অশান্তি, সংঘর্ষ, হিংসা: সাম্প্রতিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান খবর। অশান্তির উত্স ফার্গুসন, মিসৌরি প্রদেশের একটি ছোট কৃষ্ণাঙ্গ-অধ্যুষিত শহর। সেই উত্স হইতে অশান্তি তীব্র বেগে সমস্ত দেশে ব্যাপ্ত হইবার জোগাড়। পূর্বে নিউইয়র্ক হইতে শুরু করিয়া পশ্চিমে ক্যালিফর্নিয়ায় মিছিলের ঢল: আগুন জ্বলিতেছে, কাচ ভাঙিতেছে, কাঁদানে গ্যাস, লাঠির তাণ্ডব। পুলিশ বনাম জনতা, বিশেষত কৃষ্ণাঙ্গ জনতার এই প্রবল দ্বৈরথ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অনেক দিন পর দেখিল। যেন ষাটের দশকের বর্ণবিদ্বেষ-বিরোধী আন্দোলনের উত্তপ্ত দিনগুলির প্রত্যাবর্তন। গত অগস্ট মাসে ফার্গুসনে নিরস্ত্র কিশোর মাইকেল ব্রাউনকে হত্যা করেন শ্বেতাঙ্গ পুলিশ ডারেন উইলসন। এই ঘটনার পর হইতেই অশান্তির আগুন ধিকিধিকি জ্বলিতেছিল। অবশেষে গ্র্যান্ড জুরির রায় বাহির হইতে আগুনে ঘৃতাহুতি। প্রেসিডেন্ট ওবামা সুখে নাই। দেশের শীর্ষতম পদে কালো প্রেসিডেন্টকে দুই-দুই বার নির্বাচন করিয়া যে দেশ ইতিহাস গড়িবার দৃষ্টান্ত রাখিয়াছে, তাহার সংঘর্ষময় চেহারা প্রকাশিত হইয়া পড়ায় উদার প্রগতিবাদী সমাজটি বিপর্যস্ত। ১৯৬৪ সালে বর্ণবিদ্বেষবিরোধী আইন পাশ হইবার পর অর্ধশতক কাটিয়া গিয়াছে। কিন্তু এখনও সেখানে কালো মানুষের উপর ঘৃণ্যতম অপরাধ সংঘটিত হয়। সেই অপরাধের বিচারের নামে প্রহসন অনুষ্ঠিত হয়।
অন্তত গ্র্যান্ড জুরি-র রায়ের পর তেমনই বলা হইতেছে। শ্বেতাঙ্গ অপরাধী পুলিশ অফিসার নির্দোষ ঘোষিত হইয়াছেন। নিহত কৃষ্ণাঙ্গ মাইকেল ব্রাউনই যে অন্যায়কারী এবং তাহার হত্যা যে অন্যায়ের প্রতিরোধ হিসাবেই জরুরি ছিল, ঠারেঠোরে এমন ইঙ্গিতও করা হইয়াছে। কেবল কালো সমাজে নয়, বহুসংস্কৃতি-অধ্যুষিত মার্কিন দেশের কোণে কোণে প্রশ্ন, কী করিয়া ফার্গুসনের মতো আশি শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ-অধ্যুষিত জায়গায় পুলিশ বাহিনীতে কালোরা প্রায় অনুপস্থিত? কোন যুক্তিতে সেখানে বারো জন জুরির মধ্যে নয় জন সাদা, কালো মাত্র তিন জন? ব্রাউন হত্যা অবধি যাইবার দরকার কী, এই প্রকট অসাম্যই তো বলিয়া দেয়, ‘বড়’ আমেরিকার আধুনিকতা ও প্রগতির মহিমা ও আড়ম্বরের আড়ালে ‘ছোট’ আমেরিকার অপার পশ্চাত্পদতার বিচরণভূমিটি পাঁচ দশকেও পাল্টায় নাই। এই হত্যাকাণ্ডের ফলে ফার্গুসনের মতো শহরতলির প্রতি বহির্জগতের দৃষ্টি পড়িল, ‘বড়’ আমেরিকা নড়িয়া বসিল। ঘটনাটি না ঘটিলে তো দৈনন্দিনতার আড়ালেই থাকিয়া যাইত মধ্য-দক্ষিণী প্রদেশগুলির এই ছোটখাটো বাস্তব।
আরও অনেকেই অবশ্য নড়িয়া বসিতেছেন। মস্কোয় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও। তাঁহার দেশের মানবাধিকারের কমতি লইয়া আমেরিকা ও অন্যান্য পশ্চিমি দেশ কম গলাবাজি করে না। ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণ ও মানবাধিকার ভঙ্গের ঘটনা লইয়া ঠিক এক বত্সর আগেই ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে মার্কিন-ব্রিটিশ সমর্থনে ‘ময়দান’ আন্দোলন চলিতেছিল। ফার্গুসন এ বার পুতিনকে পাল্টা মুচকি হাসির সুযোগ করিয়া দিয়াছে, সাম্প্রতিক পরিস্থিতিকে ‘ওবামার ময়দান’ বলিবার সুযোগ দিয়াছে। মার্কিন বিচারের ইতিহাসে নব্বইয়ের দশকে আর-এক কৃষ্ণাঙ্গ রডনি কিং হত্যা মামলায় অভিযুক্ত চার জনের দুই জন শাস্তি পাইয়াছিলেন, দুই জনকে শাস্তি দেওয়া যায় নাই। সেই ঘটনা মার্কিন বিচার-ইতিহাসের বড় কলঙ্ক হিসাবে পরিচিত। ব্রাউন-হত্যাকাণ্ড কি কিং-হত্যার ইতিহাসকেও ছাপাইয়া যাইবে?