E-Paper

টোপ-সর্বস্ব

পশ্চিমবঙ্গের সমাজ, যা দীর্ঘ দিন ধরেই অতি-রাজনৈতিক মনোভাবের জন্য পরিচিত, সেখানে এই প্রবণতার পরিণাম সহজে অনুমেয়। চিকিৎসক এ ক্ষেত্রে তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি সমর্থনের বিনিময়ে সুলভ পরিষেবা প্রদানের ‘টোপ’টি সাজিয়েছেন রোগীর সামনে।

শেষ আপডেট: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:৫৬

চিকিৎসকের কর্তব্য— জাত-ধর্ম-বর্ণ-আর্থ-সামাজিক অবস্থা নির্বিশেষে সকল রোগীকে সমান চিকিৎসা পরিষেবা প্রদান করা। কিন্তু সকল চিকিৎসকই যে পেশাজীবনের এই কর্তব্যজ্ঞানে অনড় থাকেন না, তার পরিচয় সম্প্রতি নির্বাচনমুখী পশ্চিমবঙ্গে পাওয়া গেল। সমাজমাধ্যমে এক হৃদ্‌রোগ বিশেষজ্ঞ ঘোষণা করেছেন ‘জয় শ্রীরাম’ বললে ডাক্তার দেখানোর ফি-তে বিশেষ ছাড় পাওয়া যাবে। এইটুকুই নয়, তিনি পদ্ম প্রতীকের উত্তরীয় গলায় ঝুলিয়েছেন, দলীয় টুপি পরা ছবিও দিয়েছেন। এবং জানিয়েছেন, রামের আশীর্বাদে স্বাস্থ্য ক্ষেত্র আরও সহজলভ্য করে তুলতেই নাকি এই ব্যবস্থা। অর্থাৎ, তিনি তাঁর চিকিৎসক-সত্তার মধ্যে ধর্ম এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতি উভয়কেই একযোগে মিলিয়েছেন। ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন-এর রাজ্য শাখা তাঁর এই প্রচারের ব্যাখ্যা চেয়েছে। কিন্তু যিনি নিজেই স্পষ্ট করে দেন, ডাক্তারি করা মানে রাজনীতি করা যাবে না, তা নয় এবং যে-হেতু তাঁর কাছে আগে দেশ তাই তিনি নিজ সিদ্ধান্তে অনড় থাকবেন— ধরে নেওয়া যায় তিনি যুক্তি-বুদ্ধি-কর্তব্য-বিবেচনার পথটি পেরিয়ে এসেছেন। অতঃপর এমন ‘দেশ-প্রেম’এর উদাহরণ চিকিৎসা-জগতে আরও বেশি দেখা গেলে সমাজের পক্ষে তা অশনিসঙ্কেত স্বরূপ।

তবে এই সঙ্কেত ইতিপূর্বেও দেখা গিয়েছে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনের ঘটনার পর কলকাতার একাধিক হাসপাতাল এবং চিকিৎসকদের একাংশ বাংলাদেশিদের চিকিৎসা না করার ঘোষণা করেছিলেন। পহেলগামে জঙ্গিহানার পর এক নির্দিষ্ট শ্রেণির নাগরিকের চিকিৎসা করতে না-চাওয়ার অভিযোগ উঠেছিল কিছু চিকিৎসকের বিরুদ্ধে। চিকিৎসকের নিজস্ব রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকবে, বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ব্যক্তিগত অভিমতও থাকবে। সমস্যা বাঁধে, যখন তাঁদের সেই দৃষ্টিভঙ্গি, অভিমতকে পেশাজগতের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য প্রভৃতি ক্ষেত্রগুলিকে সমস্ত ধরনের বিভেদের ঊর্ধ্বে রাখাই এ দেশে সংবিধানস্বীকৃত। সময়বিশেষে যে তার থেকে বিচ্যুতি লক্ষ করা যাচ্ছে, তার কারণ অন্য রাজ্যের মতো এ রাজ্যেও রাজনীতিপ্রসূত বিভেদের সংস্কৃতিটি ক্রমেই সুস্পষ্ট হচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গের সমাজ, যা দীর্ঘ দিন ধরেই অতি-রাজনৈতিক মনোভাবের জন্য পরিচিত, সেখানে এই প্রবণতার পরিণাম সহজে অনুমেয়। চিকিৎসক এ ক্ষেত্রে তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি সমর্থনের বিনিময়ে সুলভ পরিষেবা প্রদানের ‘টোপ’টি সাজিয়েছেন রোগীর সামনে। এ রাজ্যের রাজনীতিতেও তারই ছায়া। নাগরিক সুবিধা, অধিকার, যা নাগরিকের সহজাত প্রাপ্য, তাকেও নির্বাচনের জেতার ‘টোপ’ হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে দেদার। এমনকি সাম্প্রতিক কালে প্রচারের অভিমুখ বলে, শাসক-বিরোধী উভয় দলই জেতার শর্ত হিসাবে নাগরিকের সামনে রাখছে ভোটাধিকারের বিষয়টিকে। ভোটাধিকার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের স্বাভাবিক অধিকার। অথচ, প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতি তাকে সরাসরি নির্বাচনী লড়াইয়ের ময়দানে হাজির করল। নাগরিকের উপর চাপ তৈরি করল যাতে এই স্বাভাবিক অধিকার ‘ফিরে পেতে’ তাদের দলকেই জয়ী করা হয়। এই চাপ সৃষ্টির রাজনীতি ঘোরতর অন্যায়— গণতান্ত্রিক দিক থেকে, বৃহত্তর নৈতিকতার দিক থেকেও। অথচ, পশ্চিমবঙ্গ সেই অন্যায়ের পথেই হেঁটে চলেছে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

West Bengal Politics BJP Doctors

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy