কাল সন্ধ্যায় হাজরার মোড়ের কাগজের স্টল-এ পূজাসংখ্যা পত্রিকাগুলি উল্টেপাল্টে দেখছিলাম। যে-কাগজ খুলি তাতেই দেখি নরেন্দ্রনাথ মিত্র।’ ‘দেশ’ পত্রিকার শনিবাসরীয় আড্ডায় একদা এ মন্তব্য বিমল মিত্রের। বিমলবাবু অবশ্য এখানেই থামলেন না। তিনি বললেন, ‘আমাদের পাড়ার সংহতি সংঘের সার্বজনীন পূজার উৎসাহী ছেলেরা আজ সকালে এসেছিল পত্রিকা দিতে। …কাগজটা খুলে দেখি সেখানেও নরেন্দ্রনাথ মিত্র।’ 

বিমল মিত্র নিজেও তখন বিভিন্ন নামী পত্রিকার পুজো সংখ্যার অপরিহার্য লেখক। তবে পুজোসংখ্যায়  লেখার সংখ্যার বিচারে তিনি নরেন্দ্রনাথের ধারেপাশে আসবেন না, বলাই যায়। নরেন্দ্রনাথ তখন বন্ধু নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পুজোসংখ্যায় গল্প লেখেন। কিন্তু তাঁর দুঃখ, কোনও বার বন্ধুকে টপকাতে পারেন না। এমন আলোচনার বছরটাতেও তিনি উনিশ, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় তেইশ। ওই  শনিবাসরীয় আড্ডাতেই সে দিন এ কথা কবুল করলেন খোদ নরেন্দ্রনাথ মিত্রই।

নরেন্দ্রনাথ মিত্র বলতেই আমাদের ‘রস’-এর কথা মনে পড়ে। কিন্তু এক কালে পুজোসংখ্যাগুলো ভরে থাকত তাঁর লেখা গল্পে। বেশি লিখলে লেখার মান কমে যায় এই চলতি ধারণাকে নস্যাৎ করেই অবশ্য। সে দিন নরেনবাবু ‘দেশ’-এর দফতরে হঠাৎ এসেছিলেন তাঁর পুজোসংখ্যার কপি নিতে। সেটি হস্তগত হতে আর দাঁড়ালেন না। পিছন থেকে সব্যসাচী লেখক সুশীল রায় টিপ্পনি ছুড়লেন, ‘নরেনবাবু, ঝাঁকামুটে নিন। একা অতগুলি পূজাসংখ্যা বাড়ি বয়ে নিয়ে যাবেন কি করে?’ পুজোসংখ্যার লেখা নিয়ে এমন কত টুকরো সরস গল্প যে ছড়িয়ে আছে বাংলা সাহিত্যের আনাচে-কানাচে, তার ইয়ত্তা নেই। এক প্রকাশনা সংস্থার দোকানের সে দিনের ঘটনাটা বলা যাক। দোকানে সে দিন হাজির বিভূতিভূষণ। তারাশঙ্করের ছেলে সনৎকুমার কী কাজে সেখানে এসেছিলেন। বিভূতিভূষণকে দেখতে পেয়ে সনৎকুমার ‘সিঁদূরচরণ’ গল্পটির প্রশংসা করলেন। এর কিছুক্ষণ বাদে ওখানে হাজির সম্পাদক নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়। তিনি বিভূতিভূষণকে দেখতে পেয়ে এমন ভাব দেখালেন, যেন তাঁকেই তিনি খুঁজছেন। বললেন, ‘এই যে বিভূতি! ...এটা কি 

গল্প হয়েছে?’ যে ‘সিঁদূরচরণ’ পড়ে সনৎকুমার মুগ্ধ সেই ‘সিঁদূরচরণ’ নিয়ে খোদ সম্পাদকের এমন মন্তব্য! নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চলে যেতেই ক্ষোভে ফেটে পড়লেন সনৎকুমার, ‘জ্যাঠামশাই, আপনি কিছু বললেন না!’ বিভূতিভূষণ শান্ত ভাবে বললেন, ‘কে কি বলল না বলল তাতে কি যায় আসে! নিজের কাছে ঠিক থাকলেই হল।’ 

নামী লেখকদের লেখা দিয়ে নিজের পত্রিকার পুজোসংখ্যা ভরাবেন, এমন ইচ্ছে বোধহয় বেশিরভাগ সম্পাদকই পোষণ করেন। কিন্তু নামীদের নাগাল পাওয়া কি অত সহজ? ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকলেও লেখকদের অলসতা অনেক সময় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যেমনটা হয়েছিল পুজোসংখ্যায় শরৎচন্দ্রের লেখা পেতে গিয়ে নলিনীকান্ত সরকারের।   

১৯২১ সালের কথা। শরৎচন্দ্র কথা দিয়েছিলেন পুজোসংখ্যায় লেখা দেবেন। সম্পাদক নলিনীকান্ত শরৎচন্দ্রের লেখা নিতে বাজেশিবপুর ছ’মাস ধরে হাঁটাহাঁটি করলেন। অবশেষে এল লেখার অক্ষমতা জানিয়ে শরৎচন্দ্রের একখানা চিঠি। তাতে শারীরিক কারণে লেখার অক্ষমতা ছাড়াও শরৎচন্দ্র লিখেছেন, ‘ভরসা এই যে, তোমাদের কাগজও বন্ধ হবে না, আমিও হয়ত মারা যাব না। দেহটা সুস্থ হলেই লিখতে শুরু করবো।’ এই চিঠিই শেষ পর্যন্ত ছাপা হল ১৯২১ এর পুজোসংখ্যায়।

নলিনীকান্ত অবশ্য হাল ছাড়েননি। পরের বার পুজোসংখ্যার জন্য তিনি শরৎচন্দ্রকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছিলেন একটি লেখা। সহজ পথে নয় অবশ্য। বলা যায়, সে এক মজাদার কাহিনি। শরৎচন্দ্রকে এক দিন উল্টোপাল্টা বুঝিয়ে নলিনীকান্ত বাড়ি থেকে বের করে আনলেন। তার পরে একটা ট্যাক্সি ভাড়া করে শরৎচন্দ্রকে নিয়ে সোজা এসে উঠলেন নিজেদের পটুয়াটোলা লেনের মেসে। দোতলায় যে ঘরে তিনি থাকতেন, সেখানে নিয়ে গিয়ে শরৎচন্দ্রকে চা, সিগারেট খাইয়ে ধরিয়ে দিলেন একটা রাইটিং প্যাড আর ফাউন্টেন পেন। বললেন, ‘দাদা দয়া করে আমার লেখাটি লিখুন। লেখা না দিলে আপনার নিষ্কৃতি নেই।’ বলে বাইরে এসে দরজার শিকল তুলে দিলেন। শরৎচন্দ্র তো অবাক। তবে মেনেও নিলেন স্নেহাস্পদের দাবি। ঘণ্টা তিনেক বন্দি থেকে লিখলেন-‘দিন কয়েকের ভ্রমণ কাহিনী’।

লেখার ব্যাপারে শরৎচন্দ্রের মতো অলসতা ছিল আর এক ডাকসাইটে লেখক প্রেমেন্দ্র মিত্রের। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘যখন তাঁর পর্যায়ের লেখকরা শারদীয় সংখ্যায় লেখার জন্য বিষম ব্যস্ত, তখন প্রেমেন্দ্র মিত্র বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়ে অন্য কোথাও সারাদিন তাস খেলে কাটাচ্ছেন।’ কিন্তু প্রেমেন্দ্র মিত্র ছিলেন সম্পাদকদের পছন্দের লেখক। সবাই চান প্রেমেন্দ্র মিত্রের লেখা থাকুক তাঁর পত্রিকার পুজোসংখ্যায়। কিন্তু তাঁর কাছ থেকে লেখা আদায় খুব কঠিন কাজ। মিষ্টভাষী প্রেমেন্দ্র মিত্র কাউকেই নিরাশ করেন না। প্রত্যেককেই উনি বলেন, ‘মুড যদি আসে কবিতাই তা হলে পাবে। তা না হলে গল্প।’ কিন্তু প্রত্যেককেই শেষ পর্যন্ত নিরাশ হতে হত। প্রেমেন্দ্র মিত্রের কাছ থেকে লেখা চাইতে গিয়ে সাগরময় ঘোষের এক বার অন্য রকম অভিজ্ঞতা হয়েছিল। তিনি প্রেমেন্দ্রবাবুর বাড়ি যেতে প্রথমেই লেখকের প্রশ্ন, ‘তুমি কত দিন আমার বাড়িতে আসছ?’ সাগরময়বাবু মনে মনে হিসাব করে বললেন, ‘বারো বছর।’এ বার লেখকের জিজ্ঞাসা, ‘এই বারো বছর তুমি পুবদিকের জানালাটা লক্ষ্য করে এসেছ?’ সাগরময়বাবু জবাব দিলেন, ‘এসেছি। কিন্তু কোনও দিন খোলা অবস্থায় দেখিনি।’ এই উত্তর শুনে লাফিয়ে উঠলেন লেখক, ‘ভেরি গুড! তা হলে তোমাকে সাক্ষী 

হতে হবে।’ 

আসলে এই জানলা নিয়ে পড়শির সঙ্গে সে সময় মামলা চলছিল প্রেমেন্দ্রবাবুর। এ দিকে পুজোর লেখা বলে কথা। আদালতে সাক্ষী দিতে রাজি হলে যদি লেখা পাওয়া যায়! সাগরময়বাবু এককথায় রাজি হয়ে গেলেন সাক্ষী দিতে। এ বার পুজোর লেখার প্রসঙ্গ উঠল। লেখক চোখ পাকিয়ে ধমক দিয়ে উঠলেন, ‘লজ্জা করে না লেখা চাইতে? দেখছ মামলা মোকদ্দমায় ডুবে আছি।’ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তখন আনন্দবাজার, দেশ-সহ দু’ একটা জায়গায় টুকটাক অন্য রকম গদ্য লিখলেও উপন্যাস লেখেননি। তখনও তাঁর যতটুকু পরিচিতি, তা কবি হিসাবেই। সুশীল রায়ের বাড়ির  সান্ধ্য আড্ডায় সে দিন সুনীল রয়েছেন। রয়েছেন সাগরময় ঘোষও। আসরের মাঝামাঝি সময়ে সাগরময়বাবু সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে চোখের ইঙ্গিতে বাইরে যেতে বললেন। বাইরে এসে তিনি বললেন, ‘সুনীল, এবার শারদীয় সংখ্যার ‘দেশ’-এ তোমাকে উপন্যাস লিখতে হবে।’ এমন প্রস্তাবের আকস্মিকতায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রথমে হকচকিয়ে গেলেন, কী বলবেন ভেবে পেলেন না। তার পরে  ধাক্কা কাটিয়ে তিনি এ ব্যাপারে তাঁর অসম্মতি জানালেন। সাগরময়বাবু কিন্তু সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রতিক্রিয়াকে পাত্তা দিলেন না। তিনি বললেন, ‘কোনও কথা শুনতে চাই না। তুমি কাল থেকেই লিখতে বসে যাও।’ সে বার পুজোসংখ্যার ‘দেশ’-এ প্রকাশিত হল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রথম উপন্যাস, ‘আত্মপ্রকাশ’।

শিক্ষক, ভগবানগোলা হাইস্কুল