গ্রেটা থুনবার্গ। একটা ছোট্ট মেয়ে নাড়িয়ে দিয়েছে গোটা বিশ্বকে। বড়দের নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। যেটা বড়দেরই করার কথা ছিল। 

গ্রেটা শিখিয়েছে, পরিবেশ ভাবনাকে কোন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু আমরা বড়রা কতটা সেই ভাবনাকে গ্রহণ করতে পেরেছি? প্রশ্নটার উত্তর খুঁজতে সকাল সকাল বাজারে গিয়েছিলাম। কেন ক্যারিব্যাগে মাছ দেবেন না তা নিয়ে ‘অশিক্ষিত’ এক মাছ বিক্রেতার সঙ্গে এক শিক্ষককে কার্যত তর্ক জুড়ে দিতে দেখেছিলাম কৃষ্ণনগরের পাত্রবাজারে। 

অর্থাৎ, আমরা পারিনি। গ্রেটা থুনবার্গ নামের ছোট মেয়েটা আমাদের ভিতরে সেই চেতনা জাগ্রত করতে পারেনি। যে চেতনা আমাদের পরিবেশ ভাবনার পাঠ দেবে। আমাদের বলবে নিজের ছোট্ট ছোট্ট অসুবিধাকে স্বীকার করে নিতে আগামী প্রজন্মের জন্য। যে চেতনা আমাদের সন্তানদের জন্য রেখে যাবে একটা সুন্দর পৃথিবী। যেখানে তারা  বুক ভরে নিঃশ্বাস নেবে। সেই পৃথিবী কি আমরা রেখে যেতে পারি না যেখানে মানব সভ্যতা ধ্বংসের মুখোমুখি নয়, বরং আরও অনেক অনেক বছর নিরাপদে থাকবে? নিরাপদে থাকবে আমাদের সন্তান? এটা করতে গেলে চাই সার্বিক সচেতনতা। কারণ, আমরা নিজের অজান্তে এমন কিছু বিষয়ের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িয়ে গিয়েছি, এমন কিছু অভ্যাসের দাসত্ব করতে শুরু করেছি যেখান থেকে নিজেদের টেনে বের করতে না পারলে কোনও আইন, কোনও রাষ্ট্রকাঠামো আমাদের মুক্ত করতে পারবে না। 

এর জন্য প্রয়োজন মূল্যবোধ। আর সেই মূল্যবোধ কোনও আইন প্রয়োগ করে তৈরি করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন শিক্ষার। যে শিক্ষা আসে অন্তরের গভীর থেকে। যে শিক্ষা ছোট্ট গ্রেটা থুনবার্গকে রাস্তায় নামিয়ে এনেছিল প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধের দাবিতে, সেই শিক্ষার প্রয়োজন। সকলেই হয়তো রাস্তায় নামতে পারবেন না। কিন্তু তারা তো ছোট ছোট অসুবিধাকে স্বীকার করে নিয়ে নিজে ক্যারিব্যাগ ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। 

না, আমরা সেটাও করব না। আমরা কোনও অসুবিধা স্বীকার করব না। আর সেটা করব না বলেই আমরা মাছের বাজারে গিয়ে ক্যারিব্যাগের জন্য ঝগড়া করব। আমরা অনায়াসে বলতে দিতে পারব, ‘আমায় বারণ করার আগে প্লাস্টিকের কারখানা আগে বন্ধ করুন।’ আমরা বুঝব না যে, আমাদের একটু একটু করে ব্যবহার করা প্লাস্টিক, ক্যারিব্যাগ কী ভাবে গোটা পৃথিবীকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। যে পৃথিবীর বাসিন্দা আগামী প্রজন্ম। আমারই সন্তান। পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেওয়ার আগে আমরা একবারও নিজের কাছে প্রশ্ন করব না— “এ কোন পৃথিবী রেখে যাচ্ছি আমারই সন্তানের জন্য?” 

নিজের কাছে এই প্রশ্নটা করার জন্য যে ভাবনার পরিসরের প্রয়োজন, সেটা আমাদের নেই। আমরা ভাবা ‘প্রাকটিস’ করাই ভুলে গিয়েছি। তাই তো এখনও কৃষ্ণনগর শহরের হাজার নজরদারি এড়িয়ে, হাজার প্রচারের পরেও মাছের বাজারে নাইলনের থলির ভিতর থেকে সন্তর্পণে প্লাস্টিকের ক্যারিব্যাগ বের করতে দেখা যায় কোনও ‘সচেতন’ সহ-নাগরিককে। কিছু বলতে গেলে তাঁদের সেই একটাই যুক্তি, সরকারকে বলুন প্লাস্টিকের কারখানাগুলোকে বন্ধ করতে। কেন আমরা বুঝব না যে একটা সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপরে আমার সন্তানের, আগামী প্রজন্মের বাঁচা-মরা নির্ভর করতে পারে না। সেটা তো আমাদেরকেই সুনিশ্চিত করতে হবে। হয় গ্রেটার মতো আমরা রাস্তায় নেমে সরকারকে বাধ্য করব পরিবেশ নিয়ে ভাবতে অথবা নিজেরা প্লাস্টিক ব্যবহার করব না। 

এটার জন্য প্রয়োজন সার্বিক সচেতনতা। সেটা না হওয়া পর্যন্ত চলবে প্লাস্টিকের ব্যবহার। কিন্তু এটাও প্রশ্ন, নাগরিক সমাজের ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপরে প্লাস্টিকের ব্যবহার কতটুকু নির্ভর করছে? প্রতি দিন একটা শহরে যে বিশাল পরিমাণ প্লাস্টিক ব্যবহার হয়, তার মধ্যে ক্যারিব্যাগ, চায়ের কাপ, প্লাস্টিকের পাত্র ঠিক কতটা? বাকি যে বিরাট অংশ? বিস্কুটের প্যাকেট, চানাচুরের প্যাকেট, তেলের প্যাকেট, চাল, ডাল, আটা, চিপস কিংবা জলের বোতল? সেটা তো শুধু নাগরিক সমাজের ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপরে নির্ভর করে না। বরং তাকে বাধ্য করা হয় প্লাস্টিক ব্যবহার করতে। 

আর এখানে উঠে আসছে সেই অমোঘ প্রশ্নটি। পুরসভা, নাগরিক সমাজ চাইলেও কি একটা শহরকে পুরোপুরি প্লাস্টিকমুক্ত করা সম্ভব? আমরা যেটা পারি সেটা হল যতটা সম্ভব প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে আনতে পারি। তা হলে উপায়? এই প্রশ্নটার সামনে যেন অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছে গোটা মানবসভ্যতা। একদিকে আমাদের জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িয়ে যাওয়া প্লাস্টিকের ব্যবহার থেকে নিজেদের পুরোপুরি মুক্ত করতে না পারা। অন্য দিকে, সেই প্লাস্টিকই দ্রুত আমাদের সাধের পৃথিবীকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। 

সমস্যাটা এত গভীর ভাবে আমাদের উপরে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে যে, দেশের প্রধানমন্ত্রীকেও সমুদ্র সৈকতে নেমে প্লাস্টিক কুড়িয়ে দেশবাসীকে দেখাতে হচ্ছে।

এ সবই হচ্ছে। কিন্তু পৃথিবীকে প্লাস্টিক শূন্য করার উপায় বের করা যাচ্ছে না। এই সমস্যার সমাধান করতে অনেক দেশেই প্লাস্টিকের বিকল্প ব্যবহারের কথা ভাবতে শুরু করা হয়েছে। অনেক দেশই রাস্তা তৈরির কাজে প্লাস্টিক ব্যবহার করতে শুরু করেছে। কোথাও কোথাও প্লাস্টিকের বোতল ব্যবহার করে নির্মাণ কাজ করা হচ্ছে। তাই মানুষকে সচেতন করা, আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি, প্লাস্টিকের বিকল্প ব্যবহার করার সময়ও মনে হয় এসে গিয়েছে। যত দিন না সামগ্রিক ভাবে প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধ করতে পারছি, আগামীর পৃথিবীকে বাসযোগ্য করা অসম্ভব।