বিষয়টি এই ভাবে প্রথমে উপস্থাপিত করা ভাল যে, আজ থেকে সংসদের অধিবেশনে দুই কক্ষে বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে সংশোধিত মহিলা সংরক্ষণ বিল নিয়েও ‘আলোচনা’র কথা। তবে বর্তমান ভারতের সংসদে ‘আলোচনা’ শব্দটির কিছু ভিন্ন অর্থ দাঁড়িয়েছে। সেখানে আলোচনার বন্দোবস্ত বলতে এইটুকুই যে কিছু ব্যক্তিকে আপত্তি জানানোর কিছু সময় দেওয়া হয়। কিন্তু তা নিয়ে তর্কবিতর্ক হয় নামমাত্র, এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতার দাপটে সিদ্ধান্ত হয় অতি দ্রুতবেগে। কার্যত সরকারি পক্ষের মতই প্রথম ও শেষ, এই ভাবেই সংসদীয় ‘আলোচনা’ চলমান থাকে। প্রশ্ন হল, কেন হঠাৎ এখন এই বিষয়টিতে এত তাড়াহুড়ো করে ‘আলোচনা’? যখন বিভিন্ন রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন চলছে, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে— যেখানে জাতীয় স্তরের অন্যতম প্রধান বিরোধী দল সরকারে থাকায় তারা এখন স্পষ্টতই ব্যস্ত, কিংবা আর একটি বিরোধী-শাসিত রাজ্য তামিলনাড়ুতে— যেখানে সদ্য নির্বাচন সংঘটিত হল, কোন ‘অজ্ঞাত’ কারণে অকস্মাৎ এই মহিলা সংরক্ষণ বিল (মোট আসনের এক-তৃতীয়াংশ মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ) নিয়ে এত সক্রিয়তা? কংগ্রেস নেত্রী সনিয়া গান্ধী যথার্থই মনে করিয়ে দিয়েছেন, ২০২৩ সালে বিলটি সংসদে পাশ হওয়ার পর ২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে তা কার্যকর করার দাবি যখন কংগ্রেস জানিয়েছিল, তখন কিন্তু বিজেপিই রাজি হয়নি। এখন যখন জোরকদমে বিধানসভা ভোট চলছে, সেই সময়ে এত তাড়া কিসের? তবে কি এর পিছনেও কোনও ভোটের হিসাবই প্রচ্ছন্ন রয়েছে? কী সেই হিসাব?
শাসক দলের পক্ষ থেকে উত্তরটি নিতান্ত মনোমুগ্ধকর। এই প্রতিকূল সময়ে সংশোধিত বিল প্রয়োগের মাধ্যমে না কি বিরোধীদের দাবিকেই মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী মোদী এও বলেছেন যে তাঁর সরকার সব সময়েই বিরোধী মতামতকে মর্যাদা দিয়ে এসেছে। এই দাবি শুনে বিরোধীরা কী বলবেন সহজেই অনুমেয়— তাঁদের সকলেরই স্মরণে আছে জাতীয় শিক্ষা বিল, জিএসটি, নোটবন্দি, জনগণনা, কাশ্মীরের ৩৭০ ধারা বিলোপের মতো বিরাট মাপের সিদ্ধান্তগুলি কী পদ্ধতিতে নেওয়া হয়েছিল। সুতরাং কারও বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না যে সংসদে আসন পুনর্বিন্যাসের পরিকল্পনার সঙ্গেই এই মহিলা বিলটি জড়িয়ে আছে। আসন পুনর্বিন্যাস কমিশন তৈরি হবে আগামী জুন মাসে, যাতে পরবর্তী নির্বাচনের আগে ছোট রাজ্যগুলির গুরুত্ব কমিয়ে, উত্তর ভারতের কিছু রাজ্যের সাংসদ-সংখ্যার জোর বাড়িয়ে, নারী আসন বাড়লেও পুরুষ আসনের সংখ্যা অক্ষুণ্ণ রেখে, বর্তমান শাসক দলের সাংখ্যিক প্রভাব অনেকাংশে বাড়ানো সম্ভব হয়। অর্থাৎ ২০২৯ সালের জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি রূপেই এই বারের অধিবেশনে বিলটির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার। শাসক দলকে পরবর্তী কালে ক্ষমতায় রাখার ব্যবস্থা করাই এখন লক্ষ্য।
বরাবরের মতোই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-র ‘কৃতিত্ব’ বলতে হবে— রাজনৈতিক কৌশল হিসাবে বিজেপির এই পদক্ষেপ যথেষ্ট পাকাপোক্ত। এ এমন এক চাল যাতে বিরোধীরা যে দিকেই যাবেন, তাঁদের ‘পরাজয়’ অবশ্যম্ভাবী। বিরোধীরা যদি এই বিলের ক্ষেত্রে বেশি আপত্তি তৈরি করেন— যা তাঁরা করতে চলেছেন বলেই অনুমান— সে ক্ষেত্রে তাঁদের ভাগ্যে জুটতে পারে নারীবিরোধিতার অভিযোগ। তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে তা বিশেষ ক্ষতিকর হতে পারে যে হেতু পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের শেষ লগ্নে বিজেপি এই বিল-বিরোধিতাকে তৃণমূলের বিরুদ্ধে মহোদ্যমে কাজে লাগানোর সম্ভাবনা। আবার অন্য দিকে, এই বিলের বিরোধিতা না করার অর্থ শাসকের ফাঁদে পা দিয়ে শাসকের উদ্দেশ্যেই সহায়তা। অর্থাৎ শেষ অবধি বিরোধী দলগুলির প্রচার-কৌশলের দক্ষতা বা অদক্ষতার উপরেই নির্ভর করছে ‘আলোচনা’র স্বরূপ: ‘আলোচনা’র ফলাফলটি যদিও আগে থেকেই বিলক্ষণ জানা।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)