প শ্চিমবঙ্গ সরকার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু সংক্রান্ত ৬৪টি গোপন পুলিশ-ফাইল প্রকাশ্যে এনে প্রায় আলোড়ন ফেলে দিয়েছে, এমনটাই মনে করা হচ্ছে। অবশ্যই নেতাজির মতো দেশনায়কের বিষয়ে মানুষের স্বাভাবিক কৌতূহল থাকবেই এবং গণতান্ত্রিক সরকারের কাজ হল তা চরিতার্থ করা। নেতাজি তো বটেই, কোনও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সম্পর্কেই অহেতুক রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা কাম্য নয়, সে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামী বা মাওবাদী— যা-ই হোন না কেন। বহমান ইতিহাস চর্চায় সবার সম্পর্কেই যতটা সম্ভব ঠিক তথ্য জানার অধিকার মানুষের আছে। সবটা হয়তো কখনওই জানা যায় না।
তথ্যের উপর নির্ভর করেই ইতিহাস তার ব্যাখ্যা সাজায়। ঐতিহাসিক ব্যাখ্যার ভিন্নতা ধরা পড়ে ইতিহাসবিদের দৃষ্টিভঙ্গির সাপেক্ষে। তথ্য পালটায় না। কিন্তু কোন তথ্য আমি ব্যবহার করব, কোনটাকে বা তত গুরুত্ব দেব না, তা নির্ভর করছে আমি কী জানতে বা জানাতে চাইছি, তার উপর। বিপুল নথি ঘেঁটে একটি মাত্র বিষয়ে মনোনিবেশ করা হলে তা সংশ্লিষ্ট রাজনীতিকের প্রতি অবিচার। মুখ্যমন্ত্রী ঘুড়ির সুতো ধরিয়ে দিয়েছেন। বলেছেন, ‘মনে হচ্ছে ১৯৪৫-এর পরও নেতাজি জীবিত ছিলেন।’ আমরা ওই সুতোয় টান দেব কি?
তাইহোকু বিমানবন্দরে তোলা শেষ ছবির পর সুভাষচন্দ্রের ঠিক কী হয়েছিল, তা জানার প্রয়োজন নিশ্চয়ই আছে। বিমান দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যুর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়া যায়নি। অন্য কোনও সম্ভাবনারও সর্বজনগ্রাহ্য কোনও ব্যাখ্যা নেই। স্বীকৃতি নেই তো নেই! অথচ তিনি নেতাজি! বাঙালির এক বিরাট আইকন। তিনি বিয়ে করতে পারেন না, মৃত্যু তো হতেই পারে না। বাঙালির কাছে তিনি সদা রহস্যময় এক মহাপুরুষ। কখনও গুমনামি বাবা, কখনও শৌলমারির সাধু। তাঁকে নিয়ে কাহিনির পর কাহিনি। সরকারি নথি প্রকাশের ফলে রহস্যজাল ছিন্ন না হয়ে শুধুই চিন্তাসূত্রের সম্প্রসারণ ও আর এক অসম্ভব কাহিনি বপন ঘটবে? চিন, সোভিয়েত রাশিয়া মায় স্তালিন, মাও সে তুং— সব একাকার হয়ে যাবে?
নেতাজির জীবনরহস্যের চেয়ে অধিক তাৎপর্যপূর্ণ কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক জীবন। তাঁর আড়াই দশকের রাজনৈতিক জীবন বাঙালিকে সাত দশক আচ্ছন্ন করে রেখেছে। বাঙালির কাছে গাঁধী বা নেহরু কখনও সে ভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেননি বহুলাংশে সুভাষচন্দ্রের খাতিরেই। নানা রংবেরঙের কল্পনা সাজিয়ে বাঙালি তৈরি করেছে গাঁধী-সুভাষ, নেহরু-সুভাষ দ্বৈরথের কাহিনি। সেই সত্য-মিথ্যার আশ্চর্য বপনে বাঙালি মধ্যবিত্তের ড্রয়িং রুম আলোড়িত হয়েছে। গাঁধী বলেছেন, ‘সীতারামাইয়ার পরাজয় আমার পরাজয়’— এই আপ্তবাক্য শুনতে শুনতে বড় হয়েছি। যদিও কথাটা ভুল। গাঁধী প্রকৃতপক্ষে আরও তীব্র অভিব্যক্তির পরিচয় দিয়েছিলেন। গাঁধীর মতে, সীতারামাইয়ার পরাজয় যতটা না সীতারামাইয়ার, তার থেকেও অনেক বেশি তাঁর। বিশিষ্ট রবীন্দ্রগবেষকের কাছে শুনেছি, ১৯৩৯-৪০ কালপর্বে যখন গাঁধী-সুভাষ সম্পর্ক তলানিতে, রবীন্দ্রনাথ মধ্যস্থতার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন। গাঁধী এক লাইনের টেলিগ্রাম পাঠান— ‘Tell Subhas to submit to discipline’. শোনা কথা। এ নথি সংরক্ষিত আছে কি না জানি না। সে সময়ে কংগ্রেস দলে নিয়ম ছিল, জরুরি অবস্থা ব্যতিরেকে এক ব্যক্তি পর পর দু’বছর সভাপতি হবেন না। আজকের প্রেক্ষিতে ওই নিয়ম কিছুটা অদ্ভুত শোনায় ঠিকই। তবে নেতাজি দ্বিতীয় বার সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় গাঁধী অত্যন্ত ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েছিলেন, এ কথা ধোপে টেকে না। বস্তুত তিনি দলীয় শৃঙ্খলার ওপর জোর দিয়েছিলেন, ওয়ার্কিং কমিটি থেকে সবাইকে পদত্যাগ করতে বলেছিলেন। সুভাষচন্দ্রকে অনুরোধ করেছিলেন নির্বাচিত সভাপতি হিসেবে নতুন ওয়ার্কিং কমিটি তৈরি করতে। বাঙালি এ বিষয়ে চর্চা করে না যে, ওই ওয়ার্কিং কমিটি থেকে এক জন বাদে সবাই পদত্যাগ করেছিলেন। গাঁধীর নির্দেশ অমান্য করেছিলেন জওহরলাল নেহরু। নির্বাচিত সভাপতির পাশে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন, বন্ধুর মতোই তাঁর সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত হয়েছিলেন। সেই ইতিহাস আমরা জানতে চাই না। আমাদের রক্তে তর্ক নেই, আছে হৃদয়হীন কলহ করার অভ্যাস। তাই, বিমান দুর্ঘটনার খবর আসার পর গাঁধী যখন বলেন ‘he was a son to me’, আমরা তা মনে রাখতে চাই না।
আসলে সুভাষচন্দ্রের জীবনরহস্য উদ্ঘাটন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের নির্মোহ চর্চার চাইতে বেশি উপাদেয়। রাজনীতি চর্চা নেতাজি বনাম গাঁধীজি মার্কা একটা মোটাদাগের বিষয়ে আবদ্ধ করে নিজেদের দলীয় সুবিধালাভই আমাদের অভীপ্সা। সুভাষচন্দ্রের জীবনরহস্য জানা জরুরি। যত নথি আছে, সব সামনে আনা দরকার। প্রয়োজন তা পাঠের পর্যাপ্ত শিক্ষা। যথেষ্ট যোগ্যতার সঙ্গে এই কাজ না করলে, পুনরায় জীবনরহস্য অন্য দিকে বাঁক নিতে পারে। এ বিষয়ে কেন্দ্র-রাজ্য বিবাদ নয়, প্রকৃত বস্তুনিষ্ঠ সমন্বয় প্রয়োজন।
অথচ তাঁর রাজনৈতিক জীবন ও ভাবনার পর্বগুলিকে নির্মোহ অনুসন্ধানে আমাদের প্রবল অনীহা। এক দিকে ভক্তির প্রাবল্য, অন্য দিকে ভীতি। অনেকেই মনে করেন, এটা বাঙালির আবেগের প্রশ্ন, তাকে ঘাঁটিয়ে লাভ নেই। কিন্তু এক জন বিশিষ্ট বাঙালিকে নিয়ে চর্চার ক্ষেত্রে অসম্পূর্ণতা থাকবে কেন? নেহরু সুভাষচন্দ্রের পরিবারের ওপর গোয়েন্দাগিরি করেছিলেন কি না তা জানা দরকার, কিন্তু তার দ্বারা সুভাষচন্দ্রের রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা আমি কী ভাবে অনুধাবন করব?
নেতাজির রাজনৈতিক ভাবনার চর্চা একান্তই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শ্রেণিকক্ষে আবদ্ধ। জনসমাজের সে-সব নিয়ে কোনও আগ্রহ নেই। কারণ, সে সবে নাটকের উপাদান নেই। গাঁধীর সঙ্গে সুভাষের দ্বন্দ্ব আর আজকের রাজনৈতিক বিরোধের মধ্যে ব্যক্তিগত শত্রুতা এমনকী খুনোখুনির বাস্তবতার যে গুণগত তফাত, তা বুঝতে ওই ইতিহাস চর্চা আবশ্যিক। পদ্ধতিগত মতপার্থক্যকে উড়িয়ে সুভাষচন্দ্র আইএনএ-তে ‘গাঁধী ব্রিগেড’, ‘নেহরু ব্রিগেড’ তৈরি করেছিলেন, আশীর্বাদ কামনা করেছিলেন ‘জাতির জনক’-এর— এ তথ্য আজকের অ-সহনশীল রাজনৈতিক বাতাবরণে অধিকতর প্রাসঙ্গিক। যেমন চুলচেরা বিশ্লেষণ প্রয়োজন সুভাষচন্দ্রের ‘সমাজবাদ’ সংক্রান্ত রাজনৈতির মডেলটির। মনে পড়ে, ১৯৯৫-এর ২৩ জানুয়ারি নেতাজি রিসার্চ ব্যুরোর অনুষ্ঠানে এসেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরসিংহ রাও। বলেছিলেন সুভাষচন্দ্র সম্পর্কে তাঁর ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা। আপ্লুত হয়েছিলাম সে-সব শুনে। অথচ তাঁর আগমনে আমরা সবাই দর্শকাসনে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেও, স্থির হয়ে বসে ছিলেন লক্ষ্মী সহগল। পরে তাঁর বক্তৃতায় গভীর বেদনার সঙ্গে উল্লিখিত হয়েছিল সুভাষচন্দ্রের রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা এবং ভারতীয় রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টায় তা সম্পূর্ণ লোপ পাওয়ার ইতিবৃত্ত। তাঁর বক্তব্য কিছুটা ইউরোপিয়ান শোনালেও, বলতে দ্বিধা নেই যে, প্রধানমন্ত্রীর তুলনায় তা অনেক সারগর্ভ ছিল।
আমি তখন সুভাষচন্দ্রকে নিয়ে এক বিশিষ্ট চলচ্চিত্রকারের গবেষণার সহযোগী ছিলাম। তাঁর মতো মনোযোগী গবেষক বিশ্ববিদ্যালয় স্তরেও দুর্লভ। সুভাষচন্দ্রের জীবন ও রাজনীতি নিয়ে অনবদ্য চিত্রনাট্য রচনা করেছিলেন ওই বাঙালি চলচ্চিত্রকার। যদিও দুর্ভাগ্যজনক ভাবে ছবিটি তৈরি হয়নি। মুখ্যমন্ত্রী চেষ্টা করে দেখতে পারেন। সর্দার পটেলকে নিয়ে মোদীর আবেগ থাকলে, সুভাষচন্দ্রের জন্যও আমরা এটুকু করতে পারি। শুধুমাত্র তাঁর মৃত্যুরহস্যে খেই হারিয়ে ফেললে হবে না।
বঙ্গবাসী কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক