আমার বাড়ির কাছেই থাকতেন রেণুপদ সরকার, যাঁকে করিমপুর ও আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষ ‘রেণু আর্ট’ নামেই চেনেন। যেমন হাতের লেখা, তেমনই অসাধারণ শৈল্পিক তুলির স্পর্শে এক সময়ে সাইনবোর্ড-ফেস্টুনে জীবন্ত হয়ে উঠত অক্ষরগুলি। এই ফ্লেক্স, গ্লো-সাইন বোর্ডের ভিড়ে এখনও করিমপুরের কয়েকটি দোকানে ঢুঁ মারলে তাঁর আঁকা সেই সব সাইনবোর্ড খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। মুখে ছড়া তৈরি করতে-করতেই সাইনবোর্ড, ব্যানার লিখতেন সদাহাস্য ওই শিল্পী। বেশ কয়েক বছর আগেই তাঁকে হারিয়েছি আমরা। সঙ্গে হারিয়ে ফেলেছি  তাঁর কাজগুলিকেও। এখন আর ফেস্টুন লেখার জন্য কোনও রেণুপদবাবুকে খুঁজে পাব না। হাতে লেখা এই শিল্পের যখন থেকে মৃত্যু ঘটতে শুরু করেছে তখনই ‘রেণু আর্ট’-এর চলে যাওয়া! 

হঠাৎ কেন এই প্রসঙ্গের অবতারণা, এ বার বলি। গত ২৫ অক্টোবর পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা প্রশাসনের তরফে যখন খড়্গপুরে উপ-নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণা হল, তখনই প্রথামাফিক  আরও কয়েকটি নির্দেশিকা দেওয়া হয়। তার মধ্যে একটি— ‘এ বারের নির্বাচনে প্রচার কার্যে প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে সব দলকেই।’ অর্থাৎ প্রচারের জন্য পরিবেশের পক্ষে ভয়ঙ্কর ক্ষতিকারক প্লাস্টিকের ব্যবহার। বর্তমানে প্লাস্টিকের ফ্লেক্স ও পতাকার ব্যবহার সেই ক্ষতির পরিমাণ অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে। পরিবেশ নিয়ে উদ্বিগ্ন কম-বেশি সকলেই। দেরিতে ঘুম ভাঙলেও প্রশাসনের উদ্বেগ এবং প্রয়োজনীয় উদ্যোগ স্বাভাবিক। সাধুবাদ জানাতেই হয় এ রকম নির্দেশিকাকে।

খড়্গপুর, কালিয়াগঞ্জ ও করিমপুর, রাজ্যের এই তিন বিধানসভায় আগামী ২৫ নভেম্বর উপনির্বাচন। এর মধ্যে নদিয়ার প্রান্তিক শহর করিমপুর। এখানেও নদিয়া জেলা প্রশাসন করিমপুরের উপনির্বাচনে এরকম কিছু সদর্থক ভূমিকা গ্রহণ করলে ভাল লাগবে। ভূমিকা মানে শুধু নির্দেশিকা জারি করা নয়। কেননা নির্বাচন কমিশন যে প্রচারে প্লাস্টিক ব্যবহার বন্ধ করতে চাইছে তা গত লোকসভা নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলির প্রতি তাদের পরামর্শ বা অনুরোধ থেকেই স্পষ্ট। কিন্তু তা কার্যকর করতে হলে  প্রয়োজন সরাসরি মাঠে নামা এবং সাধারণ মানুষকে সচেতন করা। 

এই কয়েক দিন আগেই কৃষ্ণনগর পুরসভা দৃষ্টান্ত স্থাপন করে প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধ করার জন্য মাঠে নেমেছে। ফলও মিলেছে হাতেনাতে। প্রশাসনের উদ্যোগ এবং সাধারণ মানুষের আন্তরিক সহযোগিতায় কাজ এগোচ্ছে দ্রুত। কৃষ্ণনগরকে দেখে নদিয়ার অন্য শহরগুলিরও ঘুম ভাঙতে শুরু করেছে। সংবাদপত্রে নিয়মিত লেখা বেরোচ্ছে, তা থেকেও  উঠে আসছে সচেতনতার পাঠ। আশা করব, এই পাঠ গ্রহণ করবেন আমাদের জেলার নির্বাচন কমিশনও। 

বাস্তব হল, নির্বাচনের কাজে ব্যাপক ভাবে ব্যবহৃত হয় প্লাস্টিকের ফ্লেক্স-পতাকা প্রভৃতি। সে সব কিছু দিন পরেই ছিঁড়ে পড়ে রাস্তায়। কখনও কখনও চলে যায় নানা নর্দমা এবং জলাশয়েও। আটকে যায় নিকাশির স্বাভাবিক গতিপথ। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনাকাটা এবং অন্য কাজে প্লাস্টিকের ব্যবহার আমাদের যে ক্ষতি করেছে, তা নিয়ে গত বছর যথেষ্ট উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল রাষ্ট্রপুঞ্জ। ২০১৮ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জ প্লাস্টিক ব্যবহার বন্ধ করার উপরে বিশেষ নজরদারির জন্য ভারতকে ‘হোস্ট কান্ট্রি’ ঘোষণা করেছিল। সচেতন নাগরিকেরা এ নিয়ে বিশেষ ভাবে চিন্তিত। হয়তো তারই ফলস্বরূপ কৃষ্ণনগর পুরসভার মতো অগ্রণী উদ্যোগ, যা প্রশাসনের অন্য স্তরেও অনুকরণীয়। তবে শুধু নিত্যদিনের ব্যবহার্য প্লাস্টিকই নয়, নির্বাচনের সময়ে যে বহুল পরিমাণে প্লাস্টিকের ব্যবহার করা হয় তা-ও আটকাতে হবে এ বার। 

তবে শুধু প্রশাসনের ঘোষণা বা তৎপরতা দিয়েও তো হবে না। রং নিরপেক্ষ ভাবে রাজনৈতিক দলগুলি এ বিষয়ে সচেতনতা দেখালে কাজটা অনেকটাই সহজ হবে। তার দরুণ বহু সংখ্যক মানুষের কাছে সরাসরি প্লাস্টিক ব্যবহার বন্ধ করার বার্তাও দেওয়া যাবে। কারণ, রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত অসংখ্য মানুষ। মিটিং-মিছিলে-সভায় প্লাস্টিক বর্জন করে তাঁরাও উপলব্ধি করবেন যে শুধু বাজারের সময়ে প্লাস্টিকের প্যাকেট বন্ধ করলেই হবে না, জীবনযাত্রার প্রতি পদেই সেই নীতি অনুসরণ করে চলতে হবে। দেশ-দুনিয়ার ভবিষ্যতের দাবি সেটাই। 

প্রশাসনের এই উদ্যোগ যদি সত্যিই বাস্তবায়িত করা যায়, তবে কে বলতে পারে, আবার হয়তো আমরা ফিরেও পেতে পারি ‘রেণু আর্ট’। ক্ষীণ হলেও এই আশা আমরা করতেই পারি। সেই আগের মতো থান কাপড়ের গায়ে লেখা থাকবে ভোটের আবেদন। হাত-হাতুড়ি-ঘাস-পদ্ম আঁকা হবে আবার কাগজের পোস্টারে বা শালু কাপড়ের পতাকায়। কিন্তু কোনও ভাবেই প্লাস্টিকের ফ্লেক্স-পতাকা চলবে না।

সকলে মিলেমিশেই উপড়ে ফেলতে হবে বহুদিনের পুরনো এই প্লাস্টিক রোগ। পঙ্গু হবার আতঙ্ককে তুড়ি মেরে শপথ নিতে হবে। প্রশাসনের নির্দেশ এবং তার পরবর্তী পদক্ষেপের অপেক্ষায় না থেকে সব রাজনৈতিক দলকেই এই দায়িত্ব তুলে নিতে হবে। নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দলের কাছে এই প্রত্যাশা তো করাই যায়!এ বারের করিমপুর উপনির্বাচন হোক নদিয়ার প্লাস্টিক-বিরোধী যুদ্ধের দ্বিতীয় ধাপ।

 

সীতানগর বিদ্যালয়ের শিক্ষক