হতাশা পিছু ছাড়তে চায় না কিছুতেই। বারবার ফিরে আসে সেই একই অনাকাঙ্খিত দৃশ্যপট, নিত্য নতুন রূপে। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের বাসিন্দা হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিই। কিন্তু নির্ভেজাল গণতন্ত্রেই রয়েছি, নাকি গণতন্ত্র-গণতন্ত্র খেলছি, মাঝে মধ্যে বুঝতে পারি না সে কথা।

উত্তরপ্রদেশ থেকে এসেছে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাটার খবর। মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্যের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে একটি সংবাদমাধ্যমের সম্পাদক ও মালিককে, গ্রেফতার করা হয়েছে একাধিক সাংবাদিককে। যে খবর সম্প্রচারের জেরে এই পদক্ষেপ উত্তরপ্রদেশ সরকারের, সেই খবর একতরফা বা একপেশে ভাবে পরিবেশিত হয়েছে বলে উত্তরপ্রদেশের শাসকদের দাবি এবং শাসকের দাপটে সঙ্কটে গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ।

সংবাদমাধ্যম কখনও ভুল করতে পারে না, এমন তত্ত্ব অবাস্তব। ভুল যে কারওই হতে পারে। কিন্তু সত্যিই ভুল হল, নাকি যিনি ভুল হল বলে ভাবছেন, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনও ভুল রয়ে গেল, তাওতো বিচার করা প্রয়োজন। সেই বিচারটা কে করবেন? একপক্ষ বাদী, আর এক পক্ষ বিবাদী। এই দুইপক্ষের বাইরে কারওকে বিচারটা করতে হবে। অর্থাৎ বিচার বিভাগই এক্ষেত্রে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বিচার বিভাগের কাছে বিষয়টা নিয়ে যাওয়াই হল না। প্রশাসন আগেই সংবাদমাধ্যমকে দোষী হিসেবে চিহ্নিত করে ফেলল। সংবাদমাধ্যমের সম্পাদক, মালিক, একাধিক সাংবাদিক গ্রেফতার হয়ে গেলেন। এটা কি গণতন্ত্রের নমুনা? এটা কি গণতান্ত্রিক বাতাবরণের লক্ষণ?

সম্পাদক অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা আপনার ইনবক্সে পেতে চান? সাবস্ক্রাইব করতে ক্লিক করুন

উত্তরপ্রদেশে যে ঘটনা ঘটেছে, তা কিন্তু কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গোটা ভারতেই এই ধরনের ঘটনা আমরা ঘটতে দেখি। বেশি দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। নিজেদের পশ্চিমবঙ্গেই চোখ রাখা যাক। চট করে স্মৃতিতে উঁকি দেবে অম্বিকেশ মহাপাত্রর মুখটা। প্রায় একই রকম কারণে চরম হেনস্তার শিকার হতে হয়েছিল তাঁকে। একটি ব্যঙ্গ চিত্রকে ইমেলের মাধ্যমে বেশ কিছু লোকজনের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার ‘অপরাধে’ শাসকদল ও প্রশাসন খড়্গহস্ত হয়েছিল অম্বিকেশ মহাপাত্রর উপরে। যে চিত্র অম্বিকেশ ছড়িয়েছিলেন, তা কোনও ব্যঙ্গ চিত্র ছিল না, তা এক ষড়যন্ত্রের অঙ্গ ছিল— এমনই কথাবার্তা শোনা গিয়েছিল শাসক শিবির থেকে। বিচারটা সেবারও বিবদমান দুটি পক্ষের একটির তরফ থেকেই হয়েছিল, বিচার বিভাগের কোনও ভূমিকা ছিল না।

আরও পড়ুন: যোগীর ‘ভাবমূর্তি’ নষ্ট করার অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া সাংবাদিকের স্ত্রী সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ

অম্বিকেশ মহাপাত্রের সঙ্গে সে দিন যে ঘটনা ঘটেছিল, তাও ছিল মতপ্রকাশ বা ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতায় রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ। উত্তরপ্রদেশে এখন যা ঘটল, তাও একই ধরনের হস্তক্ষেপ। বারবার এইরকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হওয়ার পরেও কী ভাবে বলব যে, সুস্থ গণতন্ত্রে বাস করছি আমরা?

বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের বাসিন্দা হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিতে ভালই লাগে। কিন্তু সেই গর্বের অংশীদার হতে হলে কিছু দায়বদ্ধতার ভাগীদারও হতে হয়। ক্ষমতার অলিন্দে পৌঁছেই আমরা সেই দায়বদ্ধতার কথা ভুলে যাই সম্ভবত। গণতান্ত্রিক বিনম্রতা মুখোশ হয়ে থেকে যায় তখন। মুখোশের পিছনে আসল মুখচ্ছবিটা সর্বময় কর্তৃত্বকামী হয়ে ওঠে তখন। এই দুর্ভাগ্যজনক প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে প্রকৃত গণতন্ত্রের অনুসারী হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেওয়া উচিত হবে না।