পৃথিবীর ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, এক জাতি অন্যদের পদদলিত করেছে। একদল জয়ী হয়েছে আর অন্যদল হয়েছে পরাজিত। একের সংস্কৃতি অন্যের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে মিশ্র জাতি গঠনের চেষ্টা করেছে। প্রাচীন ভারত তার সহনশীলতার পরিচয়ও দিয়েছে। দীর্ঘদিনের গ্রহণ-বর্জনের মধ্য দিয়ে এই দেশ ভারতবর্ষ থেকে ভারত হয়ে উঠেছে। 

সেই সময় থেকে যারা সহনশীলতার পরিচয় দিয়েছিল, তারা মূলত রক্তচক্ষু এবং অস্ত্রের ঝনঝনানির সামনে মাথা নিচু করে সব মেনে নিয়েছিল। শুধু ইতিহাস বা দেশভাগের উপন্যাসই নয়, অভিজিৎ সেনের ‘রহু চণ্ডালের হাড়’-এর মধ্যে, সেই বিজিত জনজাতির দেশান্তরী হওয়ার মধ্যেও লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত সহনশীলতার গল্প। উপন্যাসের মধ্যে সেই সহনশীলতাকে অতিক্রম করার নানা চিহ্ন ছড়িয়ে রয়েছে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দেশভাগ আর উদ্বাস্তু সমস্যা ছাড়াও মানুষের সহ্যশক্তি উপলব্ধি করার মতো কলম কম ছিল না। কিন্তু সত্যকে প্রকাশ করার মতো সাহস কম থাকার কারণেই উজ্জ্বল ছবি ক্রমশ নিষ্প্রভ হয়েছে। জ্ঞানবিন্দু আর কর্মবিন্দু কখনই একমুখী হয়নি। সময়ের জটিলতায় পারিবারিক, সামাজিক, ধর্মীয় সহ্যশক্তি নিম্নমুখী হয়েছে। 

পিতৃতান্ত্রিক অথবা মাতৃতান্ত্রিক সমাজে অনুশাসন মেনে চলাই ছিল রীতি। উভয় ক্ষেত্রে স্নেহমিশ্রিত শাসন অবশ্যই ছিল, কিন্তু অবাধ্যতার শাস্তি ছিল না। তা সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য হয়তো প্রয়োজনীয়ও ছিল। তবে তা বলে ‘মনুসংহিতা’র মতো ভয়ঙ্কর ছিল না। মূলত প্রণয়জনিত কারণে অথবা ক্ষমতালাভের আকাঙ্ক্ষায় মানুষ অনুশাসনের গণ্ডি অতিক্রম করার চেষ্টা করেছে। সমাজের ভাঙা-গড়াকে মানবকল্যাণের কারণে অনেকেই মেনে নিয়েছে। সময়ের অন্তর যত দীর্ঘ হয়েছে, ততই পুরুষতান্ত্রিক ভাবনার ঔদ্ধত্যে নারীকে অনেক বেশি সহ্যশক্তির পরিচয় দিতে হয়েছে। পরিবারের উপার্জনশীল কর্তা এখনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার শেষ কথা। সমাজে মোড়ল, জমিদার, রাজা, নবাব সবাই একই রকম ভাবে আধিপত্যবাদকে বজায় রাখার চেষ্টায় অত্যাচারের সীমাবৃদ্ধি করেছে। আর সাধারণ মানুষ তার ব্যক্তিক সহ্য করার ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। দু’চারজন প্রতিবাদী বিভিন্ন সময় শহিদ হয়েছেন। তবে তা সহ্যক্ষমতা কম হওয়ার জন্য নয়, অন্যায়ের প্রতিবাদ করাতেই সেই মৃত্যুবরণ। 

আজ, ১৬ নভেম্বর আন্তর্জাতিক সহিষ্ণুতা দিবস। গোটা বিশ্বে এই দিনটি নানাভাবে পালিত হয়ে থাকে। এই পালন করার যে ভিত্তিভূমি, তার মধ্যে অন্যতম হল শিশু,  কিশোর এবং যুবসমাজের মধ্যে সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক সহিষ্ণুতা বৃদ্ধি করা। ইউনেস্কো ঘোষিত এই দিনটি ১৯৯৫ থেকে পালিত হয়ে আসছে। ১৯৯৬ থেকে অহিংসার উপর দু’বছর অন্তর ‘ইউনেস্কো-মদনজিৎ সিংহ’ পুরস্কার দেওয়া হয়। 

বিশ্বের নানা দেশে সহিষ্ণুতা জনিত নানান সমস্যা রয়েছে। সাদা চামড়ার মানুষের কাছে কালো চামড়ার মানুষের গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন, বর্ণবিদ্বেষের গন্ধ নানা প্রান্তেই ছড়িয়ে রয়েছে। আবার ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রগতির জন্য অন্তরায় হয়ে রয়েছে। উদার মানসিকতা না থাকলে আধুনিক সভ্যতা গড়ে উঠতে পারে না। ‘আমি’র সত্তার গভীরে ‘আমরা’ উপলদ্ধি করাটাই উন্নত সংস্কৃতির লক্ষণ। এই উপমহাদেশে, যেখানে গৌতম বুদ্ধ, মোহনদাস কর্মচন্দ গাঁধীর মতো অহিংসার পূজারিরা জন্মগ্রহণ করেছেন, সে দেশের জনসাধারণের সহিষ্ণুতা নিয়ে কোনও প্রশ্ন ওঠার কথা ছিল না। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে তখন, যখন সহিষ্ণুতার মাত্রা বজায় থাকে না, আদর্শ ভূলুন্ঠিত হয়। মানুষ যত অসহিষ্ণু হবে, ততই অশান্তি ও হিংসা তীব্র হয়ে ছড়িয়ে পড়বে। পাড়ার বন্ধু বা সহপাঠীর পারস্পরিক সম্পর্কে 

যদি সহনশীলতা না থাকে, তা হলে সংঘর্ষ তো অনিবার্যই।

শিশুশিক্ষার প্রাথমিক স্তরেই উচিত সহনশীলতার শিক্ষার প্রতি পড়ুয়াকে মনোযোগী করে তোলা। শিশু যদি ঠিক শিক্ষা লাভ করে, তা হলে আগামী বিশ্ব আরও সুন্দর হয়ে উঠবে। তখন আর আলাদা করে সহিষ্ণুতার জন্য সেমিনার করার প্রয়োজন হবে না। বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য ভারতের ঐতিহ্যগত সংস্কৃতি এবং তা সহনশীলতার উপর দাঁড়িয়ে। কলিঙ্গ যুদ্ধের পর চণ্ডাশোক, ধর্মাশোকে পরিণত হয়ে পশুহত্যা নিষিদ্ধ করা এবং মানুষকে ভালবাসার কথা প্রচার করেছিলেন। এই উপলব্ধি উন্নত মনুষ্যত্বেরই পরিচয়। 

আধুনিক বিশ্বে জনগণের হাতের সেলফোন, বাড়ির কেব্‌ল টিভি এবং উন্নত প্রযুক্তির নানা গৃহসামগ্রী অনেক সময় ভাবাতে শুরু করে যে, সব কিছুই বোধ বয় সুইচ টিপে দ্রুত বদলে ফেলা যাবে! ভিডিও গেমের মতোই গুলি করা যাবে বা রেসিং কার চালানো যাবে আর মানুষেরও পরিবর্তন হয়ে যাবে! আসলে, মানুষের মনের খবর আমরা সে ভাবে রাখি না। প্রযুক্তির অগ্রগতি যতটা হয়েছে, মনের সহনশীলতা কি ততটা বেড়েছে? না কি সহনশীলতার মাত্রা ক্রমশ কমছে?  শুধু ভারতই নয়, গত কয়েকবছরে এই উপমহাদেশ তথা পৃথিবীতে এমন বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে, যা থেকে প্রমাণ হয় যে, উষ্ণায়নের মতোই আমরা অসহিষ্ণু হয়ে পড়ছি। 

তাই সহিষ্ণুতা দিবসে আমাদের উচিত বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাওয়ার লক্ষ্যে বিবিধের মিলনকে দৃঢ় করা। আজকের সময়ে আর তৃণের চেয়েও সহিষ্ণু যদি নাও হতে পারা যায়, তবুও আমাদের উচিত সহনশীলতার বার্তা, ভালবাসার বার্তা, বন্ধুত্বের বার্তা পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছে দেওয়া।

(লেখক গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার শিক্ষক। মতামত ব্যক্তিগত)