E-Paper

সন্ধিক্ষণ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটভূমি আজও গভীর ভাবে বিভক্ত। নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হলেও, অন্তঃদলীয় এবং আন্তঃদলীয় দ্বন্দ্ব পরিচালনা করা অন্তর্বর্তিকালীন সরকারের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।

শেষ আপডেট: ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ০৬:০৬

আগামী বছর ১২ ফেব্রুয়ারি নতুন সংসদ নির্বাচনের জন্য ভোটগ্রহণ করবে, সম্প্রতি ঘোষণা করল বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন। গত বছর ছাত্র-নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থানের ফলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পলায়নের পর এটিই হবে প্রথম জাতীয় নির্বাচন। নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তিকালীন প্রশাসন তখন থেকে মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দক্ষিণ এশীয় দেশটিকে চালনা করলেও সংস্কারে বিলম্বের কারণে সাম্প্রতিক কালে নতুন করে বিক্ষোভ এবং রাজনৈতিক বিভাজনের মুখে পড়তে হচ্ছিল তাঁকে। এক দিকে আসন্ন নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী, ন্যাশনাল সিটিজ়েন পার্টি-র পাশে এগিয়ে চলেছে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জ়িয়া-র বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি)। আর এক দিকে, এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অস্থিরতার হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে। ফলে নিরাপত্তা আরও জোরদার করার জন্য, পুলিশের পাশাপাশি সামরিক বাহিনীরও ভূমিকা থাকবে কি না, প্রশ্ন সেটাই।

২০২৪ সালে দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিদ্রোহের পর গণতন্ত্র এবং স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে এই নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে একটি স্বাগত পদক্ষেপ। অনেকেই এটিকে একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং অংশগ্রহণমূলক ভোট অনুষ্ঠানের সুযোগ হিসেবে দেখছেন, যা এত কাল বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং জনসাধারণের প্রাথমিক দাবি ছিল। নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার ফলে কয়েক মাসের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তারও অবসান ঘটল, যা দেশের প্রশাসন ও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। বস্তুত এই নির্বাচন যথার্থত অনুষ্ঠিত হলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে শক্তিশালী করার সঙ্গে সঙ্গে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, দুর্নীতি মোকাবিলা, জনগণের মৌলিক অধিকার বৃদ্ধি এবং ক্ষমতার উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের মতো বিবিধ সাংবিধানিক সংশোধনের সুযোগ পাওয়া সম্ভব।

সমস্যাও বিস্তর। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটভূমি আজও গভীর ভাবে বিভক্ত। নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হলেও, অন্তঃদলীয় এবং আন্তঃদলীয় দ্বন্দ্ব পরিচালনা করা অন্তর্বর্তিকালীন সরকারের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। ২০২৪ সালের অগস্টে পূর্ববর্তী সরকারকে উৎখাত করা বিদ্রোহের পর থেকে পূর্বতন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ-এর সমর্থকদের গ্রেফতার এবং তাঁদের উপর ব্যাপক হিংসা ও প্রতিশোধমূলক হামলার খবর এসেছে ক্রমাগত। সমালোচকদের যুক্তি, উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক সমর্থন আছে এমন একটি দলকে বাদ দিলে জনসংখ্যার একটি বৃহৎ অংশ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত এবং নির্বাচনের বৈধতা ক্ষুণ্ণ হবে। নির্বাচন কমিশন এই প্রক্রিয়ার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করলেও, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলির নিরপেক্ষতা নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ শাসনে অতীত নির্বাচনগুলি যে ভাবে ব্যাহত হয়েছে জালিয়াতি, ভয় দেখানো এবং সমান সুযোগের অভাবের কারণে, এ বার চ্যালেঞ্জ সেখানেই। নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রতি নাগরিকের আস্থা পুনরুদ্ধার করা জরুরি। বাংলাদেশের জনগণ এবং নেতারা একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন— কেননা আগামী নির্বাচন কেবল নতুন সরকার গঠন করবে না, দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক চরিত্র তৈরিতেও নির্ধারক হয়ে উঠবে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bangladesh Situation Bangladesh interim government

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy