সূচনা বামফ্রন্ট আমলে। সারা জীবনের সঞ্চয় একত্র করিয়া নিজের বাড়ি বানাইতে উদ্গ্রীব স্বল্প ও মধ্যবিত্ত গৃহস্থদের ইমারতি দ্রব্য অর্থাৎ ইট, বালি, পাথরকুচি, লোহার রড, সিমেন্ট ইত্যাদি সরবরাহে নিযুক্ত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের হাত ধরিয়া। কালক্রমে ছোট ব্যবসায়ীরা বড় হইতে থাকে। এক চিলতে জমিতে গৃহস্থের নিজস্ব বাসস্থানের জায়গায় বহুতল অট্টালিকা উঠিতে থাকে। ইমারতি সরঞ্জাম সরবরাহকারীরাও সংঘবদ্ধ হইতে থাকেন। এই সংঘবদ্ধতাই ‘সিন্ডিকেট’ নাম লইয়া ফুলিতে ও ফাঁপিতে থাকে। ক্রমে প্রয়োজন হয় গুণ্ডা বা সমাজবিরোধী পোষার। ক্রমে রাজনীতির পৃষ্ঠপোষণ আসে। সমাজবিরোধী, ত্রাস সৃষ্টিকারী সংগঠন সর্বব্যাপী, সর্বগ্রাসী হয়, পুলিশ যাহাদের কেশাগ্রও স্পর্শ করিতে পারে না এবং যাহাদের স্থির করিয়া দেওয়া দরে ও গুণমানে ইমারতি দ্রব্যাদি ক্রয় না করিলে এলাকায় কোনও গৃহনির্মাণ প্রকল্পের রূপায়ণ অসম্ভব হইয়া পড়ে।
বামফ্রন্ট সরকার দীর্ঘ কাল এই অনৈতিক ও বেআইনি জবরদস্তির দিকে চোখ বুজিয়া থাকিয়াছে। কারণ এই সিন্ডিকেট দলীয় প্রয়োজন মিটাইয়াছে। এই প্রয়োজনভিত্তিক আনুগত্যের পরিণতি অবধারিত— শাসনক্ষমতা বামফ্রন্ট হইতে তৃণমূল কংগ্রেসের হাতে অন্তরিত হওয়া মাত্র সিন্ডিকেটের আনুগত্যও পরিবর্তিত শাসক দলের প্রতি ঘুরিয়া যায়। আবার একই কারণে শাসক দলের বিবিধ উপগোষ্ঠীর মধ্যেও লড়াই চলে। অনুমান করিবার যথেষ্ট কারণ আছে, ইহা বখরার লড়াই। এবং, যখন এই বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, তখন তৃণমূল কংগ্রেসের মহাসচিব রীতিমত সাংবাদিক বৈঠক করিয়া জানাইয়া দেন, সিন্ডিকেট সংক্রান্ত ঝামেলা তাঁহাদের দলের ‘নিজস্ব’ ব্যাপার, তাঁহারাই সামলাইয়া লইবেন, অন্যরা ইহাতে নাক গলাইতেছে কেন? দলের মহাসচিব এবং রাজ্যের নবনিযুক্ত শিক্ষামন্ত্রীর এই বক্তব্য শুনিলে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের নাটকের জাহানারা নির্ঘাত বলিতেন: ‘আবার বলি, চমৎকার’। প্রকাশ্যে ছুরি-বোমা-বন্দুক লইয়া দুই দল নওজওয়ান রাস্তায় দাপাইয়া বেড়াইবে, খুনোখুনি করিবে, আর সেটাকে মন্ত্রী-মহোদয় তাঁহার দলের নিজস্ব ব্যাপার বলিয়া সাফাই গাহিবেন— অবিশ্বাস্য বলিলে কম বলা হয়।
শুধু রাজারহাট-নিউ টাউনে সিন্ডিকেটের অত্যাচার চলিতেছে, এমনও নহে। যেখানেই আবাসন ও গৃহনির্মাণ শিল্প গড়িয়া উঠিতেছে, সেখানেই ইহাদের উপদ্রব। দৃষ্টান্ত আসানসোলের জামুড়িয়া, দৃষ্টান্ত উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি। সিন্ডিকেটগুলি কেবল যে গৃহস্বামী বা গৃহনির্মাতাদের স্বাধীনতা খর্ব করিয়া তাঁহাদের বেশি দামে নিকৃষ্ট মানের ও কম ওজনের ইমারতি সরঞ্জাম কিনিতে বাধ্য করিতেছে, তাহাই নয়, এলাকায় সমাজবিরোধীদের দৌরাত্ম্য এবং আগ্নেয়াস্ত্রের আমদানি করিয়া নাগরিক শান্তি বিঘ্নিত করিতেছে, আইনশৃঙ্খলার সমস্যাও সৃষ্টি করিতেছে। অথচ রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা থাকায় পুলিশ এই অসামাজিক ক্রিয়াকলাপ দমন করিতেও পারিতেছে না। বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সিন্ডিকেটের রমরমায় কার্যত আইনের শাসনই বিঘ্নিত হইতেছে। শাসক দলের মহাসচিব অতএব যাহাই বলুন, ইহা মোটেই তৃণমূল কংগ্রেসের নিজস্ব, অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। ইহার সহিত সরাসরি জড়িত আছে জনস্বার্থ, এলাকার শান্তিশৃঙ্খলা, সর্বোপরি নাগরিকদের পছন্দের অধিকার, নির্দিষ্ট কোনও সিন্ডিকেটের কাছ হইতে ইমারতি দ্রব্য না কেনার গণতান্ত্রিক অধিকার। বস্তুত, এই ধরনের জবরদস্তি এবং তাহা দমন করিতে প্রশাসনের সম্পূর্ণ অপারগতা পশ্চিমবঙ্গকে একটি কুশাসিত রাজ্য হিসাবেই চিহ্নিত করে। এই কুশাসন বর্তমান শাসকরা উত্তরাধিকার সূত্রে পাইয়াছেন এবং তাহাকে আরও উৎকট রূপ দান করিয়া চলিয়াছেন। ইহাই পশ্চিমবঙ্গের নিয়তি।