বায়ুদূষণকে কি কোনও নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আবদ্ধ রাখা যায়? গত কয়েক বছরে স্পষ্ট, দীপাবলির সময় থেকে দেশের রাজধানী দিল্লি ও সংলগ্ন অঞ্চলের বাতাসের গুণমান মারাত্মক খারাপের পর্যায়ে চলে যায় হামেশাই। সেই পর্যায়গুলিতে রাজধানীতে চালু হয় ‘গ্রেডেড রেসপন্স অ্যাকশন প্ল্যান’ (জিআরএপি)। কিন্তু দেশের অন্য দূষিত শহরগুলিতে তার প্রয়োগ হতে দেখা যায়নি। অথচ, বায়ুদূষণ শুধু দিল্লির ক্ষেত্রেই নয়, সার্বিক ভাবে জনস্বাস্থ্যের উপর গভীর প্রভাব বিস্তার করে। এর পরিপ্রেক্ষিতেই সম্প্রতি জাতীয় পরিবেশ আদালতের কাছে বায়ুদূষণ সংক্রান্ত একটি মামলায় আদালত-বান্ধবের জমা পড়া রিপোর্টটি গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে যথার্থ ভাবেই প্রশ্ন তোলা হয়েছে, কেন বায়ুদূষণ সংক্রান্ত বিশেষ কঠোর নিয়মবিধি শুধুমাত্র রাজধানী দিল্লির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? কেন দেশের অন্য দূষিত শহরগুলির জন্য তা কার্যকর করা যাবে না?
জিআরএপি মূলত একগুচ্ছ আপৎকালীন নিয়মবিধি, যা একটি নির্দিষ্ট মাত্রার পর বাতাসের গুণমানকে আরও খারাপ হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে নির্মিত। এর বিভিন্ন স্তর আছে। দিল্লিতে একিউআই (এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স বা বায়ুর গুণমান সূচক) ২০০ পেরোলেই রাস্তায় যানবাহন চলাচল মসৃণ করা, পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ (যাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিকল্প উৎসগুলির ব্যবহার কমে), জনগণকে বায়ুদূষণ সম্পর্কে সচেতন করা প্রভৃতি কর্মসূচি নেওয়া হয়। একিউআই মারাত্মক খারাপ-এ পৌঁছলে সর্বোচ্চ পর্যায়ের জিআরএপি প্রয়োগ করা হয়, যেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, অফিসগুলিতে বাড়ি থেকে কাজ চালু প্রভৃতি পদক্ষেপ করা হয়। সমস্যা হল, বায়ুদূষণের ক্ষেত্রটিতে দিল্লি এক অনন্য নজির গড়লেও ভারতের অন্য একাধিক শহরও দূষণ-তালিকায় খুব পিছিয়ে নেই। এ বছরের শুরুতেই কলকাতার বাতাসে বিষের পরিমাণ যথেষ্ট উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। অথচ, এই শহরের বায়ুদূষণ নিয়ে তেমন চর্চা কই? অনেকটা একই অবস্থা দুর্গাপুর, আসানসোল, রানিগঞ্জ এবং হলদিয়ারও। ইতিমধ্যেই এই শহরগুলি কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের মাপকাঠি অনুযায়ী টানা পাঁচ বছর বাতাসের জাতীয় গুণমান বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। অথচ, এখানে বায়ুদূষণ বিষয়ে যে ব্যবস্থা করা হয়েছে, তা নেহাতই অকিঞ্চিৎকর।
জিআরএপি-কে দিল্লির বাইরে সম্প্রসারিত করা যাবে কি না, তা আইনি লড়াইয়ের প্রশ্ন। কিন্তু বায়ুদূষণ রোখার যে সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানসম্মত নিয়মগুলি আছে, তা কেন কলকাতা-সহ রাজ্যের দূষিত শহরগুলিতে দেখা যায় না, সে প্রশ্ন তোলা জরুরি। কেন আতশবাজির দূষণকে ঠেকানোর কোনও উদ্যোগই করা হয় না, পরিবেশ আদালতের নির্দেশ সত্ত্বেও? জনস্বাস্থ্যের বিপদকে পিছনে ঠেলে কেন বার বার বাজি ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা করে সরকার? যেখানে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি বা বিদ্যুৎচালিত বাসের সংখ্যাবৃদ্ধির উপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা, সেখানে পনেরো বছরের মেয়াদ পেরোনো গণপরিবহণ চালানোর দাবিকেও মেনে নেওয়া হয় এই রাজ্যে। প্রকাশ্যে আবর্জনা পোড়ানো, ভাগাড়ে অবৈজ্ঞানিক ভাবে জমতে থাকা জঞ্জাল, অবাধ নির্মাণকাজ— প্রশাসন কোনটিতেই বা কঠোর লাগাম পরিয়েছে? দূষণক্লান্ত শহরে বৈজ্ঞানিক পন্থায় নির্মিত জিআরএপি-র প্রয়োজন নিঃসন্দেহে, কিন্তু তার আগে সহজলভ্য ওষুধটুকুর অবিলম্বে প্রয়োগের ব্যবস্থা হোক।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)