E-Paper

সুপরামর্শের পর

সমীক্ষার মতে, শুধু পরিষেবা রফতানির উপরে জোর দিলে চলবে না— যদি কর্মসংস্থান বাড়াতে হয়, টাকার বিনিময়-মূল্যকে স্থিতিশীল করতে হয়, তা হলে পণ্য উৎপাদনে জোর দেওয়া অপরিহার্য।

শেষ আপডেট: ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ ০৫:৩৯

অভিজ্ঞতাকে সাক্ষী মানলে বলতে হয়, অদূর ভবিষ্যতে ভারতীয় অর্থব্যবস্থার গতিপথের নির্দেশক হিসাবে বাজেটের দু’দিন আগে প্রকাশিত অর্থনৈতিক সমীক্ষা নামক নথিটির গুরুত্ব বিপুল নয়। সমীক্ষায় যা বলা হয়, আর সরকার শেষ পর্যন্ত যে পথে চলে, তার মধ্যে প্রায়শই দূরত্ব থাকে। কিন্তু, সে কথাটি সরিয়ে রাখলে বলতে হয়, এ বছরের অর্থনৈতিক সমীক্ষা যে পথে চলার প্রস্তাব করেছে, তাকে মান্য করলে দীর্ঘমেয়াদে ভারতীয় অর্থব্যবস্থা লাভবান হবে। সাম্প্রতিক ঘটনাক্রমে বৈশ্বিক অর্থনীতির মঞ্চ যতখানি টালমাটাল হয়েছে, সমীক্ষা তার কথা মাথায় রেখেছে। এবং, জানিয়েছে যে, এই পরিবেশে টিকে থাকতে হলে ভারতকে যে শুধু বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আরও মনোযোগী হতে হবে, তা-ই নয়, বৈশ্বিক মূল্য-শৃঙ্খলের তুলনায় উপরে থাকা পণ্য উৎপাদনের দিকে জোর দিতে হবে। সমীক্ষার মতে, শুধু পরিষেবা রফতানির উপরে জোর দিলে চলবে না— যদি কর্মসংস্থান বাড়াতে হয়, টাকার বিনিময়-মূল্যকে স্থিতিশীল করতে হয়, তা হলে পণ্য উৎপাদনে জোর দেওয়া অপরিহার্য।

সমস্যা হল, এই ভাল কথাগুলির ফাঁকে ফাঁকে লুকিয়ে রাখা আছে বেশ কয়েকটি গোলমেলে অবস্থান। যেমন, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা রয়েছে, এমন শ্রমনিবিড় শিল্পে নিয়োগকেই কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পথ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এবং, একই সঙ্গে বলা হয়েছে, নেহাত শ্রমিকের হাতে টাকা তুলে দেওয়ার জন্যই যেন কর্মসংস্থান করা না-হয়। ব্যাখ্যাটি দ্ব্যর্থহীন— কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা যোজনার মতো বিষয় পরিত্যাজ্য। মনরেগা-র পরিবর্তে ‘ভিবি— জি রাম জি’ প্রকল্প এনে সরকার সে কাজ ইতিমধ্যেই সেরে রেখেছে। আর্থিক সমীক্ষা এই পরিবর্তনকেই বসাতে চাইল নির্দিষ্ট তাত্ত্বিক কাঠামোয়। কিন্তু, কেন মূল্য-শৃঙ্খলের উপরের দিকে ভারতীয় শ্রমনিবিড় ক্ষেত্রের পণ্য আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকতে পারে না, সে প্রশ্নের উত্তর নেই। শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য, শ্রমের উন্নতিতে অপরিহার্য এই দু’টি বিষয়ের গুরুত্ব ভারতে চিরকালই কম— বর্তমান জমানায় সেটুকুও অবশিষ্ট নেই। প্রাথমিক শিক্ষাতেই যদি ঘাটতি থাকে, তবে বাজার-অনুসারী দক্ষতা বৃদ্ধির প্রকল্পে শ্রমিকদের কী লাভ হবে, সমীক্ষায় সেই উত্তরও নেই। অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগকে বিশ্ব বাজার-মুখী জোগানশৃঙ্খলের অংশ হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সমীক্ষা। এই এমএসএমই ক্ষেত্রটি কাঠামোগত ভাবে যে সব সমস্যায় ভোগে, তার সমাধানের উপায় কী, সে প্রশ্নের উত্তর নাগরিক দাবি করবেন।

ভারতের আর্থিক বৃদ্ধির হারকে উচ্চতর কক্ষপথে নিয়ে যাওয়ার দাওয়াই হিসাবে সমীক্ষা এক দিকে রাজ্য স্তরে আর্থিক শৃঙ্খলার উপরে গুরুত্ব দিয়েছে, অন্য দিকে বৃহৎ পুঁজিকে পরামর্শ দিয়েছে বিদেশি প্রতিযোগিতা থেকে বাঁচতে সরকারের মুখাপেক্ষী না-হওয়ার। এই পরামর্শ দু’টির ভাঁজেও গোলমাল। রাজ্য স্তরে ‘আর্থিক শৃঙ্খলা’ কথাটির নিহিতার্থ, প্রত্যক্ষ নগদ হস্তান্তর প্রকল্পে রাজ্য সরকারগুলির ব্যয়ের পরিমাণ কমিয়ে আনা। এ কথা অনস্বীকার্য যে, রাজকোষের সাধ্যের সীমা ছাড়িয়ে নগদ হস্তান্তর প্রকল্প চালালে তা শেষ পর্যন্ত উন্নয়নের ক্ষতি করে। কিন্তু পাশাপাশি এ কথাও মনে রাখা জরুরি যে, ভারতের আর্থিক যুক্তরাষ্ট্রীয়তার কাঠামোয় নিজস্ব উন্নয়ন নীতি নির্ধারণের ক্ষমতা রাজ্যগুলির আছে। ফলে, রাজ্যগুলি আর্থিক শৃঙ্খলা মানছে না বলেই ভারত বিশ্বমঞ্চে যথেষ্ট জুত করে উঠতে পারছে না, এই অজুহাতটি ব্যবহার না করাই বিধেয়। অন্য দিকে, বৃহৎ শিল্পগুলিকে রক্ষণশীল বাণিজ্য নীতির আশ্রয় না-নেওয়ার পরামর্শটি ভাল, কিন্তু যে সরকারের শাসনকালে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সংখ্যা তার পূর্বসূরি সরকারের চেয়ে কম, আমদানি শুল্কের গড় হার প্রায় ২০ শতাংশ বেশি, এবং শুল্ক-বহির্ভূত বাধার পরিমাণও যথেষ্ট, সে আমলে এই পরামর্শে কান দেওয়ার কোনও প্রয়োজন বৃহৎ পুঁজির আছে কি?

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Economy Production

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy