পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে বড় ভিলেন কে এখন? চিন্ময়ী বেজ। অভিযোগ, প্রতিবেশীর সদ্যোজাতকে প্ল্যান করে চুরি করেছে সে। শুধু চুরি নয়, সুপরিকল্পিত চুরি, আর তার পিছনে সুপরিকল্পিত নাটক। নিজের গর্ভস্থ ভ্রূণ অকালে চলে যাওয়ার পরে গর্ভবতী হওয়ার নাটক করল কে? চিন্ময়ী। সে প্রতারণা করল। শিশু চুরি করার প্ল্যান করল কে? চিন্ময়ী। শিশু চুরি করল কে? চিন্ময়ী। তা হলে এই তিন অপরাধে অপরাধী কে? চিন্ময়ী। সাজা পাবে কে? অবশ্যই চিন্ময়ী।
তবে কিনা, চিন্ময়ীর সাজা আর নতুন করে কী হবে? এত বছর দগ্ধে দগ্ধে যে যন্ত্রণা তাকে দেওয়া হয়েছে, তা হয়তো এই আইনি সাজার চেয়ে কমই মনে হবে চিন্ময়ীর। একটু সময় বার করে আমাদের মূল্যবান মস্তিষ্ক খাটিয়ে এক বার ভেবে দেখা দরকার, চিন্ময়ী কেন এমন করল? টাকার লোভ? শিশু চুরি ও পাচার তো এখন রমরমা ব্যবসা, তাই? না, তেমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। শিশু পাচারের জন্য শিশু হলে তো সচরাচর টার্গেট থাকে শিশু-কন্যা, যৌনপল্লিতে বেচে মোটা টাকা লাভ আছে। কিন্তু চিন্ময়ী চুরি করল এক শিশুপুত্রকে। কেন?
চিন্ময়ীর ছেলে নেই, আট বছরের মেয়ে আছে। চিন্ময়ীর ছোট জায়ের ছেলে আছে, তাদের বংশের প্রদীপ আছে। অনুমান করা যায়, শ্বশুরবাড়িতে চিন্ময়ীর মা হিসেবে কোনও কদর নেই। পুত্রসন্তান না হলে আজও আমাদের সমাজে শ্বশুরবাড়িতে জননীর কদর থাকে না। তাকে নিয়ে সমাজে তাদের বাড়ি কলার তুলবে কী করে? অতএব গঞ্জনা, অপমান, ছেলে তৈরির তাড়না। মেয়েদের গর্ভ তো নয়, কাস্টমাইজ্ড মেশিন। শ্বশুরবাড়ি অর্ডার দেবে আর বছর বছর ছেলে বিয়োবে। তা না হলে এমন মানসিক ধোলাই চলবে, উঠতে বসতে কথার এমন আছাড়পাছাড় চলবে, এমনকী অনেক সময় গরম খুন্তি, চুলের মুঠিও এমন চলবে যে এক দিন জননীরা কেউ কেউ ছেলের তাড়নায় অপরাধের পথে নেমে পড়বে। মরিয়া হয়ে উঠবে নিজেকে টিকিয়ে রাখার জন্য, নিজের বিয়ে টিকিয়ে রাখার জন্য, মেয়ের ভবিষ্যতের জন্য। সমাজের চুপ-শয়তানির হাত থেকে বাঁচার জন্য। মিথ্যে বলবে, অভিনয় করবে।
চিন্ময়ীও হয়তো তা-ই করেছিল। সে কিছু দিন আগে অন্তঃসত্ত্বা ছিল। নিশ্চয়ই আশায় ছিল— ভগবান এ বারটা পার করে দাও, আমার কোলে একটা ছেলে দাও। কিন্তু ভাগ্য এমনই, চিন্ময়ীর গর্ভপাত হয়ে গেল। এক জন মায়ের কাছে গর্ভপাতের যন্ত্রণা দুর্বিষহ, গুঁড়িয়ে-দেওয়া। সবাই ভুলে যায়, কিন্তু কখনও না-হওয়া সেই সন্তানকে মা আমৃত্যু ভুলতে পারে না। চোখের জল ফেলেন সারা জীবন। কিন্তু চিন্ময়ী সেই অশ্রুটুকুর সুযোগ পেল না। বুকভাঙা কান্না নিয়ে বালিশে মুখ গুঁজতে গেলে সে ধরা পড়ে যাবে। ধরা পড়ে যাবে তার ‘অক্ষমতা’। তাই সে ওই প্রচণ্ড কষ্ট বুকে চেপে, গর্ভবতী হওয়ার মিথ্যে অভিনয় করে গেল। হয়তো বা মিথ্যে বমি, মিথ্যে ডাক্তারের কাছে যাওয়া, মিথ্যে কার্ড করানোও। নিজের কষ্টকে জলের মতো ঢকঢক করে গিলে নিল। সঙ্গে প্ল্যান ভাঁজতে লাগল, কী করে ছেলের মা হওয়া যায়। এবং শেষে মরিয়া হয়ে সরস্বতীর ছেলেকে চুরি করল। কী তুখড় মাথা! আর কী বুকের পাটা! এমনটা কেউ করতে পারে?
পারল তো। কিন্তু কী করে পারল? একটি বার ভাবা দরকার, এক জন মেয়ে কতটা মরিয়া হলে, কতটা ভয় পেলে, দেওয়ালে কতখানি পিঠ ঠেকে গেলে, কিংবা ছেলের মা হওয়ার অহংকার দেখানোর জন্য কতখানি তাড়না অনুভব করলে এ কাজ করে উঠতে পারে! সে-ও হয়তো অন্তর থেকেই বিশ্বাস করত যে ছেলে প্রসব না করতে পারলে মায়ের মূল্য নেই। এ কথা তাকে ভাবিয়েছিল কে? কোন সমাজ? যে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ আজ তার দিকে ঘৃণার দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে বিশ্বাস করতে পারছে না— এমন ভিলেন ভূ-ভারতে হয়!
এমনও নয় যে চিন্ময়ী বন্ধ্যা। তার মেয়ে রয়েছে। সে মা হয়েছে আগে। কিন্তু সেই মা হওয়া যথেষ্ট ‘মা’ হওয়া নয়। অথচ ছেলে তৈরি করার চাবিকাঠিটি তো তার কাছে নেই। ঘটনা হল, পুত্রসন্তান নির্মাণে মেয়েদের কোনও ভূমিকা থাকার কোনও উপায় নেই। মেয়েদের ডিম্বাণুতে ‘ওয়াই’ ক্রোমোজোম থাকে না, যা পুংসন্তান তৈরি করবে। সুতরাং চিন্ময়ীরা চাইলেই পুত্রসন্তান প্রসব করতে পারে না। পিতৃতন্ত্র তাকে ঘরে বন্ধ করে রাখলেও পারে না, বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিলেও পারে না, গলা টিপে ধরলেও পারে না, চেলাকাঠ দিয়ে মারলেও পারে না। এ ক্ষমতা একচ্ছত্র পুরুষের। সুতরাং, তাঁদের কাছে বিনীত অনুরোধ, অতঃপর প্রতি শুক্রাণুতে যেন তাঁরা ‘ওয়াই’ ক্রোমোজোম উপহার দেন, তা হলেই চিন্ময়ীরা বছর বছর ফুটফুটে পুত্রসন্তান শ্বশুরবাড়িকে উপহার দেবে, বংশে বাতি দেওয়ার লোক সাপ্লাই দেবে, গর্বিত, পূর্ণ মা হবে।
আর যে বংশে বাতি দেবে না, এক বার সেই ছোট্ট মেয়েটার কথা কি ভাবব আমরা? চিন্ময়ীর আট বছরের মেয়েটার ওপর দিয়ে কতটা ঝড় বইছে! সে ভয়ে সিঁটিয়ে গিয়ে দেখছে যে তার মা-বাবাকে পুলিশ ধরে নিয়ে যাচ্ছে, লোকে যা-তা বলছে। আর এ সবই— সে ভালই বুঝতে পারছে— তার ভাই নেই বলে। সে যতই ছোট হোক, সমাজ তাকে এই নির্মম সত্য ঘা মেরে বুঝিয়ে দেবে। তার কতখানি ছোট লাগছে নিজেকে যে, সে মেয়ে বলে তার মায়ের আজ এই পরিণতি! সে ছেলে হলে মা-বাবার এই দশা হত না। সে হয়তো দুমড়েমুচড়ে, একটা ভীত সত্তা নিয়ে বড় হবে, একটা চাপা কান্না গুনগুন করে চলবে তার মধ্যে। সে জ্বলে জ্বলে উঠতে পারে তার প্রতি সমাজের, প্রতিবেশের এই ব্যবহার থেকে। পুরুষের প্রতি বিদ্বেষ তৈরি হওয়ার যথেষ্ট কারণ কিন্তু তাকে এখনই দিয়ে দেওয়া হল। এই মেয়ে যদি বড় হয়ে পুরুষবিদ্বেষী হয়, তখন যেন বলবেন না, ফেমিনিস্টরা কেবল পুরুষদের ঘেন্না করতে জানে!