এই বছরের গোড়ার দিকে সর্বভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসে অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জি নাগেশ্বর রাও মন্তব্য করেন যে স্টেমসেল পদ্ধতিতে মহাভারতের কৌরবদের জন্ম হয়েছিল। আর রামায়ণের রাবণের ২৪ ধরনের এরোপ্লেন ছিল। প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে তিনি বলেন, রামায়ণ, মহাভারত কোনও মহাকাব্য নয়, ইতিহাস। এই ক’বছরের মধ্যে এই রকম শিহরন জাগানো মন্তব্যের উদাহরণ অনেক। আমাদের এই সময়ের ভারতবর্ষ এই রকম ভাবেই বেঁচে আছে। 

সাম্প্রতিক পশ্চিমবঙ্গও এই পরিবর্তনের বাইরে নয়। টিভির দৌরাত্ম্যে বাঙালির ঘরে আজ ঢুকে পড়েছে তাবিজ-কবচ, লক্ষণ-অলক্ষণ, ঠিকুজি, এমনকি বশীকরণ, মারণ-উচাটন, যত রকম অবৈজ্ঞানিক ও অপবৈজ্ঞানিক ভাবনা আছে, সব। সবচেয়ে ভয়াবহ হল এই সব কালো জাদুকে কখনও ধর্ম, আবার কখনও বিজ্ঞান বলে চালানো হচ্ছে। কেবল যে চ্যানেলে চ্যানেলে বিজ্ঞাপনের কারণে এই সব প্রচারিত হয়, তা-ই নয়। প্রতিটি সিরিয়ালে গল্পের ভাঁজে ভাঁজে গুঁজে দেওয়া হয় যাবতীয় কুসংস্কার। 

অথচ বেশি দিন আগে নয়, আশি আর নব্বই দশকের ছবিটাই কত অন্য রকম ছিল। এই সময় গাঁ গঞ্জে মফস্সলে অন্য এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতাম— সেই অভিজ্ঞতার নাম বিজ্ঞান ক্লাব। প্রায় সব ছোট ছোট গ্রাম্য মেলায় আর হাটে দেখেছি কুসংস্কার বিরোধী প্রচার। দেখেছি, চেনা ঘটনার মধ্যে লুকিয়ে থাকা বিজ্ঞানের সূত্র বুঝিয়ে দিচ্ছে অল্পবয়সি ছেলেমেয়েরা অনাড়ম্বর বিজ্ঞান প্রদর্শনীতে। খুব উৎসাহ দেখেছি প্রকৃতি পর্যবেক্ষণে। এই সব আয়োজনের পিছনে থাকত বিজ্ঞান ক্লাব। এলাকার কোনও মাস্টারমশাই বা অন্য কেউ থাকলেও, আসল উৎসাহের রাশ থাকত কিশোরকিশোরীদের হাতে। আর তাই অভিভাবকদেরও যোগ না দিয়ে উপায় থাকত না। কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আর কার্যকারণ সম্পর্কের অনুসন্ধানের কাজটা শুরু হত বাড়ির ভিতর থেকে, ছেলেমেয়েদের হাত ধরে।

‘সায়েন্স কমিউনিকেটরস ফোরাম’-এর অভিজিৎ বর্ধনের সঙ্গে কথা হচ্ছিল বিজ্ঞান ক্লাবের ভূমিকা নিয়ে। এখনকার এই প্রতিনিয়ত অযৌক্তিক বিশ্বাসের প্রচার যে মানুষকে দৈবনির্ভর করে তুলছে, বললেন তিনিও। ১৯৮৫ সাল থেকে তাঁর সংগঠন সাধারণ মানুষের মধ্যে বৈজ্ঞানিক চেতনা প্রসারে কাজ করছে। এ ছাড়া বিদ্যালয় স্তরে সৃজনশীল  বিজ্ঞান শিক্ষা ও এনসিএফ (ন্যাশনাল কারিকুলাম ফ্রেমওয়ার্ক)-এর নির্দেশ মেনে অল্প খরচে সহজ হাতেকলমে বিজ্ঞান চর্চার প্রসারেও কাজ করেন। 

গোটা ভারতবর্ষে ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনার পর জাঠা বেরিয়েছিল। সেই জাঠার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা প্রসারের কাজকে প্রাধান্য দেওয়া শুরু হয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে সত্তর দশকের শেষার্ধে অতি বাম আন্দোলনের হাত ধরেই মানুষের মধ্যে বৈজ্ঞানিক চেতনার উন্মেষ ও অলৌকিক ঘটনার বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা (যেমন আগুন গিলে ফেলা, ইত্যাদি) দেওয়ার কাজটি শুরু হয়ে গিয়েছিল। সেই সময় ক্রমে ক্রমে কমপক্ষে ৪০০টি সংগঠন স্বেচ্ছায় কাজটির সঙ্গে জড়িত হয়। অনেক বিজ্ঞানবিষয়ক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। মফস্সল থেকে প্রকাশিত হত বাংলা ভাষায় অনেকগুলি বিজ্ঞান পত্রিকা, যা কেবল যুক্তিবাদী চিন্তার প্রসারেই কাজ করত না। দেশবিদেশের নানা আবিষ্কার বা নতুন ভাবনার সঙ্গেও পরিচয় করিয়ে দিত। ১৯৪৮ সালে সত্যেন্দ্রনাথ বসু ‘বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ’ স্থাপন করেছিলেন মূলত বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার উদ্দেশ্যে। সেই শুরু। তার পর থেকে তা কখনও থেমে থাকেনি, বিজ্ঞান তার গুরুগম্ভীর দুর্বোধ্যতার পোশাকের অন্তরাল থেকে একেবারে গৃহস্থের মাটির উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছে। জনপরিসরে যে একটা আন্দোলনের রূপ পরিগ্রহ করেছে, সেটা এই সময় থেকেই শুরু হয়েছে।

এর পর বামফ্রন্ট আমলে খানিকটা রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে বিজ্ঞান আন্দোলনকে দেখা শুরু হল। কিন্তু আর পাঁচটা গণসংগঠনের মতো, এখানেও কলেবর বৃদ্ধি আর দখলদারি মানসিকতার ছায়া পড়ল। ১৯৮৬ সালে তৈরি হ়ল ‘পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ’, মূলত বামফ্রন্ট সমর্থকদের প্রয়াসে। সেই সময় বামপন্থীদের সাংগঠনিক ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে একেবারে পঞ্চায়েত স্তর পর্যন্ত বিজ্ঞান মঞ্চের গঠনতন্ত্র প্রসারিত হয়েছিল। খাতায় কলমে এখনও সেটা আছে, কিন্তু বলা বাহুল্য, বামফ্রন্ট ক্ষমতা হারানোর পর অন্যান্য গণ সংগঠনের মতোই সেই উৎসাহ কমতে কমতে নিবে যেতে বসেছে। কিন্তু শূন্যস্থান তো শূন্য থাকতে পারে না; তাই সেই জায়গা ভরাট করতে এসে গিয়েছে নানা রকম কালো জাদু, মৌলবাদী ধর্মীয় সংগঠনের অযৌক্তিক বিশ্বাস। আর অগ্নিতে ঘৃতাহুতি দিয়ে চলেছে বৈদ্যুতিন গণমাধ্যম। 

‘পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ’-এর প্রদীপ মহাপাত্র স্কুল-কলেজের বিজ্ঞান শিক্ষার মানের অবনমনের কথা বলতে গিয়ে বললেন, হাতেকলমে না হলে বিজ্ঞান কখনওই শেখা যায় না। সেই যথোপযুক্ত পরীক্ষার কোনও সুযোগই ছাত্ররা পায় না। একই সুর অভিজিৎবাবুর গলায়। পাঠ্যপুস্তকের ধরন, পড়ানো আর পরীক্ষার পদ্ধতি ত্রুটিপূর্ণ বলেই ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষায় গলদ তো থাকছেই, সেই সঙ্গে আগ্রহ আর অনুসন্ধিৎসা জাগানোও সম্ভব হচ্ছে না। 

এই সংগঠনগুলি প্রকল্পভিত্তিক কাজ করে। এখন এই খাতে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় স্তরে বরাদ্দ এতই কমে গিয়েছে যে প্রকল্প প্রায় বন্ধ। তবে এই সিদ্ধান্তের পিছনে যতখানি অর্থাভাব, তার চেয়ে বেশি রাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থান। ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে কালবুর্গি, দাভোলকর, গোবিন্দ পানেসার খুন হয়েছেন শুধুমাত্র কুসংস্কার আর ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে কথা বলার অপরাধে। এঁরা কেউ ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত করেননি। দাভোলকরের হত্যার পর মহারাষ্ট্র ‘দাভোলকর অ্যান্টি-ব্ল্যাক ম্যাজিক অ্যাক্ট’ পাশ করে কুসংস্কারবিরোধী আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চও এখন আইন পাশ করানোর সক্রিয় উদ্যোগ করেছে। 

এ যেন বিজ্ঞানের সঙ্গে অবিজ্ঞানের একটা যুদ্ধের সূচনা। ইতিহাসে এমন যুদ্ধ নতুন নয়। কিন্তু লড়াইটা লড়ে জেতার মানসিকতাতেই আসল জয় লুকিয়ে থাকে।