তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের আগেই যা ক্ষতি হওয়ার, হয়ে যায়
‘এমন যদি সত্যি হত, আহা’
মাধ্যমিক পরীক্ষা চলছিল তখন, কিছু দিন আগে। এক বন্ধুর কাছে শুনলাম ফেসবুকে নাকি বিবেকানন্দের একটা বাণী খুব ছড়াচ্ছে— ‘‘সফলতার কোনো লিফ্ট নেই, তোমাকে সিঁড়ি বেয়েই উঠতে হবে।’’
Photo

মাধ্যমিক পরীক্ষা চলছিল তখন, কিছু দিন আগে। এক বন্ধুর কাছে শুনলাম ফেসবুকে নাকি বিবেকানন্দের একটা বাণী খুব ছড়াচ্ছে— ‘‘সফলতার কোনো লিফ্ট নেই, তোমাকে সিঁড়ি বেয়েই উঠতে হবে।’’ এমন পরামর্শ কবে কোথায় দিলেন স্বামীজি? নির্ঘাত কোনও নেতা তাঁর ‘ছেলে’দের অনুপ্রাণিত করতে গিয়ে এই কাণ্ড ঘটিয়েছেন। বাণী নেই তো কী, কিছু একটা স্বামীজির নামে লিখে টাঙিয়ে দাও। ওই নামটা বাজারে খায়।

অধুনা ফেক নিউজ়ের রমরমার বুনিয়াদ এটাই। ফেক নিউজ় কী? স্রেফ মিথ্যে কথা। উদাহরণ? অজস্র। গত অক্টোবরে পঞ্জাবে রেল লাইনের উপর দাঁড়িয়ে দশেরার রাবণ পোড়ানো দেখছিলেন একদল মানুষ। তাঁদের উপর দিয়ে ট্রেন চলে যায়। ষাট জনের মৃত্যু হয়। সবাই যখন শোকস্তব্ধ, সোশ্যাল মিডিয়ায় রটে গেল, ‘‘কেউ কি ট্রেন চালকের ধর্মপরিচয় খুঁজে বার করার চেষ্টা করেছিলেন? ইমতিয়াজ় আলি। এ বার বুঝুন ট্রেন কেন থামেনি, এবং অত গতিতে কেন চলছিল।’’ বাস্তবে, ড্রাইভারের নাম অরবিন্দ কুমার। যারা খবর ছড়াচ্ছিল, তারা নাকি আইটি সেল কর্মী। বিজেপি নেতারা তাদের ‘ফলোয়ার’। প্রধানমন্ত্রীও।

নরেন্দ্র মোদীর প্রশাসনিক দক্ষতা সুউচ্চে তুলে ধরতে তাঁর অনুগামীরা তাবড় ব্যক্তিত্বের শরণ নিয়েছেন। খবর ছড়িয়েছে, ‘‘ফিলিপ কোটলার (মার্কেটিং গুরু) উবাচ: আমার কর্মজীবনে বহু লোককে বিপণনের তত্ত্ব শিখিয়েছি। কিন্তু মোদীকে সেই কৌশল নিয়ে কিছুই শেখাতে পারব না। তিনি সবই জানেন।’’ কোটলারকে যোগাযোগ করলে জানা যায়, এ রকম কিছুই বলেননি তিনি। এই তথ্য জানিয়েছিল ‘দ্য ফিয়ারলেস ইন্ডিয়ান’। তারা মোদী এবং বিজেপির হয়ে পোস্ট করে।

সুপ্রিম কোর্ট শবরীমালা মন্দিরে সব মহিলার প্রবেশাধিকার দেওয়ার পর দিল্লির বিধায়ক কপিল মিশ্রের টুইটে দেখা যায়, এক আয়াপ্পা ভক্তের বুকে লাথি মারছে পুলিশ, সঙ্গে লেখা ‘‘ভক্তের চোখে হিংস্রতার ভয় নেই, অত্যাচারের ভয় নেই, এটাই বিশ্বাসের জোর।’’ সাংবাদিক ববিনস এব্রাহাম ফাঁস করেন, ছবিটি ফটোশপ করা। আরএসএস কর্মী রাজেশ কুরুপ স্বীকার করেন, কেরল সরকারকে ‘হিন্দুর শত্রু’ প্রমাণের জন্যই এই প্রচার!

লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে ‘ইন্ডিয়া মিসইনফর্মড’ বইয়ে এমনই সব ভুয়ো খবর তুলে দিয়েছেন প্রতীক সিংহ, সুমাইয়া শেখ ও অর্জুন সিদ্ধার্থ। সত্যি খবর খোঁজার পাশাপাশি তাঁরা মিথ্যের প্রবণতাও ব্যাখ্যা করেছেন।

গণতন্ত্রে বহমান তথ্যের স্রোত নাগরিককে সচেতন ও সংবেদনশীল করে। অন্যায় হলে সে রুখে দাঁড়ায়, ভাল কাজ হলে পাশে দাঁড়ায়। সেই তথ্যকেই যদি বিকৃত করা যায়, তা হলে নাগরিক ঠগের কাছেই নিজেকে সমর্পণ করেন, এবং ক্রমে হিংস্র হয়ে ওঠেন। যেমন ঘটলে বিশেষ কোনও গোষ্ঠীর ভাল লাগত, তেমন কিছু না ঘটলেও যদি ‘ঘটেছে-ঘটেছে’ রব ফেলে দেওয়া যায়, তা হলে অন্তত কিছু লোক বিশ্বাস করে বসে, তাদের নিজের দিকে টেনে নেওয়া যায়। পুরো বেসাতিটাই মিথ্যের উপর দাঁড়িয়ে, তাই এ খেলার কোনও নিয়মও নেই। লেগ স্টাম্পের বাইরে বল গেলে ওয়াইড, বা বোলারের পা ক্রিজ় পেরিয়ে গেলে নো বল, এমন আইন নেই। অনেকটা পাড়ার মারপিটের মতো। জিতলেই হল। ফল মারাত্মক। কেবল ভুয়ো খবরের জেরে প্রাণ হারালেন পেহলু খান (আলওয়ার ’১৭), মহম্মদ নইম (জামসেদপুর ’১৭), সুবোধ সিংহ (বুলন্দশহর ’১৮)।

ফেক নিউজ় কী ভাবে ছড়ায়? ভুয়ো খবর প্রায় দেশ জুড়ে জাল বিছিয়ে ফেলেছে, নিরন্তর জনতাকে উত্তেজিত করে চলেছে। এ অবশ্যই সংগঠিত প্রক্রিয়া। ২০১৭ উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা ভোটের সময় ৩২ লক্ষ সদস্যকে নিয়ে কয়েকটা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ বানিয়েছিল বিজেপি। রোজ সকাল আটটায় সেখানে ভেসে উঠত ‘সত্যকে জানুন’। সেগুলো খবরের কাগজেও পৌঁছত, ভাইরালও হত। এক দিন এক বুদ্ধিমান স্বেচ্ছাসেবক খবর ছড়িয়েছিল, অখিলেশ যাদব মুলায়ম সিংহকে চড় মেরেছেন। সম্পূর্ণ মিথ্যে কথা। তাঁরা দু’জন তখন ৬০০ কিলোমিটার দূরে বসে। তবু, খবরটা এমনই ছড়াল যে সকাল দশটায় নাকি ওই মেসেজ পেয়েছিলেন বিজেপি সভাপতিও! ভোটের বাজারে এ ভাবেই তৈরি হয় ‘পারসেপশন’ বা বাতাবরণ— ‘মাহৌল’।

সোশ্যাল মিডিয়ার না-হয় সত্যি-মিথ্যে বিচারের দায় নেই, কিন্তু মিডিয়ার? দুর্ভাগ্য, দেশজোড়া ফাঁদে তারাও অংশীদার হয়ে পড়েছে। এই বাস্তুতন্ত্রের এক দিকে সান্ধ্যকালীন হল্লাকারী মিডিয়া, আর এক দিকে নিশিদিন নীরব মিডিয়া। দুটোই বিপজ্জনক। কেউ ভুয়ো খবর এমন সরবে প্রচার করছে যে দাঙ্গা বাধার উপক্রম, কেউ আবার সব জেনেও ভয়ে চুপ করে বসে আছে। লাভের গুড় খেয়ে যাচ্ছে সেই পিঁপড়েরা, যারা অতি ধুরন্ধর উপায়ে নাগরিক তৎপরতাকে ব্যবহার করে। এই তৎপররা সাধারণত সংখ্যাগুরু। তাঁদের বোঝানো হয়, সমমনস্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। সংখ্যালঘুদের আগেও বাঁকা চোখে দেখা হত, ভুয়ো খবর সে প্রবণতা আরও উস্কে দেয়।

এই প্রবণতা থেকেই আসে, রাহুল গাঁধী সোমনাথ মন্দিরের রেজিস্টারে নিজেকে ‘অ-হিন্দু’ লিখেছেন, মনমোহন সিংহ সনিয়া গাঁধীর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেছেন, হামিদ আনসারি জাতীয় পতাকাকে অসম্মান করেছেন, নেহরু নিজেকে ‘‘সংস্কৃতিতে মুসলমান ও দুর্ঘটনাবশত জন্মগত ভাবে হিন্দু’’ বলেছেন, শেহলা রশিদ কাঠুয়ার গণধর্ষিতার জন্য চাঁদা তুলে নিজের পকেটে পুরেছেন ইত্যাদি। প্রবণতার ধরনটা স্পষ্ট: সাম্প্রদায়িক হিংসা ছড়াও, বিরোধীদের হিন্দু-বিরোধী বানাও, রাহুল গাঁধীকে নিয়ে যা-ইচ্ছে-তাই বলো, মনমোহন সিংহ বা সনিয়া গাঁধী বা জওহরলাল নেহরুকে নিয়ে গল্প বানাও, বিভিন্ন খবর বিকৃত করো, মিথ্যে ইতিহাস আওড়াও। নরেন্দ্র মোদীর ‘ব্র্যান্ড’ গড়ো।

‌শুরুতে, অর্থাৎ ২০১৪-১৫ নাগাদ ভুয়ো খবরে একচেটিয়া অধিকার কায়েম করেছিল বিজেপি। ২০১৮ থেকে তাতে অ-দক্ষিণপন্থীরাও অবদান রাখতে শুরু করেছে। তবে তাদের দিল্লি বহু দূর।

এই মিথ্যে-নির্মাণের লক্ষ্য দ্বিমুখী। রাজনৈতিক প্রচার ও ব্যবসায়িক লাভ। ২০১৬ জুন থেকে ২০১৭ মার্চ পর্যন্ত চড়চড় করে বেড়েছে ইন্টারনেট ব্যবহার। এ দেশে ‘ইন্টারনেট লিটারেসি’ (অনলাইন তথ্য যাচাই করার শিক্ষা) নেই। সুতরাং, রাম বলল মধুর ছেলে কালো, শ্যাম বলল কাকের মতো কালো, এবং যদু রটিয়ে দিল মধুর নাকি কাক হয়েছে! সে ভাবেই এক ব্যক্তির প্রচারে ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লিগের পতাকা হয়ে গেল পাকিস্তানের পতাকা, অসংখ্য ফেসবুক গ্রুপ পেশাদারিত্বের সঙ্গে ভিডিয়ো-ইনফোগ্রাফ করে তা বহু গুণে রং চড়িয়ে তুলল। নাৎসিদের ‘বিগ লাই’ তত্ত্বের মতো— মিথ্যেকে এত বেশি করে বলো, যাতে কেউ বিশ্বাসই না করে যে সত্যকে এত দূর বিকৃত করা যায়। সত্য যাচাইয়ের আগেই যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে যায়।

মোহের রাজনীতি এমনই। দেশের সমস্যা নিয়ে কাজ করলে তাই দেশদ্রোহী হতে হয়, অকাজে হইচই করলে দেশভক্ত। এই রাজনীতি সর্বক্ষণ উত্তেজিত করে রাখে, ঠান্ডা হতে দেয় না, যুদ্ধ-যুদ্ধ মেজাজ। 

তবু, যে জনতার কাছে খবর পৌঁছয় তারাই গণতন্ত্রের শক্তি। মিডিয়ার স্বাধীনতা ও তথ্যের প্রতি দায়ের নিরিখেই সরকারের মূল্যায়ন হয়। জনগণের কাছে যে খবর পৌঁছচ্ছে, তা-ই যদি বদলে দেওয়া হয়, তবে গণতন্ত্রের প্রতি সমর্থন অটুট থাকলেও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলি আর জনগণের থাকে না। যে অগাধ বিশ্বাসে জনতা পুরো ব্যবস্থাকে ধারণ করে আছে, তাতে যদি অবিশ্বাস এ ভাবে বাসা বাঁধে, ব্যবস্থাটাই ভেঙে পড়তে পারে। আজ যেমন সবই বিশ্বাসযোগ্য, সে দিন সবেতেই সন্দেহ হতে পারে। সুব্রহ্মণ্যম স্বামী বলেছিলেন, ‘‘যে ব্যবস্থায় প্রতিক্রিয়া নেওয়ার প্রক্রিয়া নেই, তা সোভিয়েত ইউনিয়নের মতোই ধসে পড়বে।’’ মিথ্যা খবরের পসারিরা ভাবছেন, ‘এমন যদি সত্য হত আহা’! কিন্তু আমাদের ব্যবস্থা অবিশ্বাসের ধাক্কা সামলাতে তৈরি তো?

২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের ফল

আপনার মত