শেষ পর্যন্ত মারাই গেলেন দেগঙ্গার অনুপ সর্দার। তিন জন গুনিন তাঁর শরীরে বাসা-বাঁধা শয়তানকে তাড়াতে না পারার জন্যেই নাকি এই মৃত্যু। জ্বরের চিকিৎসার জন্যে প্রথমে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বটে, কিন্তু অবস্থার অবনতি হলে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর না করে তাঁর পরিজনেরা ভরসা রেখেছিলেন গুনিনের উপর। এমনকি চিকিৎসার জন্য সরকারি কর্তাব্যক্তিদের বারংবার অনুরোধ উপেক্ষা করে সরকারি অ্যাম্বুল্যান্স ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। অথচ, তিনি যে কলোনিতে বাস করতেন, সেটি কলকাতার কাছেই এবং বামপন্থী নেতা হরেকৃষ্ণ কোঙারের নামে নামাঙ্কিত। একদা এই বামপন্থীরাই ধর্ম ও সংস্কারের ঊর্ধ্বে এক যুক্তিবাদী এবং প্রগতিশীল জীবনচর্যার জন্যে পথে নেমেছিলেন। অথচ আজও দেশ জুড়ে কুসংস্কার যে কী ভয়ঙ্কর ভাবে বাসা বেঁধে আছে, কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করলেই বোঝা যায়। 

২০১৮ সালের মার্চ মাসে উত্তরপ্রদেশের আলিগড়ে তান্ত্রিকের পরামর্শে কাকা বড়লোক হওয়ার লোভে নিজের পাঁচ বছরের ভাইঝিকে বলি দেয়। ঝাড়খণ্ডে অষ্টম শ্রেণির একটি ছেলের মৃত্যুর পরেও তিন দিন তার সৎকার করা হয়নি, কারণ তান্ত্রিক আশ্বাস দিয়েছিল, ছেলেটি আবার বেঁচে উঠবে। খাস কলকাতাতেও এমন একাধিক ঘটনা আমাদের সামনে এসেছে। অসমের ওদালগুড়ি জেলার এক বিজ্ঞান-শিক্ষকের বাড়িতে এক তিন বছরের শিশুকন্যাকে বলি দেওয়ার জন্যে যখন তোড়জোড় চলছিল, তখন স্থানীয়রা এবং পুলিশ বাধা দিলে ওই পরিবারের লোকজনের সঙ্গে এমন সংঘর্ষ হয় যে, পুলিশের গুলিতে এক জন মারা যায়।

আজও গ্রামে-গঞ্জে সাপে-কাটা রোগীকে ওঝার কাছে নিয়ে যাওয়া প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। মনোরোগীর চিকিৎসার জন্যে ধরে আনা হয় তান্ত্রিক, জন্ডিসের চিকিৎসার জন্যে গলায় পরানো হয় মন্ত্রপূত শিকড়বাকড়ের মালা। পরীক্ষা দিতে যাওয়া কলেজপড়ুয়া বিজ্ঞানের ছাত্রটি চোখ রগড়াতে থাকা ট্রাফিক কনস্টেবলের কাছে গিয়ে দু’চোখ দেখানোর জন্যে কাকুতিমিনতি করে, কারণ এক চোখ দেখা নাকি অশুভ!   

সত্তর এবং আশির দশকে গ্রামে-গ্রামে গান, নাটিকা, পথসভার মাধ্যমে মানুষের মন থেকে কুসংস্কার দূর করার জন্যে সচেতনতা কর্মসূচির আয়োজন করা হত। তাঁদের একটা রাজনৈতিক পরিচয় নিশ্চয়ই ছিল, কিন্তু সার্বিক উদ্যোগ এবং প্রচেষ্টায় সেই পরিচয় কখনও মুখ্য হয়ে ওঠেনি। তবে ঝাড়ফুঁক, তুকতাকের অসারতা সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে অবহিত করার জন্যে যে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের প্রয়োজন ছিল, স্বাধীনোত্তর ভারতে কখনও তা গুরুত্ব পায়নি।

ফলে আজও ভূত-প্রেত, দৈত্য-দানো, জিন-পরি, ডাইনিদের ভরভরন্ত সংসার। এদের কবল থেকে রক্ষা করার জন্যে ওঝা, গুনিন, তান্ত্রিক, সিদ্ধাই এবং বিভিন্ন নামধারী বাবা-মায়ের রমরমা ব্যবসা। সংবাদপত্র, আন্তর্জাল, বৈদ্যুতিনমাধ্যম, রাস্তার ধারের হোর্ডিং, এমনকি দেওয়াললিখনে তাঁদেরই দেওয়া বিজ্ঞাপনের ছড়াছড়ি।

দুঃখের ব্যাপার হল, কেন্দ্র ও রাজ্যে আইন প্রণয়ন থেকে নীতি নির্ধারণের গুরুদায়িত্ব যাঁদের কাঁধে, তাঁদের একটা বড় অংশ এই অন্ধবিশ্বাসের ঊর্ধ্বে নন। সম্প্রতি জনপ্রতিনিধিদের কেউ বলছেন, গোবর এবং গো-চোনা নাকি কর্কট রোগ নিরাময় করতে সক্ষম, কেউ বলছেন, গরু নাকি অক্সিজেন নিঃসরণ করে। জনপ্রতিনিধিরা মুখ খুললেই এখন এমন মণিমুক্তো বর্ষণ গা-সওয়া হয়ে গিয়েছে। তবে সবচেয়ে বিপজ্জনক হল, নিজেদের ভ্রান্ত বিশ্বাসকে অন্যের উপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা। বিশেষ করে দেশের প্রধানমন্ত্রী যখন দাবি করেন, টেলিভিশন আবিষ্কারের পিছনে মুনিঋষিদের যোগবলে দিব্যদৃষ্টি লাভের ভূমিকা রয়েছে, তখন এক জন নাগরিক হিসেবে লজ্জার চাইতে শঙ্কা হয় অনেক বেশি। সভ্যতার অভিমুখ কি তবে সত্যিই পশ্চাদমুখী? পরিত্রাণের কি কোনও উপায় নেই?  

তবে এত অন্ধকারেও আলোর ঝলকানি দেখা গিয়েছে মহারাষ্ট্রে। ২০১৩ সালে প্রণীত হয়েছে “দ্য মহারাষ্ট্র প্রিভেনশন অ্যান্ড ইর‌্যাডিকেশন অব হিউম্যান স্যাক্রিফাইস অ্যান্ড আদার ইনহিউম্যান, ইভ‌্‌ল অ্যান্ড অঘোরি প্র্যাকটিসেস অ্যান্ড ব্ল্যাক ম্যাজিক অ্যাক্ট, ২০১৩’’। তন্ত্র-মন্ত্র, জাদুটোনা, কিংবা নরবলি চর্চাকারীর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ করার সংস্থান তৈরি হয়েছে এই আইনে। পশ্চিমবঙ্গেও বিচারপতি প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে এক আইন কমিশন গঠিত হয়েছে। উদ্দেশ্য, ডাইনি-শিকার, গণপিটুনি এবং তন্ত্রচর্চার কবল থেকে সুরক্ষা দিতে আইন প্রণয়ন করা। অবশ্য আইনের নামে শাসনের বেড়ি পরানোর পাশাপাশি মানুষের মন থেকে কুসংস্কারের ভূত তাড়ানোটাও জরুরি। 

পশ্চিমবঙ্গে কয়েকটি বিজ্ঞানমনস্ক অ-সরকারি সংগঠন নিজেদের উদ্যোগে যে কোনও অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে দীর্ঘ দিন ধরে সচেতনতা প্রসারের কাজ করে আসছে। কিন্তু শীতঘুম ভেঙে এ কাজে রাজনৈতিক দলগুলি যদি সর্বাত্মক ভাবে এগিয়ে না আসে, তা হলে এই অন্ধকার থেকে মুক্তির আশা কম।