সেই বামফ্রন্ট নাই, সেই সোভিয়েট ইউনিয়নও নাই। তবু, রাশিয়া যে পথে, পশ্চিমবঙ্গও সেই পথেই। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন পুরুষ কর্মীদের অবসরের বয়স বাড়াইয়া ৬৫ করিয়াছেন, মহিলাদের ৬২। শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের রাজত্বে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের অবসরের বয়স ৬২ হইতে বাড়িয়া ৬৫-তে ঠেকিল। ভলগা ও গঙ্গার তীরে কারণ পৃথক নহে। শিক্ষকদের অবসরগ্রহণ করিতে দিলে পেনশনের বোঝা বাড়িবে। সেই বোঝা বহিবার ক্ষমতা রাজকোষের নাই। তাঁহাদের চাকুরিতে বাঁধিয়া রাখিলে নূতন শিক্ষক নিয়োগের খরচ বাঁচে, পেনশনও দিতে হয় না। প্রশ্ন হইল, এই ভাবে আর কত দিন? প্রথমত, শিক্ষকদের চাকুরির মেয়াদ বাড়াইয়া যাওয়ার মধ্যে দ্বিবিধ অন্যায় আছে। এক, বহু শিক্ষকই এই বাড়তি বৎসরগুলি চাকুরি করিতে চাহেন না। রাজ্যের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলির অবস্থা এমনই যে তাঁহাদের দোষ দেওয়াও দুষ্কর। অন্য পেশার সরকারি চাকুরেরা যে বয়সে মুক্তি পাইবেন, শিক্ষকদের কেন তাহার অধিক বৎসর চাকুরি করিতে হইবে, এমন প্রশ্ন কেহ করিতেই পারেন। চাকুরির গোড়ায় তাঁহারা জানিতেন, ৬০ বৎসরে অবসর। তাঁহাদের সম্মতির তোয়াক্কা না করিয়াই বয়সটিকে বাড়াইয়া দেওয়ার মধ্যে চুক্তির অসম্মান রহিয়াছে। সরকার তাহা ন্যায়ত করিতে পারে কি? আবার, অন্যান্য সরকারি কর্মীরা আপত্তি করিতে পারেন, শিক্ষকরা বাড়তি পাঁচ বৎসর রোজগারের সুযোগ পাইলে তাঁহারা বঞ্চিত হইবেন কেন? 

আশঙ্কা হয়, শিক্ষামন্ত্রীর নিকট একটি আপত্তিরও গ্রহণযোগ্য উত্তর নাই। তিনি জানেন, সরকার একটি টাইম বোমার উপর বসিয়া আছে— পেনশনের টাইম বোমা। বোমাটি যেন না ফাটে, যে কোনও উপায়ে তাহা নিশ্চিত করাই এখন প্রধানতম তাগিদ। তবে, সেই বোমা আজ না হউক পরশুর পরের দিন ফাটিবেই। পেনশন নামক সমস্যাটির সম্মুখীন হওয়া ভিন্ন নিস্তারের পথ নাই। বদলে তাঁহারা ধামার সন্ধানে পথে নামিয়াছেন। অবসরের বয়স বাড়াইবার ধামায় সমস্যাটিকে চাপা দেওয়ার অনর্থক চেষ্টায়। তাঁহারা বরং সমস্যাটির কথা স্বীকার করিতে পারিতেন। নিজেদের কাছেও, জনগণের কাছেও। বলিতে পারিতেন, পেনশন খাতে ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের জোগান দেওয়ার সামর্থ্য তাঁহাদের নাই। সন্দেহ নাই, তাহাতে প্রশ্ন উঠিত, তির্যক মন্তব্যও শুনিতে হইত। কেহ ইমামদের ভাতার প্রসঙ্গ টানিতেন, কেহ ক্লাবে-ক্লাবে খয়রাতির কথা স্মরণ করাইয়া দিতেন, কেহ আবার কৃষকমৃত্যুতে দুই লক্ষ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতির অযৌক্তিকতার কথা উত্থাপন করিতেন। এই খরচগুলির যাথার্থ্য প্রতিষ্ঠা করা দুষ্কর, কিন্তু একই সঙ্গে বলা প্রয়োজন, পেনশনের সমস্যাটি আয়তনে ঢের বড়। এই খরচ কাটিয়াও যে পেনশন সমস্যার সমাধান হইবে না, সেই কথাটি বলিতে হইলেও গোড়ায় সমস্যাটি স্বীকার করা বিধেয়। 

অর্থমন্ত্রী নিশ্চয় জানিবেন, সমস্যাটি তাঁহার একার নহে। গোটা দুনিয়াই এখন পেনশন খাতে বাড়তি সমস্যার সমাধানের পথ হাতড়াইতেছে। বস্তুত, ২০০৭ সালের ব্যাঙ্কিং সঙ্কটের সহিত তাহার তুলনা চলিতেছে, সমস্যাটি এতই বড়। পেনশনের টাকা শেয়ার বাজারে খাটিলে কিছু দূর অবধি সামাল দেওয়া যায়, সরাসরি রাজকোষ হইতে টাকা জোগাইলে সেই উপায়টুকুও থাকে না। কিন্তু, মূল সমস্যা হইল, মানুষের গড় আয়ু বাড়িতেছে। গোটা দুনিয়ায়, ভারতেও, পশ্চিমবঙ্গেও। সেই দীর্ঘ আয়ুষ্কালব্যাপী পেনশন জোগাইতে স্বভাবতই পূর্বের তুলনায় খরচও বেশি হইতেছে। পারিবারিক পেনশন এই মেয়াদ আরও বাড়ায়। এত টাকার সংস্থান হইবে কোন পথে? এই সমস্যাটি গোপন করা কেন? বিশেষত, ইহা সেই বিরল গোত্রের সমস্যা, যাহা সরকারের প্রশাসনিক ভুলে সৃষ্টি হয় নাই। ধামা খুঁজিবার কী প্রয়োজন?