কথাটা এ ভাবে কখনও ভাবিনি! বৃহৎ কোনও জনগোষ্ঠীর মধ্যে জাতিসত্তার উন্মেষ ঘটে কী ভাবে তা নিয়ে তো লক্ষ লক্ষ বই লেখা হয়েছে। রাজনৈতিক চেতনা, সাংস্কৃতিক স্বাজাত্যবোধ, সাম্প্রদায়িক সৌহার্দ...সমাজবিজ্ঞানের এই সব অবাধ-চর্চিত গবেষণা-ভূমির যে পরিচিত পরিসর, হঠাৎই সে দিন তার বাইরে গিয়ে দাঁড়াল দীর্ঘ দিনের এক বন্ধু। মধ্য কলকাতার একটি ঝাঁ চকচকে মলে, এক ধোঁয়াতুর ক্যাপুচিনো সন্ধ্যায় তার প্রশ্ন: এই যে বাংলাভাষী মানুষ, সংখ্যাতত্ত্বের নিরিখে যা নাকি পৃথিবীর সপ্তম বৃহৎ জনগোষ্ঠী– পর্তুগিজ ভাষার এক ধাপ নীচে, রুশ ভাষার ঠিক একধাপ উপরে— এঁদের বাঙালি হয়ে ওঠার পিছনে শিক্ষার ভূমিকা কতটা? শিক্ষিত বাঙালির ট্র্যাজেক্টরি–তার কক্ষপথ–ঠিক কেমন?

এই একবিংশ শতকের প্রথমার্ধে সেই শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মান কোথায় এসে ঠেকেছে, সে বিতর্কটা আপাতত তোলা থাক । এ কথা তো অনেকেই বলেন যে বিগত শতাব্দীর মাঝামাঝি, প্রথমে দেশভাগ, তার পর ষাটের দশকের শেষ অঙ্ক থেকে ক্রমাগত পুঁজি নিষ্ক্রমণ— অর্থনীতিবিদদের ভাষায় ‘flight of capital’–এর শিকার হয়ে, কোণঠাসা হতে হতে, মধ্যবিত্ত বাঙালি এখন একটা অস্তিত্ব-সঙ্কটের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছে। এই অশনি সঙ্কেত যুক্তিগ্রাহ্য, নিঃসন্দেহে। কিন্তু সম্পূর্ণ চিত্রটাই কি এই রকম?

দূরত্বের চিত্রানুপাত ভিন্নতর– এ কথাটা প্রশংসায়, সমালোচনায়, অনেকেই বলে থাকেন। কথাটার সত্যতা অনঃস্বীকার্য, তবে তার সামগ্রিক প্রভাব ইতিবাচক না নেতিবাচক তা জানি না। আমি কিন্তু দীর্ঘ দিনের দেশান্তরী। প্রবাসের প্রত্যন্ত প্রাঙ্গণ থেকে যখন ফিরে তাকাই তখন আমার চোখে যে চিত্রটা ধরা পড়ে তা এই রকম।

আরও পড়ুন: গড়ে তুলি বাঙালির ‘জাতীয়’ বা ‘ন্যাশনাল’ ইতিহাস ও সংস্কারের উদ্যোগ

আজও, এই শপিং মল পরিবেষ্টিত, বিজ্ঞাপন-সর্বস্ব, বিপণন-আক্রান্ত প্রহরেও, বহু বাঙালি পরিবারে, ছেলেমেয়েকে, বিশেষ করে কন্যাসন্তানটিকে, লেখাপড়া শেখানোর পাশাপাশি গান শেখানোর রেওয়াজটি এখনও চালু । এ কথা ঠিক যে আজ বলিউডের প্রভাব সর্বগ্রাসী। কলকাতা শহরে, আমার ধারণা পশ্চিমবঙ্গের ছোট-বড় অনেক শহরেই– বাঙালি বাড়ির মেয়ের বিয়েতে এখন বলিউড-সঙ্গীতের সঙ্গে নাচ, হাতে মেহেন্দি করার আনুষ্ঠানিক আয়োজন, এ সব বিয়েবাড়ির অপরিহার্য অঙ্গ।

কিন্তু এ সব সত্ত্বেও, কম্পিউটার ক্লাস এবং স্পোকেন ইংলিশের সঙ্গে ঠেলাঠেলি করে, মধ্যবিত্ত বাঙালির রবীন্দ্রসঙ্গীত চর্চাটি এখনও টিকে আছে। টিকে আছে নাচের স্কুল। ছোট-বড় নানান বয়সের পাঠিকা পাঠককে আকর্ষণ করার উদ্দেশ্যে, গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধ-রম্যরচনা দিয়ে সাজানো পুজোসংখ্যাগুলি আজও বিক্রি হয়। বহু দিন পর এ বারে কলকাতা বইমেলা ভাল করে ঘুরে দেখার সুযোগ হল। আমার কৈশোরের সেই ময়দানের বইমেলার মতোই, সল্টলেকের বইমেলাটিও উৎসব মুখর প্রাঙ্গণ। লিটল ম্যাগাজিনের শামিয়ানাটিতে পরিপাটি দক্ষতার ছাপ। কিছু কিছু লিটল ম্যাগাজিন তো সাহিত্যমূল্যে এতটাই উচ্চমানের, যে-কোনও দিন নামজাদা প্রকাশকদের লজ্জা পাইয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। যাঁরা বইমেলায় ঘোরাফেরা করছেন তাঁরা সবাই নিপাট গ্রন্থপ্রেমিক, এমনটা মনে করা ভিত্তিহীন, কিন্তু দূরদূরান্তের উপকণ্ঠ থেকেও আসছেন কাতারে কাতারে মানুষ– কিছুটা হলেও এটা ইঙ্গিতবহ তো নিশ্চয়ই! মেলাপ্রাঙ্গণ আগের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত, সাজানো। আমারই কি দেখার ভুল? এ বারে মনে হল খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন, রেস্তরাঁ স্টল, ইত্যাদি বইমেলার মূল চত্বরে আগের চেয়ে সীমিত। গ্রন্থ প্রেমিকদের পায়ে ওড়া পথের ধূলি, যেন তীর্থরেণু!


মধ্যবিত্ত বাঙালির রবীন্দ্রসঙ্গীত চর্চাটি এখনও টিকে আছে।

এর কয়েক দিন আগে দক্ষিণ কলকাতায় সারা রাত্রিব্যাপী একটি উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত সম্মেলনে পর পর চারটি রাত্রিই জমজমাট ভিড়। রিষড়া, শ্যামনগর থেকে সারা রাত জেগে গান শুনতে এসেছেন, এমন কয়েক জনের সঙ্গে পরিচয় হল। ফিরে গিয়ে পরের দিন আবার যে যাঁর নিজের কাজ করবেন– কারুর চাকরি থেকে ছুটি নেই, কারুর ছোট ব্যবসা, সে কাজ ফেলে রাখা যাবে না।

ওই রকমই আর একটি রাত্রে সারা রাত ধরে চলা একটি বৃহদাকার নাটক দেখতে গিয়েছিলাম এই ভেবে যে, কয়েক জন অক্লান্ত নাট্যোৎসাহী আর আমার মতো কিছু প্রবাসী, যাঁদের আর কোনও ভাবে নাটকটি দেখার সুযোগ হবে না– ছড়িয়ে ছিটিয়ে হয়তো বসে থাকতে দেখব এ রকমই কয়েক জনকে। গিয়ে দেখলাম, শীতের মধ্যরাত্রে অ্যাকাডেমির সামনে উপচে পড়া জনস্রোত!

শিক্ষা কি শুধু অক্ষরপরিচয়? এ-বি-সি-ডি পড়তে শেখা? শেয়ারবাজারের জটিল পরিসংখ্যান ব্যবহার করতে শেখা? এই যে একান্ত বাঙালি একটি জীবনবোধ, পশ্চিমী ম্যাগাজিন প্রচারিত লাইফস্টাইলের সঙ্গে অসম প্রতিদ্বন্দ্বিতা চালিয়েও নয় নয় করে টিকে আছে, এই কাঠামোটাই কি তৈরি করে দিয়েছিল উনবিংশ শতকের শিক্ষার প্রসার? আজও তো দেখতে পাই তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব। বাংলার ভূমি থেকে বহু দূরেও! মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইস্টার্ন সি বোর্ড’ বা ‘প্যাসিফিক কোস্ট’-এর যে কোনও বাঙালি সম্মেলনে– তা সে দুর্গাপুজো বা বঙ্গ সংস্কৃতি সম্মেলন যা-ই হোক না কেন। দেখি লন্ডনে মে থেকে অগস্ট মাস পর্যন্ত, প্রতিটি সপ্তাহান্তেই কোনও না কোনও অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে কবিপক্ষ উদযাপনের নিরন্তর প্রয়াসে। দেখি প্রবাসী বাঙালিদের নাট্যচর্চায়। দোল-দুর্গোৎসবের আয়োজনে।

এই যাত্রাপথটিকেই কি প্রথম আলোকিত করেছিল শিক্ষার প্রসার? গড়ে তুলেছিল ভারতের প্রথম মধ্যবিত্ত শ্রেণি? এ যাত্রার শুরু কবে? কার হাত ধরে?

আরও পড়ুন: ইতিহাসের হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগানোর ১৯১১

এ প্রশ্নটা উঠলে প্রথমেই ভেসে ওঠে বীরভূম জেলার এক খর্বকায় ব্যক্তির মুখ। সেই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবন ও কর্ম নিয়ে প্রামাণ্য কাজটি অরবিন্দ গুহের। ইন্দ্রমিত্র ছদ্মনামে লিখতেন। তাঁর করণাসাগর বিদ্যাসাগর (করুণাসাগর বিদ্যাসাগর; ইন্দ্রমিত্র; আনন্দ পাবলিশার্স, ডিসেম্বর, ১৯৬৯;) পড়তে পড়তে একটি বিশেষ জায়গায় চোখ আটকে গেল ।

“উত্তরকালে শশীভূষণ বসু বিদ্যাসাগরের লাইব্রেরি সম্বন্ধে লিখেছেন: আমি কাচে আবৃত শেলফের পুস্তকগুলির প্রতি বার বার তাকাইতে লাগিলাম। বিদ্যাসাগর মহাশয় আমার অভিপ্রায় বুঝিতে পারিয়া বলিলেন: ‘এস বই দেখাই,’ এই বলিয়া এক-একটি শেলফ খুলিয়া বই দেখাইতে লাগিলেন। ইতিহাস, সাহিত্য, দর্শন সম্বন্ধীয় পুস্তকাদি বিশেষ বিশেষ বিভাগে সজ্জিত করা হইয়াছে। এখানে একটি কথা বলা প্রয়োজন। সমস্ত পুস্তক একই রকমের বাঁধান। বিদ্যাসাগর মহাশয় বলিলেন, বিলাতের পুস্তক-বিক্রেতাদের নিকট এইরূপ বলা আছে যে, নূতন ভাল পুস্তক বাহির হইলে, তাঁহারা একরূপ বাঁধাই করিয়া, আমার এখানে পাঠাইবেন। দেখিলাম, আরভিঙের স্কেচ-বুক, এই সামান্য দরের পুস্তকখানিও অন্যান্য দামী পুস্তকের মতন বাঁধান হইয়াছে। বইখানি কিনিতে যে খরচ পড়িয়াছে তাহা অপেক্ষা বাঁধাইয়ের মূল্য অধিক। এই সকল উৎকৃষ্ঠ গ্রন্থরাজির মধ্যে বসিয়া বিদ্যাসাগর মহাশয় তাঁহার সময় যাপন করিতেন। এত বড় সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতের পাশ্চাত্য সাহিত্য, ইতিহাস ও দর্শনের প্রতি কী প্রবল অনুরাগই তাঁহার প্রকাণ্ড লাইব্রেরী প্রকাশ করিতেছে, তখন এই কথাই মনে আসিতে লাগিল। বইগুলি তাঁহার এতই অনুরাগের ও ভালবাসার সামগ্রী ছিল যে, কোন ব্যক্তি ঐ লাইব্রেরীর বই পড়িতে চাহিলে তিনি তাহা কখনই দিতেন না; এই কথা বলিতেন, উহা দিলে তাঁহার প্রাণে লাগে। উহা না দিয়া তিনি সে পুস্তক একখানি কিনিয়া দিতেও প্রস্তুত হইতেন।” (করুণাসাগর বিদ্যাসাগর; ইন্দ্রমিত্র; আনন্দ, ডিসেম্বর, ১৯৬৯; পৃঃ ২৯)

বিদ্যাসাগরের এই বিখ্যাত গ্রন্থাগার এখনও রক্ষিত আছে, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে। তবে তাঁর মৃত্যুর অব্যবহিত পরে, বন্ধকী শর্তে এই লাইব্রেরিটির মালিক হন লালগোলার রাজা। বাংলার সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের প্রতিভূ যিনি, তাঁর বই পরিবৃত ঘরকন্নার এই খণ্ড চিত্রটি বেশ ইঙ্গিতবহ। পেশাগত ভাবে যে মানুষটি ছিলেন সংস্কৃতের অধ্যাপক, এবং আজকের ‘জারগনে’ সংস্কৃত সাহিত্য ও ভাষাতত্ত্বের বিশেষজ্ঞ, তাঁর মনোজগতের সীমাহীন বিস্তৃতির সাক্ষ্য বহন করে তাঁর এই লাইব্রেরির বর্ণনা।

আরও পড়ুন: বিবেকানন্দের হিন্দুত্ব না বুঝিয়ে জনগণকে স্বামীজির সরল কথা সরল ভাবেই বোঝানো যেত

শুধু বিদ্যাসাগরের মতো যুগান্তকারী ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রেই নয়, উনবিংশ শতকের বাঙালির জীবনে বই যে তার নিজস্ব একটা জায়গা করে নিচ্ছে তার প্রমাণ কলকাতা শহরের গ্রন্থাগারগুলি। ১৮৩৬ সালে, দ্বারকানাথ ঠাকুরের মালিকানায়, গভর্নর জেনারেল চার্লস থিয়োফিলাস মেটকাফের আনুকূল্যে ফোর্ট উইলিয়ামের লাইব্রেরি থেকে হস্তান্তিরত ৪৬৭৫টি বই তাকে সাজিয়ে দরজা খোলে ক্যালকাটা পাবলিক লাইব্রেরি। শহরের আরও অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি বই দিয়েছিলেন। গ্রন্থাগারটির মালিকানার অংশীদার হতে চাইলে দিতে হত তিনশো টাকা। সে যুগে একটি বিরাট অঙ্কের টাকা। কিন্তু গরিব ছাত্র এবং উৎসাহী সাধারণ পাঠকের জন্য লাইব্রেরির দরজা খোলা থাকতো। সাময়িক ভাবে হলেও তাঁরা গ্রন্থাগার ব্যবহার করতে পারতেন, বিনামূল্যেই। এই ক্যালকাটা পাবলিক লাইব্রেরিই পরবর্তী যুগের ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরি, এবং তারও পরে জাতীয় গ্রন্থাগারের পূর্বসূরি।

অনুরূপ ইতিহাস ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে উত্তর ও মধ্য কলকাতার পাড়ার লাইব্রেরিগুলির ধূসরিত তাকের আনাচে কানাচে। ১৮৮২-র পয়লা জুলাই প্রতিষ্ঠিত হয় তালতলা পাবলিক লাইব্রেরি। ১৮৮৩-র ষোলোই জুন বাগবাজার রিডিং লাইব্রেরি। ১৯০১ সালে রাজা রাজবল্লভ স্ট্রিটের ভাড়া বাড়ি থেকে ওই একই রাস্তায় নিজস্ব বাড়িতে উঠে যায় গ্রন্থাগারটি। ১৮৮৯-এর পাঁচই ফেব্রুয়ারি (১২৯৫ বঙ্গাব্দের চব্বিশে মাঘ, মঙ্গলবার), ৮৩ বিডন স্ট্রিটে গঙ্গানারায়ণ দত্তর বাড়ির একাংশে দরজা খোলে চৈতন্য লাইব্রেরি। এই গ্রন্থাগার গড়ে তোলার পিছনে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন গৌরহরি সেন, কুঞ্জবিহারী দত্ত, নিতাইচাঁদ দত্ত, হরলাল শেঠ ও রঙ্গলাল বসাক। এই চৈতন্য লাইব্রেরির পর পরই তৈরি হয় উত্তর কলকাতার আরও দু’টি বিখ্যাত গ্রন্থাগার। ১৮৯০ সালে অ্যালবার্ট লাইব্রেরি, পরে ভারতী পরিষদ। তার পর বিশ শতকের গোড়ায় (১৯০৯ সালে ) বীডস স্ট্রিটে হিরণ লাইব্রেরি। সে বছরই কৃষ্ণপ্রসন্ন ঘোষ, জীবনকৃষ্ণ দে এবং প্রদ্যোৎ কুমার রুদ্র— এই তিন স্কুলপড়ুয়া একটি ভগ্নপ্রায় আলমারিতে কুড়িটি বই নিয়ে শুরু করেন বয়েজ ওন লাইব্রেরি। গিরীশ চন্দ্র দত্ত নামের এক জন প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক, বারো নম্বর রাম নারায়ণ ভট্টাচার্য লেনে, তাঁর বসতবাড়ির একটি ঘর ছেড়ে দেন লাইব্রেরির জন্য। হয়তো ভেবেছিলেন পাড়ার কয়েকটি স্কুলপড়ুয়ার উৎসাহে কয়েক দিনের মধ্যেই ভাটা পড়বে! লাইব্রেরিটি কিন্তু আজও চলছে, একশো দশ বছর পরেও! লাইব্রেরির আজ একটি ওয়েবসাইট আছে, সেখানে পাওয়া যায় তার যাত্রা শুরুর ইতিহাস।


এ যাত্রার শুরু কবে? কার হাত ধরে?

বই পড়ার সংস্কৃতিটি ছড়িয়ে পড়ে যে পাঠক-পাঠিকাদের হাত ধরে, তাঁদের তৈরি করার কাজ কিন্তু শুরু হয়ে গেছিল অনেক আগেই। এই প্রয়াসের সবচেয়ে বন্দিত পদক্ষেপ অবশ্যই ১৮১৭ সালের বিশে জানুয়ারি কুড়ি জন ছাত্র নিয়ে হিন্দু কলেজের দ্বারোদ্ঘাটন। আজকের প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা প্রয়াসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজা রামমোহন রায়, রাধাকান্ত দেব, ডেভিড হেয়ারের নাম। শুধু বাংলার নয়, ভারতবর্ষের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র স্থান দখল করে আছে হিন্দু কলেজ, পরবর্তীকালের প্রেসিডেন্সি কলেজ, আজকের বিশ্ববিদ্যালয়টি। সুভাষচন্দ্র বসু থেকে অমর্ত্য সেন, সত্যেন্দ্রনাথ বসু থেকে সত্যজিৎ রায়— দুশো বছরের বাঙালির ইতিহাস শুধু নয়, ভারতের ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য নামগুলির অনেকেই ছাত্রজীবনের একটি অধ্যায় কাটিয়েছেন এই প্রতিষ্ঠানটিতে।

তুলনায় ১৮২৪ সালে প্রতিষ্ঠিত সংস্কৃত কলেজ বা ১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দে চালু হওয়া ডাফ কলেজ স্বল্পখ্যাত হলেও, সে যুগের শিক্ষাপ্রসারে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। ১৮৩০ সালে স্কটল্যান্ড থেকে কলকাতায় এসেছিলেন  আলেকজান্ডার ডাফ। সেই বছরই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন General Assembly’s Institution। পরে, ১৮৪৪ সালের চৌঠা মার্চ, নিমতলা ঘাটের কাছে মথুর মোহন সেনের বাড়ি ভাড়া করে পত্তন করেন Free Church Institution-এর। আলেকজান্ডার ডাফের লক্ষ্য ছিল ইংরিজি ভাষায় শিক্ষার প্রসার । এই দুটি প্রতিষ্ঠানেই শিক্ষার মাধ্যম ছিল ইংরিজি। এর অনেক আগে, ১৭৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় খিদিরপুরের সেন্ট টমাস স্কুল। এইটিই কি কলকাতার প্রথম ইংরেজি মাধ্যম ইস্কুল? বিশেষজ্ঞরা এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন। ১৯০৮ সালে ডাফ কলেজ জুড়ে যায় স্কটিশ চার্চ কলেজের সঙ্গে। স্কটিশ চার্চ আজও শহরের উল্লেখযোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। পুরনো ডাফ কলেজের প্রাসাদোপম ভবনটি ধ্বংসস্তূপ হয়ে এখনও দাঁড়িয়ে আছে নিমতলা ঘাট স্ট্রিটে।

ব্রিটেনের বিখ্যাত কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অঙ্কের যে সব মেধাবী ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন বছর পড়াশোনা করার পর প্রথম বিভাগে সাম্মানিক স্নাতক হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেন (ফার্স্ট ক্লাস অনার্স), তাঁদের বলা হয় ‘র‌্যাঙ্গলার’। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিনিটি কলেজের ওই রকমই এক ‘র‌্যাঙ্গলার’ খেতাব পাওয়া ছাত্র, জন এলিয়ট ড্রিঙ্কওয়াটার বীটন, ভারতে আসেন ১৮৪৮ সালে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মদনমোহন তর্কালঙ্কার, দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায় ও রামগোপাল ঘোষের সহায়তায় ১৯৪৯ সালে বীটন সাহেব প্রতিষ্ঠা করেন নেটিভ ফিমেল স্কুল। ১৮৫৬ সালে সরকার অধিগ্রহণ করে সেই স্কুল, তার নামকরণ হয় প্রতিষ্ঠাতার নামে। একটি প্রচলিত মত এই যে, বীটন সাহেবের নামের বানান, ইংরিজি অক্ষরে Bethune, স্থানীয় উচ্চারণে বেথুন স্কুল নামে প্রচলিত হয়ে ওঠে। এই মতের সত্যতা যাই হোক, স্কুলটি কিন্তু আজও শহরের সবচেয়ে প্রশংসিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির একটি। বাঙালি মধ্যবিত্তের মনোজগতে নতুন দিগন্তের উন্মোচন ঘটিয়েছিল এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শুধু ভারতের নয়, দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম মহিলা ডাক্তার, কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায় এই ইস্কুলের প্রথম প্রজন্মের ছাত্রীদের এক জন। এই ইস্কুল থেকে বেরিয়েছেন অবলা বসুও।

আরও পড়ুন, এই বানিয়ে তোলা বাঙালিয়ানা কি রেখে যাবে তার উচাটন!

একটি কথা এখানে উল্লেখ করা দরকার। এই বেথুন স্কুল কিন্তু বাঙালির প্রথম নারীশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়। উত্তর কলকাতার গৌরীবাড়ি এলাকায় ক্যালকাটা ফিমেল জুভেনাইল সোসাইটি পরিচালিত একটি ইস্কুলের উল্লেখ পাওয়া যায় ১৮১৯ সালে। তার এক বছরের মধ্যে, ১৮২০-তে মিসেস গগারলি বলে এক ইংরেজ মহিলার উল্লেখ পাওয়া যায়, লন্ডন মিশনারি সোসাইটির তরফ থেকে যিনি কলকাতায় একটি মেয়েদের ইস্কুল খুলেছিলেন। সেখানে ছাত্রীদের বাংলা লিখতে এবং পড়তে শেখানো ছাড়াও, ভূগোল, সূচিশিল্প এবং বাইবেলের ক্লাস নেওয়া হোত। কিন্তু এই ইস্কুলগুলিতে পড়ুয়ারা আসত সমাজের অপেক্ষাকৃত নিম্নবর্গের পরিবারগুলি থেকে। বেথুন স্কুলের প্রতিষ্ঠাতাদের কৃতিত্ব এখানেই যে তাঁরা তখনকার ‘এলিট’ সমাজ, অর্থাৎ উচ্চবর্ণীয় হিন্দুবাড়ির বালিকাদের ছাত্রী হিসেবে ইস্কুলে আনতে পেরেছিলেন, রক্ষণশীল সমাজের চোখরাঙানি সত্ত্বেও!

শিক্ষার প্রসারের হাত ধরেই আসে সে শিক্ষার গুণগত মানের প্রশ্ন। এ ব্যাপারে প্রথম বিতর্কিত পদক্ষেপটি করা হয় ১৯১০ সালে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ফার্স্ট আর্টস বা এফ এ পরীক্ষার বদলে চালু করেন এন্ট্রান্স বা প্রবেশিকা পরীক্ষা। ইংরেজি সাহিত্যের দিকপাল অধ্যাপক, সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত তাঁর অসামান্য আত্মজীবনী ‘তে হি নো দিবসাঃ’ গ্রন্থে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ করে গেছেন। সুবোধ সেনগুপ্ত আজ আর জীবিত নেই। আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ও বহু দিন ইতিহাসের পাতায়। তাও সুবোধবাবুর সেই সমালোচনা আজ উল্লেখের দাবি রাখে। “বহুদিন পর বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন করণিক আমাকে বলিয়াছিলেন– বিশ্ববিদ্যালয় মোটা মোটা করিয়া শীলমোহর প্রভৃতিতে লিখে ‘অ্যাডভান্সমেন্ট অফ লার্নিং,’ কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ইহার উদ্দেশ্য হইয়া গিয়াছিল অ্যাডভান্সমেন্ট অফ আর্নিং— এল্ কাটিয়া দিতে হইবে। প্রবেশিকা পরীক্ষা দিতে বেশি ছাত্রকে প্রলুব্ধ করিতে পারিলে বেশি টাকা পাওয়া যাইবে– এই লক্ষ্য রাখিয়াই ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষার পাঠক্রম রচিত হইয়াছিল।”

(তে হি নো দিবসাঃ; সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত, সংসদ; ১৯৮৪; পৃঃ ১৯)

কিন্তু শুধুমাত্র পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়িয়ে অর্থাগমের ক্ষেত্র প্রশস্ত করার উদ্দেশ্যে এত বড় একটা পদক্ষেপ করা হয়েছিল, আজকের দিনে দাঁড়িয়ে প্রবাদপ্রতিম এই অভিযোগ কতটা গ্রহণযোগ্য? ইংরেজ শাসক প্রবর্তিত শিক্ষাব্যবস্থাকে অনেকেই কেরানি তৈরির কারখানা বলে একসময় উপহাস করেছেন, কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র থেকে জ্যোতি বসু, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বিখ্যাত, অখ্যাত সমস্ত শিক্ষিত বাঙালি যে শিক্ষাব্যবস্থার ফসল, সেই শিক্ষাব্যবস্থার প্রথম ধাপটি শুধুমাত্র স্নাতক স্তরে ছাত্র সরবরাহ করার মেশিন, এই মতামত কি নিঃশঙ্কচিত্তে মেনে নেওয়া যায়?

শুধু তাই নয়, এই শিক্ষাব্যবস্থা জন্ম দিয়েছে একটি প্রজন্মের বাঙালি বহুমাত্রিকতার। প্রেসিডেন্সি কলেজে অর্থনীতি পড়ে পরবর্তী জীবনে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্রকার হিসেবে নিজের স্বাক্ষর রেখেছেন সত্যজিৎ রায়। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র উৎপল দত্ত পরবর্তী জীবনে রঙ্গমঞ্চ এবং চলচ্চিত্রের দাপুটে অভিনেতা। প্রেসিডেন্সি কলেজে অঙ্কের ছাত্র মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের ধ্রুপদী গদ্যকার, প্রবাদপ্রতিম উপন্যাস স্রষ্টা। শিবপুরের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার বিনয় মজুমদার বাংলার পথিকৃৎ কবিদের এক জন। এই তালিকা দীর্ঘায়িত করলে পুরো লেখাটিকেই অধিকার করে বসতে পারে।


শিক্ষার প্রসারের হাত ধরেই আসে সে শিক্ষার গুণগত মানের প্রশ্ন। এ ব্যাপারে প্রথম বিতর্কিত পদক্ষেপটি করা হয় ১৯১০ সালে।

এই নিরিখে বিচার করে দেখলেও বাঙালির সাবেক শিক্ষাব্যবস্থা শুধুমাত্র গ্র্যাজুয়েট তৈরির কারখানা, এই যুক্তি ধোপে টেকে কি?

বাঙালির শিক্ষাযাত্রার একটি ক্ষেত্রেই একমাত্রিকতার অভিযোগ জোরালো হয়ে উঠতে পারে। এই অখ্যানটি কি অতিমাত্রায় কলকাতা কেন্দ্রিক? এ প্রশ্নের উত্তর সকলের মনোমত নাও হতে পারে, তবে এ কথা অস্বীকার করি কী করে যে আজকের মানিকতলা মেন রোড থেকে নিমতলা, আহিরীটোলা, শোভাবাজারে গঙ্গার ঘাটগুলি, শ্যামবাজার থেকে ধর্মতলা, এই যে উত্তর ও মধ্য কলকাতার সীমায়িত পরিসর, এই ভূমিই হল বেঙ্গল রেনেসাঁসের পুণ্যভূমি, বাঙালির শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের নগর-প্রাঙ্গণ।

শুধুমাত্র বাঙালি হিন্দু সমাজ নয়, শিক্ষিত বাঙালি মুসলমান সমাজকেও যে লালন করেছিল সে যুগের কলকাতা শহর, তার একটি অনুচিত্র দেখতে পাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবাদপ্রতিম বাংলার অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের আত্মজীবনী, কাল নিরবধি-র পাতায় পাতায়। “পার্ক সার্কাসে তখনো গ্যাসের বাতি জ্বলতো। সন্ধ্যাবেলায় সিঁড়ি কাঁধে নিয়ে একজন বাতির পর বাতি জ্বালিয়ে যেতো– দেখতে ভারি ভাল লাগতো। ভোরবেলা পাইপ দিয়ে পানি ঢেলে রাস্তা পরিষ্কার করা হতো। তখনো আমাদের এলাকায় ফুটপাতে তেমন লোক ঘুমোতো না– এক আধজন ঘুমোলেও রাস্তা ধোয়ার আগেই উঠে পড়তো। ডিপো থেকে ট্রাম বেরোলে মনে হতো, দিনের কাজকর্ম শুরু হলো।...আমাদের পাড়া প্রতিবেশীদের কথা এখানে বলে নিলে হয়তো আমাদের বাল্যকালের পরিবেশটা বোঝানো সহজ হবে। আমাদের নিকটতম প্রতিবেশীদের মধ্যে ছিলেন মেজবাহউদ্দীন আহমদ চৌধুরী (ফরিদপুরের অন্তর্গত কার্তিপুরের জমিদার) ও ক্যাপ্টেন মুহম্মদ হোসেন– সে কথা বলেছি। তাঁদের পাশে থাকতেন ডাক বিভাগে কর্মরত কিংবা সদ্য অবসরপ্রাপ্ত আবদুল গফুর। আমাদের ডানদিকে ছিলেন কফিলউদ্দীন নামে এক ব্যবসায়ী, তাঁদের নীচের তলায় বাস করতো এক বর্মি পরিবার। তাঁদের পড়শি ছিলেন ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের সদস্য– অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ– মুজিবুর রহমান। তাঁর বিদুষী কন্যা রোকেয়া রহমান (পরে কবির) আধুনিকা হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন।”

আরও কয়েকটি অুনচ্ছেদ পরে পাই এই বর্ণনা: “দাস ভবনের আরেক ফ্ল্যাটে থাকতেন মোহাম্মদ মোদাব্বের– দৈনিক আজাদের বার্তা সম্পাদক এবং তার ছোটদের পাতা মুকুলের মহফিলের পরিচালক বাগবান। তিনি ছিলেন ‘দি মুসলমান’-এর সম্পাদক মৌলভি মুজিবুর রহমানের ভ্রাতুষ্পুত্র এবং তাঁর স্ত্রী হোসেন আরা ছিলেন ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্-র ভ্রাতুষ্পুত্রী। এক সময় তাঁরা উভয়েই ঘোর কংগ্রেসী ছিলেন এবং সেই সূত্রে কারাবরণের অভিজ্ঞতা ও কেবল খদ্দর পরার অভ্যাস তাঁরা অর্জন করেছিলেন। আমি যে সময় তাঁদের দেখেছি, তখন তাঁরা মুসলিম লীগের রাজনীতিতে আস্থাবান। মহম্মদ মোদাব্বের আমাকে মুকুলের মহফিলের সদস্য করে নিয়েছিলেন। ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখে তখন এতোই রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম যে বারবার করে তা পড়তে গিয়ে কাগজটার দফা রফা হয়েছিল।”

আরও পড়ুন, নববর্ষের শুভেচ্ছাই বাঙালিকে বাঁচিয়ে রেখেছে

(কাল নিরবধি, আনিসুজ্জামান, সাহিত্য প্রকাশ; ঢাকা; ফেব্রুয়ারি, ২০০৩; পৃঃ ৫০/৫১)

শিক্ষার কী অভিঘাত। বছর ছয়েক বয়সের একটি বালক, পত্রিকার ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখে আপ্লুত হচ্ছে! এই বালক পরবর্তীকালে বাংলাদেশের নামজাদা অধ্যাপক। মোটামুটি একই সময়ে, শিক্ষিত সমাজের অন্য প্রান্তে, বয়সের অন্য প্রান্তেও, আর একটি চিত্র। অধ্যাপক সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্তর স্মৃতিচারণায় বলেছেন তাঁর বাবা হেমচন্দ্র সেনগুপ্তর কথা। একাশি বছর বয়সে জীবনের উপান্তে এসে দাঁড়িয়েছেন তৎকালীল পূর্ববঙ্গ, আজকের বাংলাদেশে, পালং স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হেমচন্দ্র। তাঁর পুত্রের কলমে ধরা পড়েছে তাঁর অদ্ভুত ‘হবি’: “তাঁহার নিজের বাইবেল ছিল কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষার ফল– বিএ ও এমএ’র জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যালেণ্ডার এবং আগের দুই পরীক্ষার জন্য কলিকাতার গেজেট। কে ১৮৯৩ সালে ইংরেজি অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস পাইয়াছিল, কে ১৮৯৪ সালে ঈশান বৃত্তি লাভ করিয়াছিল, কে বি এ তে অতিশয় খারাপ রেজাল্ট করিয়া এম এ তে ফার্স্ট হইয়াছিল, কে অল্পের জন্য এন্ট্রান্সে বৃত্তি পায় নাই– এই বিষয়ে তাঁহার অদম্য উৎসাহ ছিল, এবং জ্ঞানও ছিল প্রচুর ।”

(তে হি নো দিবসাঃ; সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত, সংসদ; ১৯৮৪; পৃঃ ৫)

কী অদ্ভুত ‘হবি’ বিশ শতকের গোড়ার দিকের এক প্রবীণ শিক্ষকের ! আজকের দিনের ফুটবল পাগল কোনও তরুণ ঠিক যেমন মেসি, রোনাল্ডো বা মেসুৎ ওজিলের অর্থপ্রাপ্তি এবং দলবদলের খবর রাখে!

বাঙালির শিক্ষাযাত্রার এর চেয়ে বাঙ্ময় দু’টি অনুচিত্র কোথায় পাব? ছ’ বছরের একটি মুসলমান বালক, যে পরবর্তী জীবনে বাংলাদেশের নামকরা অধ্যাপক হবে, সে ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখে আপ্লুত হচ্ছে। ঠিক উল্টো দিকে যাত্রা করেছেন এক বৃদ্ধ। কর্মজীবন কেটেছে তৎকালীন পূর্ববঙ্গে, যা এক দিন বাংলাদেশ হবে। অবসর নিয়ে চলে এসেছেন এপারে, ছেলের কাছে। তাঁর শেষজীবনের ‘প্যাশন’ ইউনিভার্সিটির পরীক্ষায় কৃতকার্য এবং অকৃতকার্য ছাত্রদের নাম মুখস্ত করা!

বাঙালির এই শিক্ষাযাত্রা শুরু হয়েছিল ঠিক কবে? নির্দিষ্ট করে কি ও ভাবে বলা যায়? এত ক্ষণ তো একুশ থেকে বিশ, বিশ থেকে উনিশ শতকে— কালস্রোতের উল্টো দিকে যাত্রা করলাম আমরা।

আরও এক শতক পিছিয়ে যাওয়া যাক। ১৭৮৫ সাল। বছর দুয়েক হল ফোর্ট উইলিয়ামে অবস্থিত সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হয়ে কলকাতায় এসেছেন উইলিয়াম জোনস। ভাষা শিক্ষার প্রতি অদম্য আকর্ষণ উইলিয়াম জোনসের। সংস্কৃত শিখতে চান। সংস্কৃত সাহিত্যের বিপুল ভাণ্ডার তাঁকে হাতছানি দিচ্ছে। তা ছাড়া সংস্কৃত জানলে কাজেরও কিছুটা সুবিধে হবে। তাই তিন মাসের ছুটি নিয়ে কৃষ্ণনগর চলেছেন জোনস। সেখানে তাঁর সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত রামলোচনের সঙ্গে দেখা হবে। সংস্কৃত শিখবেন তিনি পণ্ডিত রামলোচনের কাছে। দুই অসম ব্যক্তির সখ্য হবে। কালে দিনে উইলিয়াম জোনস নিজেই হয়ে উঠবেন সংস্কৃতের বিরাট এক জন অথরিটি। এ সব এখনও ভবিষ্যতের গর্ভে। নদিয়া জেলা সংস্কৃতচর্চার পীঠস্থান। সেখানে গেলে সংস্কৃতের এক জন ভাল শিক্ষক নিশ্চয়ই খুঁজে পাওয়া যাবে, শুধুমাত্র এই আশায়, কৃষ্ণনগরের পথে বেরিয়ে পড়েছেন উইলিয়াম জোনস। বাঙলাভাষী জনগোষ্ঠী কি জানে, এই যাত্রার মধ্য দিয়ে তাদেরও একটি অভিনব শিক্ষাযাত্রা শুরু হতে চলেছে?

(প্রবন্ধকার লন্ডনপ্রবাসী সাহিত্যিক ও সাংবাদিক)

অলঙ্করণ: তিয়াসা দাস।