দখলদার রাষ্ট্র, সমাজহীন সমাজ-এর কথা লিখেছেন অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়; তুলে ধরেছেন সহমর্মিতা ও মানবিকতার অভাব (আনন্দবাজার, ১৩-৮)। এই বিপর্যয়ের মূলে খণ্ডিত সমাজের ভোগবাদী আত্মকেন্দ্রিকতা। তারও মূলে কিন্তু আরও গভীর এক দৈন্য, যেটা বৌদ্ধিক— হৃদয় নয়, মগজের বিকার।

এ ব্যাপারে সচ্ছল শিক্ষিত শ্রেণির একটা বিশেষ দায় আছে। শিক্ষার ফলে নৈতিক উন্নতি হোক না হোক, কাণ্ডজ্ঞান বাড়বে, যুক্তি চিন্তা তথ্যনিষ্ঠার প্রসার ঘটবে, এটুকু আশা করা অন্যায় নয়। এখানেই বঙ্গভূমি তথা ভারতের শিক্ষিত ‘সচেতন’ শ্রেণির ব্যর্থতা। সামাজিক অঙ্কের একটা বিরাট ভুল আমরা করেই চলেছি— শুধু যোগের নয়, পদ্ধতির ভুল।

সমস্যাটা চির কালের, আধুনিকতার আলোয় হেরফের ঘটেনি সেটাই মর্মান্তিক। স্বাধীনতার আগে-পরে যা-ই আমরা পেয়েছি, সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে বরাবর অপারগ থেকেছি। শিক্ষা-স্বাস্থ্যের আশীর্বাদ, উন্নতির সুযোগ, বিত্ত ও সম্মান কুক্ষিগত করেছি এই ভেবে, অন্যেরা না পেলেই আমাদের লাভ। আজও দেশের অন্তত কুড়ি শতাংশ ও যুবসমাজের দশ শতাংশ নিরক্ষর। এক-তৃতীয়াংশ শিশুর বৃদ্ধিতে ও ওজনে ঘাটতি, অর্ধেকের উপর রক্তাল্পতায় ভোগে। চিকিৎসার খরচ মেটাতে সর্বস্বান্ত বহু লক্ষ পরিবার। 

এটা অবশ্যই একের পর এক সরকারের ধারাবাহিক ব্যর্থতা; কিন্তু তার জন্য আমরা কখনও তাদের চেপে ধরিনি। ভাবিনি, যে কল্পবৃক্ষের মগডালে সন্তানকে চড়াতে ব্যাকুল, তার বাড়বাড়ন্তের জন্য চাই তামাম দেশবাসীর মেধা ও প্রশিক্ষিত শ্রম, অতএব চাই সমদর্শী শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা। চিকিৎসার জন্য বাহাত্তর বছর আগে মধ্যবিত্ত যেত সরকারি হাসপাতালে, গরিবরা কোথাও না। আজ মধ্যবিত্ত যায় মহার্ঘ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে, গরিবরা সরকারিতে, অতএব তার গুণমান নিয়ে সম্পন্ন শ্রেণির মাথাব্যথা নেই। স্কুলব্যবস্থার সার্বিক উন্নতির বদলে শর্টকাট রাস্তায় শিক্ষার অধিকার আইনে কিছু গরিবের সন্তানকে বেসরকারি স্কুলে পাঠানো হচ্ছে। চিকিৎসার জন্য তৈরি হয়েছে আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প, যার সিকিভাগ বরাদ্দ খেয়ে নেবে বেসরকারি হাসপাতাল ও বিমা সংস্থার মুনাফা। শিক্ষক নিয়োগ ঘিরে চলে ব্যাপক বিভ্রাট, কয়েক দশকের সাধনায় বাংলায় আজ যা তুঙ্গে। দেশে ডাক্তার আছে প্রয়োজনের দুই-তৃতীয়াংশ, অধিকাংশই শহরাঞ্চলে। শিক্ষা বা চিকিৎসাক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ ও নিয়োগের কথা ভাবা হয়েছে ‘আমাদের’ কর্মসংস্থানের বিচারে, ‘ওদের’ শিক্ষা বা আরোগ্যের তাগিদে নয়। অবশেষে যখন জনপরিষেবা বাড়াতেই হয়েছে, চাপে পড়ে বা ভোটের আশায় (যেমন আজকের বাংলায়) অবধারিত ভাবে তা হয়েছে অপটু, আধাখেঁচড়া, প্রচারমুখী। বাংলার কর্মসূচিতে তবু আন্তরিকতার ও দায়বদ্ধতার আভাস আছে, বহু রাজ্যে তাও নেই।

১৯৮০-তে ভারত ও চিনের আর্থিক অবস্থা ছিল কাছাকাছি। আজ চিনের অর্থনীতি ভারতের আড়াই-তিন গুণ। এই ব্যবধানের বৃহত্তম কারণ, নানা ঘাটতি ও অনাচার সত্ত্বেও চিন তার পুরো কর্মিবাহিনীর ন্যূনতম শিক্ষা ও স্বাস্থ্যরক্ষা নিশ্চিত করেছে, আমরা করিনি। চিন যে জনসংখ্যাজনিত সুবিধা (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) ভোগ করেছে, ভারত তা করবে আগামী কিছু বছর। সেই জনসম্ভার সুস্থ ও শিক্ষিত না হলে কর্মিবাহিনী হবে বেকারবাহিনী। তখন আমরা ‘ওদের’ দুষব; বলব, ওদের জন্মানোই অপরাধ, আমাদের মসৃণ জীবন তছনছ করে দিচ্ছে।

এই পরিণতির অশনি সঙ্কেত দেখা যাচ্ছে কি? অর্থনীতি যে অধোমুখী, তা সরকারের অনুগত সেবকরাও কবুল করছেন। সংখ্যার হিসেব যাই বলুক, কার্যকর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ক্ষেত্র সঙ্কুচিত হচ্ছে। যুবসমাজের একটা বড় অংশ প্রায় পাকা ভাবে অর্ধবেকারত্বে ডুবে গিয়েছে। তাতে কী, বৃদ্ধির হারে আমরা বিশ্বশ্রেষ্ঠ, তাতেই ‘আমাদের’ তৃপ্তি ও প্রাপ্তি; কর্মসংস্থানের তাল না মিললে ‘ওদের’ লোকসান।

কোন পক্ষ, কোন সরকার এই অবস্থার জন্য কতটা দায়ী, সে বিতর্ক নিষ্ফল; দায়ী আমরা সকলে। আমরাই ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন— নির্বাচনের পর নির্বাচনে সব দানব আমাদের সৃষ্ট, তার পর আমাদেরই তাড়া করে। যে পরিণতির দিকে এগোচ্ছি তা অবচেতনে আঁচ করলেও হৃদয়ঙ্গম করিনি। নীতি পাল্টালেও শ্রেণিলব্ধ দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাইনি, গত বদলে একই গান গেয়ে গিয়েছি। দুর্দিনেও কি মতি ফিরেছে? বরং নকল গড় রক্ষার জন্য ডুবেছি নতুন নির্দয় আত্মবঞ্চনায়।

চিনের প্রসঙ্গে ফিরে যাই। তার সাম্প্রতিক ইতিহাসে শিক্ষা-স্বাস্থ্যের উন্নতি যেমন সত্যি, তেমন সত্যি তার রাষ্ট্রিক দমননীতি, মুক্ত চিন্তা ও বাক্‌স্বাধীনতা রোধ, নাগরিক সত্তার সঙ্কোচন। দক্ষ পরিচালনা ও অনুশীলনের দরুন কিছু দিকে যেমন তাক-লাগানো বিকাশ ঘটেছে, মুক্ত ক্রিয়াশীলতার অভাবে অন্য কিছু দিক রয়ে গিয়েছে অন্ধকারে। প্রগতির এমন ধারা এমনিতেই ভারতের গণতান্ত্রিক প্রচলনের বিপরীত। অথচ প্রচলিত ব্যবস্থায় বীতশ্রদ্ধ হয়ে আমরা ইদানীং গলা ফাটাচ্ছি, নতুন যুগ আনতে চাই অতিশাসন, দমনপীড়ন, অসহিষ্ণুতা, কণ্ঠরোধ।

ধারণাটা যে ভুল, বিদ্বেষ-দমন-হিংসার সঙ্গে কর্মযজ্ঞ ও সৃষ্টির যে মৌলিক বিরোধ, এটা বুঝতে বেশি বুদ্ধি লাগে না। চাষবাস, পণ্য উৎপাদন, চিকিৎসা লেখাপড়া গবেষণা কোনওটাই লাঠি দিয়ে হয় না, সূক্ষ্মতর উপাদান লাগে। বুদ্ধি কাজ না করলে তখনই পেশির দিকে দৃষ্টি যায়, লাঠি তুলে নিতে হয়।

অথচ নিজের ঘাড়ে লাঠি পড়ুক কেউ চায় না। লাঠ্যৌষধি প্রয়োগের জন্য তাই দরকার ‘ওদের’ দল। কিছু দিন ধরে একে একে অনেক গোষ্ঠীকে ‘ওরা’ বলে দেগে দেওয়া হয়েছে: ভিন্নধর্মী, ভিন্নপন্থী, ভিন্নমত, ভিন্নজাতি। কখনও-কখনও ‘ওরা’ দেশময় ছড়িয়ে, কখনও আবদ্ধ একটা বিশেষ অঞ্চলে। দ্বিতীয় অবস্থানটা সুবিধাজনক— নাগাল পাওয়া সহজ, বাকিদের চোখেও পড়ে কম। এই মুহূর্তে দেশের এক প্রান্তে কয়েক লক্ষ মানুষ বিনিদ্র প্রহর গুনছে, দুই সপ্তাহ বাদে ভিটেমাটি থেকে উৎখাত হওয়ার আতঙ্কে। অপর প্রান্তে আরও বেশি মানুষ নিজভূমে পরবাসী— গৃহবন্দি, কর্মহীন, বাক্‌রুদ্ধ।

নিজেরা এ অবস্থায় পড়লে শিউরে উঠতাম। কিন্তু আমরা তো পড়িনি, পড়েছে ‘ওরা’। এমন সঙ্কট ‘ওদের’ পক্ষে স্বাভাবিক ও ন্যায্য। ওরা তো আমাদের মতো নয়, আমাদের স্বার্থ ওদের বিপরীত। ওরা ঠান্ডা না হলে আমাদের হাড় জুড়োয় না, ওদের সর্বনাশেই আমাদের মঙ্গল— এমন মনোভাব বুদ্ধিভ্রংশের চূড়ান্ত প্রকাশ। যুক্তি-বাস্তব বিসর্জন দিয়ে একটা স্থির অবচেতন বিশ্বাস যে ‘ওদের’ যা হচ্ছে, ‘আমাদের’ কোনও দিন হবে না। এই বিশ্বাস আমাদের শিক্ষিত উচ্চবর্গীয় সমাজের একটা বড় অংশকে আচ্ছন্ন করেছে। শিক্ষিত বলেই, উচ্চবর্গীয় বলেই, শ্রেণিলব্ধ আত্মপ্রত্যয়ে মশগুল বলেই। এক বারও মনে হচ্ছে না, স্বৈরাচারের মাত্রা নেই। যে প্রভুগোষ্ঠী এত অঘটন ঘটাতে পারে তারা সব পারে— আইন বা যুক্তি দূরে থাক, প্রত্যাশা, প্রচলন, শ্রেণিসত্তা বা মামার জোর, কোনও কিছুতেই ভরসা রাখা বাতুলতা।

পশ্চিমবঙ্গবাসীদের বিপদ যথেষ্ট বেশি। রাজ্যটা সীমান্তবর্তী; নানা সম্প্রদায়ের মানুষ এখানে সহাবস্থান করে; সর্বোপরি আজ এটা জাতীয় রাজনীতির মহারণক্ষেত্র। এখানে খাঁটি আগমার্কা ‘আমরা’ বলে কিছু নেই, যে কেউ যে কোনও সময় কোনও-না-কোনও গোষ্ঠীর চোখে ‘ওরা’ সাব্যস্ত হতে পারি। হতে পারি স্রেফ শাসকের ভুলে বা গাফিলতিতে, যেমন হচ্ছেন অসমের প্রচুর হতভাগ্য মানুষ; বা দুর্নীতিগ্রস্ত রাজপুরুষের চাহিদা মেটাতে, যেমন ১৯৭৫-এর জরুরি অবস্থায়। এমন অবস্থা কি সত্যি অকল্পনীয়, যেখানে আমাদের থাকতে হবে ঘরে ও মুখে কুলুপ এঁটে, প্রশাসনের সঙ্গে যে কোনও সাক্ষাতে বুক কাঁপবে, চৌকাঠের ও-পারের জগৎটা হবে ভীতি আর সন্দেহের স্থল? অনেকে তো বলবেন এখনই তাঁদের এমন দশা। তবে একটা তফাত যেন খেয়াল থাকে— ভবিষ্যতে এমন অনাচার হবে আইনসিদ্ধ, ‘অনাচার’ বলার অবকাশই থাকবে না।

অধিকার, মানবিকতা ইত্যাদি ভারী কথা না-ই তুললাম; ধরে নিলাম আমরা কঠোর বাস্তববাদী। বাস্তবের সূত্র ধরেই ফিরে যাই গোড়ার কথায়। সামাজিকতা ও মানবিকতার যে অভাব আমাদের পীড়িত করছে, তা গ্রাস করেছে পুরো রাষ্ট্রিক অস্তিত্ব। খণ্ডস্বার্থ ও অপরত্ববোধকে সমাজের মূল চালিকাশক্তি করে তোলার প্রচেষ্টা চলছে দেশ জুড়ে। প্রচেষ্টা ইতিমধ্যেই সফল, কারণ বহু নাগরিক তার শামিল হচ্ছি, সহনাগরিকদের অপর ভেবে নির্বান্ধব বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিচ্ছি। ভাবছি না, এই বিভাজক অপরকেন্দ্রিক রাজত্বে প্রত্যেকে দলভারীদের আশ্রয় থেকে ছিটকে একা ও অসহায় হয়ে পড়তে পারি।

এখানেই আমাদের হিসেবে, নিছক স্বার্থরক্ষার হিসেবে, চূড়ান্ত গরমিল। ‘আমরা কী অমানবিক’, এই বোধ ছাপিয়ে আমার মনে তাই উঠে আসছে আরও বড় আক্ষেপ, ‘আমরা কী বোকা’। ভাবতে খারাপ লাগলেও, ইতিহাসে অনেক সেয়ানা অত্যাচারী পাপী বহাল তবিয়তে জীবন কাটিয়েছে। অবধারিত ভাবে পস্তেছে (হয়তো সেই অপশাসকদেরই পথ পরিষ্কার করে) মূর্খ অদূরদর্শীর দল। 

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে এমেরিটাস অধ্যাপক