কোভিড-১৯ অতিমারির পাঁচ মাস পার হইয়া গেল, কিন্তু বেসরকারি হাসপাতাল কী করিতে পারে আর কী পারে না, তাহা লইয়া ধন্দ ঘুচিল না। রোগী ভর্তির পূর্বে অগ্রিম টাকা দাবি করা কি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হইয়াছে? স্বাস্থ্যবিমা থাকিলেও তাহা গণ্য না করিয়া নগদ দাবি করা কি বৈধ? পিপিই প্রভৃতি সুরক্ষা সরঞ্জামের জন্য হাসপাতাল রোগী-পিছু কত দাবি করিতে পারে, তাহার সর্বোচ্চ সীমা কি নির্ধারিত হইল? সর্বোপরি, রাজ্য সরকার কয়েক দফায় যে পনেরোটি পরামর্শ (অ্যাডভাইজ়রি) জারি করিয়াছে, সেগুলির অনুসরণ কি কেবলই বেসরকারি হাসপাতালের সদিচ্ছার উপর নির্ভরশীল? সম্প্রতি স্বাস্থ্য দফতরের কর্তারা বলিয়াছেন, অগ্রিম না পাইলেও চিকিৎসা করিতে হইবে, এই পরামর্শ অমান্য করিলে স্বাস্থ্য দফতর বেসরকারি হাসপাতালের লাইসেন্স ‘সাসপেন্ড’ করিবার সুপারিশ করিতে পারে। এই ঘোষণায় রাজ্যবাসী আশ্বস্ত হইবেন, এমন আশা কম। গত কয় মাসে বেসরকারি হাসপাতালে অনেকগুলি এমন ঘটনা ঘটিয়াছে, যাহা কেবল দুর্ভাগ্যজনক নহে, অনৈতিক ও অমানবিক। সরকারি কমিশন কয়েকটির ক্ষেত্রে কেবল আর্থিক ক্ষতিপূরণেরই নির্দেশ দিয়াছে। এবং এই সকল নির্দেশের পরেও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাপ্রার্থীর দুর্ভোগ নিয়ন্ত্রিত হয় নাই।
অভিযোগ কেবল এই রাজ্যেই উঠে নাই। গোটা ভারত জুড়িয়াই অতিমারির আবহে ছোট-বড় বেসরকারি হাসপাতাল যে কর্মপদ্ধতি লইয়াছে, তাহাতে ‘ঝোপ বুঝিয়া কোপ’-এর একটি নকশা মিলিতেছে। প্রথমত, অধিকাংশ শয্যা, আইসিইউ এবং ভেন্টিলেটর লইয়াও বেসরকারি চিকিৎসাক্ষেত্র দীর্ঘ দিন কোভিড রোগীর জন্য দরজা বন্ধ রাখিয়াছিল। পরিকাঠামো নাই, এই অজুহাতে তাহারা রোগী ভর্তি এড়াইয়াছে। দ্বিতীয়ত, চিকিৎসার মাত্রাতিরিক্ত খরচ দাবি করিতেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জটিল অস্ত্রোপচারে যত টাকা লাগিতে পারে, কোভিড চিকিৎসার খরচ তাহার কাছাকাছি না আসিলেও রোগীর নিকট টাকা দাবি করা হইয়াছে তাহার অধিক। কেবল কোভিড রোগীই নহে, যে কোনও চিকিৎসাপ্রার্থীর নিকট এখন অতিরিক্ত টাকা দাবি করা হইতেছে, যাহার যৌক্তিকতা সামান্যই। নানা রাজ্যের বেসরকারি হাসপাতালে দেখা গিয়াছে, একই পিপিই, মাস্ক প্রভৃতি বহু রোগীর নামে বিল করিয়া অর্থ লওয়া হইতেছে। তৃতীয়ত, স্বাস্থ্যবিমার শর্ত উপেক্ষা করিয়া কখনও অগ্রিম দাবি, কখনও নগদ টাকা দাবি করা হইতেছে, যাহা প্রকৃত প্রস্তাবে বিমার গ্রাহকদের সহিত চুক্তিভঙ্গ। বিশেষত টাকা না পাইলে চিকিৎসা শুরু না করিবার যে সকল ঘটনা জনসমক্ষে আসিয়াছে, তাহাতে হাসপাতালের প্রতি অনাস্থা এবং অনাগ্রহ দেখা দিয়াছে নাগরিকের। হয়রানি এবং অতিরিক্ত খরচের ভয়ে বহু রোগী হাসপাতাল এড়াইতেছেন, বিলম্বের ফলে বিবিধ রোগ আরও দুরারোগ্য এবং প্রাণঘাতী হইয়া উঠিতেছে।
এই সমস্যা নূতন নহে। অতীতেও আর্ত মানুষের অবহেলা এবং প্রতারণার ঘটনায় বেসরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে জনরোষ বিস্ফোরক হইয়াছে। সরকারকে মধ্যস্থতা করিতে এবং ব্যবস্থাগ্রহণের আশ্বাস দিতে হইয়াছে। পশ্চিমবঙ্গে ২০১৭ সালে হাসপাতাল নিয়ন্ত্রণে কমিশন প্রতিষ্ঠা তেমনই ব্যবস্থা। কিন্তু কটু সত্য ইহাই যে, গত কয়েক বৎসরে বেসরকারি চিকিৎসাক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা যায় নাই। অতিমারির আপৎকালে সঙ্কট ফের তীব্র হইয়াছে। এই রাজ্যের বেসরকারি হাসপাতালগুলি কখনও পরামর্শের যৌক্তিকতা লইয়া প্রশ্ন তুলিতেছে, কখনও তাহার বিশদ ব্যাখ্যা দাবি করিতেছে। আপৎকালে বিভ্রান্তি নিরসনে কালক্ষয় করাই কি কর্তব্য? বেসরকারি হাসপাতালের নিকট রোগী খয়রাতি প্রত্যাশা করে না। নীতিসম্মত, স্বচ্ছ পরিষেবা নিশ্চিত করা হউক।