Advertisement
E-Paper

অকর্মযোগ

নেশার মৃত্যু নাই। এক দিনের জন্য সকলের স্বাভাবিক জীবন অচল করিয়া দিবার স্বাদ যাঁহারা পাইয়াছেন, তাঁহারা জানেন, ইহা কেমন শিহরনময় নেশা। শিহরন আরও বেশি এই জন্য যে, এই নেশার দাম নিজের উপর পড়ে না, পড়ে অন্যের উপর।

শেষ আপডেট: ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ২১:৪৫

নেশার মৃত্যু নাই। এক দিনের জন্য সকলের স্বাভাবিক জীবন অচল করিয়া দিবার স্বাদ যাঁহারা পাইয়াছেন, তাঁহারা জানেন, ইহা কেমন শিহরনময় নেশা। শিহরন আরও বেশি এই জন্য যে, এই নেশার দাম নিজের উপর পড়ে না, পড়ে অন্যের উপর। কত লোক কাজ করিতে পারিল না, কত লোকের ভোগান্তি হইল, এই সব নেতিবাচক ও অপরের ক্ষতিকারক হিসাবের উপর ভর করিয়াই ধর্মঘট-বন্‌ধের সাফল্য স্থির হয়, আত্মপ্রসাদের মাত্রা তরতরাইয়া চড়ে। সব নেশার পিছনেই (কু)যুক্তি খাড়া করিবার প্রচলন। এ ক্ষেত্রেও তাহাই। ধর্মঘটের আগে সিপিআইএম-এর প্রচারে তাই ধর্মঘট এবং বন্‌ধ-এর পার্থক্য গুলাইয়া দিবার বেশ একটি শিশুভোলানো চেষ্টা দৃশ্যমান। শিশু ছাড়া কেহ মানিবে না যে, কোনও কলকারখানা বা শিল্পক্ষেত্রে শ্রমিক অধিকারের দাবিতে যে ধর্মঘট, তাহার সহিত দেশজোড়া অচলাবস্থা কিংবা বন্‌ধকে একাকার করিয়া দেখা বা দেখানো যাইতে পারে, কিংবা কর্মী ইউনিয়নের পরিচালনায় যে সীমিত ধর্মঘট, তাহার সহিত রাজনৈতিক দল দ্বারা পরিকল্পিত ও পরিচালিত বন্‌ধকে মিলাইয়া দেওয়া যাইতে পারে। শ্রমজীবী মানুষ ধর্মঘট করিয়া কতখানি দাবিদাওয়া আদায় করিতে পারেন, তাহা ভিন্ন প্রশ্ন। কিন্তু নিজের কর্মক্ষেত্র বাদ দিয়া তাঁহারা অন্যান্য মানুষের জীবন কেন, কোন অধিকারে বিপর্যস্ত করিবেন? সাধারণ ধর্মঘট প্রণোদিত নহে, আরোপিত। কেবলমাত্র সেই কারণেই ইহা সম্পূর্ণ অন্যায্য। অনধিকার-রাজনীতি।

ধর্মঘটীরা ঠিক কী চাহিতেছেন, এবং কী ভাবে তাহা পাইবার আশা করিতেছেন, সেই প্রশ্নে ধোঁয়াশা বরাবরের মতোই গভীর। কেন্দ্রের প্রস্তাব ও সরকারি কর্মীদের দাবির মধ্যে ফারাক থাকিতেই পারে, আশ্চর্য নয়। অর্থমন্ত্রী সম্প্রতি যে ঘোষণা করিয়াছেন, তাহাতে বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি আছে, সর্বতোভাবে না হইলেও ধর্মঘটী শ্রমিকরা তাহা দেখিয়া অংশত তুষ্ট বোধ করিতেই পারিতেন। কিন্তু তাঁহাদের ভাবখানা, যাহা বলিব সবই চাই, নতুবা মজা দেখাইয়া দিব। এই ভাবের মধ্যে জেদ ও দুঃসাহস থাকিতে পারে, বাস্তববোধ নাই, আলাপ-আলোচনার ধৈর্যও নাই। আপত্তি এখানেই। প্রস্তাব যে আসিয়াছে এবং আসিতেছে, ইহাও কি বোঝাপড়ার একটি ভিত্তি হইতে পারে না? হইতে পারে না, কেননা এ ক্ষেত্রে ধর্মঘটের নেশাটাই বড়, মীমাংসার সূত্রটি তেমন কাঙ্ক্ষিত নয়। এ বারের প্রস্তাবে কিন্তু স্পষ্ট কিছু দিশা ছিল, যাহা কোনও মতেই উপেক্ষাযোগ্য নয়। সামাজিক সুরক্ষার দিক দিয়া বিচার করিলে, অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের যে দাবিদাওয়া বার বার শ্রমিক ইউনিয়নগুলির মনোযোগের বাহিরে পড়িয়া যায়, তাহার কিছু স্বীকৃতি এ বারের প্রস্তাবে ছিল, আলোচনার অবকাশও ছিল। কিন্তু বামপন্থীরা ধর্মঘট করিয়া নিজেদের শক্তি বাড়াইতে চাহেন, অসংগঠিত শ্রমিকদের মঙ্গল লইয়া তাঁহাদের কোনও মাথাব্যথা নাই, থাকিলে বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়নগুলি তাঁহাদের কার্যত অপাঙ্‌ক্তেয় করিয়া রাখিত না!

আংশিক হইলেও সেই অগণতন্ত্রের সংস্কৃতিকে প্রতিরোধের প্রয়াস যে পশ্চিমবঙ্গে দেখা যাইতেছে, তাহা বিরাট সুসংবাদ। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় আসিবার পর হইতেই ধর্মঘট-বনধ-এর বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়া দেখিয়াছেন, এ বারও দেখিতেছেন। ধর্মঘট ছাড়া আরও একটি দিনে সরকারি কর্মীদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করিবার পদ্ধতিতে কিছু গলদ থাকিয়া গেল কি না, রাজ্য সরকারকে তাহা আরও গুরুত্ব দিয়া বিবেচনা করিতে হইবে। কিন্তু পদ্ধতি লইয়া প্রশ্ন থাকিলেও উদ্দেশ্য প্রশ্নাতীত। জোরকে জোর দিয়াই ঠেকাইতে হয়। বন্‌ধ সংস্কৃতি পশ্চিমবঙ্গে সামান্য হইলেও ধাক্কা পাইয়াছে। সে ধাক্কা নিকট ভবিষ্যতে সুসংবদ্ধ প্রতিরোধে পরিণত হইবে, আশা থাকিল।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy