়োজনীয় হলেও যে সকল প্রথা বা প্রচলন নাগরিক আনুষ্ঠানিকতার বাইরে থেকে যায়, তাদের উদ্ধার করা এখন বাঙালির একটি ‘রুদ্র’ সাংস্কৃতিক কর্তব্য।
এই সাংস্কৃতিক কর্তব্য ক্রমে আরও গুরুতর হয়ে উঠেছে যে-হেতু ধর্মবিভেদ, শ্রেণিবিভেদ, জাতিবিভেদ এখন প্রত্যহ আরও বেশি করে বাঙালি সমাজকে ভাগ করার জন্য উদ্যত। তাই ধর্মে ভিন্ন হলেও ভাষায়, খাদ্যাভ্যাসে, পোশাকে, জীবনাচরণে, সর্বোপরি দেশাত্মবোধে নানা বাঙালির মধ্যে কতখানি মিল, তা তুলে ধরা দরকার। ধর্মবোধ সামূহিক হলেও ধর্ম-রাজনীতি কেবল বিপজ্জনক নয়, অন্যায়— সে কথা সবলে সজোরে ‘রুদ্র’ ভাবে প্রতিষ্ঠা করা দরকার। সব ভাষাসংস্কৃতিতেই অভ্যন্তরীণ বিভেদ-বিচ্ছেদ থাকে, বাংলা ভাষার ক্ষেত্রেও আছে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, বাংলা ভাষা ও বাংলা সংস্কৃতির উদার রূপ ও ঐতিহ্যকে সামনে রেখেও অভ্যন্তরীণ উপসত্তাগুলিকে মর্যাদা ও গুরুত্ব দেওয়া যায় না। বাঙালি বুঝে নিক, অনেক দায়িত্ব এখন তার স্কন্ধে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)