নিয়মিত অবকাশে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগ না উঠিলে সম্ভবত মার্কিন রাজনীতি সচল থাকে না। পক্ষান্তরে, ট্রাম্প এমনই অভূতপূর্ব গর্হিত সব কার্যকলাপ করিয়া থাকেন, যে উহাই যেন সচলতার চাবিকাঠি হইয়াছে। সম্প্রতি শোনা গেল, প্রাক্তন ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও তাঁহার পুত্রের বিরুদ্ধে পুনরায় তদন্ত শুরু করিবার জন্য ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেনস্কিকে অনুরোধ করিয়াছেন ট্রাম্প। তাঁহার সহিত জেলেনস্কির একটি টেলি-কথোপকথন ফাঁস করিয়াছেন এক হুইসলব্লোয়ার, এবং উহার সূত্রেই বিতর্ক। প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তিতে হাউস অব রিপ্রেজ়েন্টেটিভসে— যেখানে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠ— ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়া শুরু হইয়াছে। এবং ট্রাম্প স্বকীয় ভঙ্গিমায় ‘সকলই আবর্জনা’ বলিয়াছেন। অভিযোগকারীর উপর পাল্টা চাপও সৃষ্টি করিতেছেন। সুতরাং, মার্কিন রাজনীতির আঙিনায় বিষয়টি সহজে থিতাইবে না। অভিযোগ এবং পাল্টা অভিযোগ লইয়া আন্তর্জাতিক মহলও সরগরম থাকিবে কিছু দিন।

ঘটনা যদি সত্য হয়, তাহা হইলে নিঃসন্দেহে ইহার তুল্য অন্যায় আর হয় না। ট্রাম্পের ন্যায় পদাধিকারীদের বুঝিয়া লওয়া উচিত যে তাঁহারা পদাধিকারী মাত্র, ঈশ্বর নহেন। এবং উহাও নির্দিষ্ট কালপর্বের জন্য, চিরদিনের জন্য নহে। মার্কিন জনতার দ্বারা নির্বাচিত হইয়া চার বৎসরের জন্য প্রেসিডেন্টের কার্যালয় চালাইবার দায়িত্ব পাইয়া থাকেন এক ব্যক্তি। সেই স্থলে পদের সহিত ব্যক্তিকে এক করিয়া দেওয়া কেবল বিসদৃশ নহে, অপরাধ। ক্ষমতাকে অধিকার বলিয়া ভুল করা কিংবা ইচ্ছাকৃত ভাবে গুলাইয়া দেওয়ার সেই কাজটিই দিনের পর দিন করিয়া চলিয়াছেন ট্রাম্প। দেশের স্বার্থে কাজ করিবার শপথ লইয়া ক্রমাগত আপনার স্বার্থে কাজ করিতেছেন। স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি যথার্থ রূপেই চিহ্নিত করিয়া বলিয়াছেন, রাজনৈতিক সুবিধার্থে কেহ প্রেসিডেন্ট পদের অপব্যবহার করিলে উহা সংবিধানের উপর আঘাত, কেননা প্রেসিডেন্টের প্রতারণা আসলে জাতির সহিত প্রবঞ্চনার শামিল।

উক্ত সংঘাতের মূল আসলে রাষ্ট্রের সহিত সরকারের দ্বন্দ্ব। গণতান্ত্রিক দেশে সরকার পাল্টাইবেই, ইহা ভবিতব্য। সেই চক্রাকার নিয়মে উগ্র দক্ষিণপন্থী কোনও প্রশাসকের অব্যবহিত পরেই ক্ষমতাসীন হইতে পারেন উদারমনস্ক মধ্যপন্থী এক শাসক। ইহাতে সঙ্কট নাই— রাজনৈতিক বোধ সরকারের ঘরোয়া নীতির দিকনির্দেশ করিতেও পারে, কিংবা করিবারই কথা, সেই জন্যই গণতান্ত্রিক নির্বাচনের বন্দোবস্ত। কিন্তু কিছু বিষয় থাকে, যাহা সরকারের ঊর্ধ্বে থাকা বিধেয়। সরকার পরিবর্তিত হইলে কি সেনাবাহিনীর আচরণ বদলাইয়া যায়? বিদেশনীতিকেও তাই সরকারের মেয়াদের বদলে রাষ্ট্রের কাঠামোয় দেখা দরকার। সরকারের পরিচালকদের আদর্শ বদলাইয়া গেলেও বৈদেশিক সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে আচরণের ক্ষেত্রে একটি সামঞ্জস্য না থাকিলে দেশ পরিচালনায় সঙ্কট দেখা দিতে পারে। ইতিমধ্যেই দেখা গিয়াছে, দক্ষিণ এশিয়ার দুই পরমাণু শক্তিধর দেশের বর্তমান নেতারা ঘরোয়া রাজনীতিতে সুবিধা পাইবার হিসাবে বিদেশনীতি নির্ধারণ করিবার ফলে অসামান্য সঙ্কট জন্ম লইয়াছে। শেষাবধি মার্কিন নেতারা শিক্ষা লইবেন না তত দূর হঠকারী হইবেন, সেই উত্তর কালের গর্ভে।