একটি গাণিতিক ধাঁধার সম্মুখে দাঁড়াইয়া আছে পশ্চিমবঙ্গ। পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের হিসাব অনুসারে— বা, তাঁহার কথা মানিলে, স্বয়ং দলনেত্রীর হিসাবে, ৯৯.৯৯ শতাংশ নেতাই যদি সৎ হন, তবে প্রতি ১০,০০০ জন তৃণমূল নেতার মধ্যে এক জন কাটমানি লইয়া থাকেন। এই লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল দুই কোটি ত্রিশ লক্ষের কাছাকাছি ভোট পাইয়াছে। ধরিয়া লওয়া যায়, প্রতি একশত জন ভোটারের মধ্যে এক জনের বেশি নেতা থাকা অসম্ভাব্য। অতএব, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের ‘নেতা’র সংখ্যা বড় জোর দুই লক্ষ ত্রিশ হাজার। অর্থাৎ, দলনেত্রীর হিসাবে, রাজ্যে কাটমানিখোর নেতার সংখ্যা জনা তেইশের বেশি হইবে না। জেলাওয়াড়ি দুর্নীতিগ্রস্ত নেতার সংখ্যা গড়ে এক জন। মোল্লা নাসিরুদ্দিন প্রশ্ন করিতেন, এই যদি নেতার সংখ্যা হয়, তবে কাটমানি কোথায়; আর এই যদি কাটমানি হয়, তবে নেতা কোথায়? এই হিসাব লইয়া, অতএব, কথা বাড়াইবার প্রয়োজন নাই। প্রশ্ন হইল, মুখ্যমন্ত্রী হঠাৎ প্যান্ডোরার বাক্সটি খুলিয়া বসিলেন কেন? নজরুল মঞ্চে দাঁড়াইয়া তিনি কাটমানি ফিরাইবার নির্দেশ দেওয়া অবধি রাজ্যে ধুন্ধুমার বাধিয়াছে। কোথাও পঞ্চায়েত প্রধানের বাড়িতে টাকা ফেরত লইবার লাইন পড়িতেছে, কোথাও আত্মহত্যার অভিযোগ উঠিতেছে। কাটমানির টাকা ফিরাইয়া দেওয়া যে অসম্ভব, তাহা মুখ্যমন্ত্রীর অজানা নহে। টাকা ফিরাইতে হইলে প্রথমে স্বীকার করিতে হয়, টাকা লইয়াছেন। সরকারি প্রকল্প হইতে কাটমানি লওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে দলে দলে নেতারা অপরাধ স্বীকার করিয়া লইবেন, সে হেন রামরাজ্য এখনও প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। তাহা হইলে, হঠাৎ এই অসম্ভবের সাধনা কেন?

উত্তরটি সকলেই অনুমান করিতেছেন— মুখ্যমন্ত্রী যে কোনও উপায়ে জনসমর্থন ধরিয়া রাখিতে মরিয়া। প্রায় সর্ব ক্ষেত্রে কাটমানি খাইবার দলীয় অভ্যাসটি রাজ্যবাসীর বিরক্তির অন্যতম বড় কারণ, বিলম্বে হইলেও মুখ্যমন্ত্রী কথাটি সম্ভবত বুঝিয়াছেন। সমস্যা হইল, এই তোলাবাজি ঠেকাইবার কোনও বাস্তবসম্মত পথ তাঁহার সম্মুখে নাই। দুর্জনে বলিয়া থাকে, তৃণমূল কংগ্রেস নামক দলটির অস্তিত্বের কারণ হইল, এই দলে থাকিলে তোলা আদায় করা যায়। একদা বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে লড়াই দলটিকে আর একটি পরিচিতি দিয়াছিল— এই দফায় খুচরা দুর্নীতির মেঘে বিজেপি-বিরোধিতাও ঢাকা পড়িয়া গিয়াছে। অভিযোগ, রাজ্য রাজনীতি সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল নাগরিকমাত্রেই জানিবেন— সরকারি প্রকল্পে কাটমানি হউক বা কয়লা-বালি-গরু চালানের বখরা— রাজ্যে দুর্নীতি-খাতের লেনদেনের সহিত এমন এক বা একাধিক নাম জড়িত, যাঁহাদের দিকে আঙুল তুলিবার সাহস প্রশাসনেরও নাই। কাজেই, মুখ্যমন্ত্রী যতই খড়্গহস্ত হউন, তোলাবাজি থামিবে না— বড় জোর কিছু উলুখাগড়া মারা পড়িবে। তোলাবাজি যে বন্ধ করিতে হইবে, তাহাতে সংশয় নাই। কিন্তু, নজরুল মঞ্চ হইতে হুমকি দিয়া সেই কাজ হওয়ার নহে। তাহার জন্য দলের অভ্যন্তরীণ ও সরকারের প্রশাসনিক উদ্যোগ প্রয়োজন। যে নেতা কাটমানি গ্রহণ করেন, তাঁহার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করিতে হইবে। দলগত কিংবা অবস্থানগত প্রতিপত্তির কথা বিবেচনা না করিয়াই তাঁহার বিরুদ্ধে আগাইবার সাহস থাকিতে হইবে। একমাত্র সেই সাহসই এই সংশোধন সম্ভব করিতে পারে। শুধুমাত্র পুলিশকর্তার আশ্বাসে মানুষের বিশ্বাস জন্মানো মুশকিল। যেখানে দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাকে দল হইতে বিতাড়ন করা প্রয়োজন, রাজ্যবাসী দেখিতেছেন, ঠিক উল্টা ঘটিতেছে। বহু দুর্নীতিগ্রস্ত নেতার ক্ষমতা দিনে দিনে চন্দ্রকলার ন্যায় বৃদ্ধি পাইতেছে। এমতাবস্থায় মুখ্যমন্ত্রী এক দিন তোলাবাজির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করিবেন, আর পর দিন দলের বড় নেতা ৯৯.৯৯ শতাংশকে বেকসুর ঘোষণা করিবেন— এই কুনাট্যে শাসক দলের, বা সমগ্র রাজ্যের, মঙ্গল হইবে না।