মা য়ামি বিশ্ববিদ্যালয়ে নাস্তিক্য পড়াইবার জন্য একটি অধ্যাপকের আসন সৃষ্টি করা হইল। পূর্ণ পাঠ্যক্রমটির নাম দেওয়া হইয়াছে: ‘নাস্তিকতা, মানবতাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষ নীতিবিদ্যা’। বহু বৎসর ধরিয়া পরিকল্পনা হইতেছিল আসনটি প্রতিষ্ঠার, এক ধনী নাস্তিক অনুদান দিতে প্রস্তুত ছিলেন, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহস হইতেছিল না সরাসরি ‘নাস্তিকতা’ শব্দটি ব্যবহারের। অথচ দাতার শর্তই ছিল, ইহা ব্যবহার করিতেই হইবে, কারণ তিনি নাস্তিকদের প্রতি সমাজের বৈষম্যমূলক আচরণ কমাইবার জন্যই এই অর্থ প্রদান করিতেছেন। আমেরিকায় নাস্তিকের সংখ্যা ক্রমশ বাড়িতেছে, একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০০৭ সালে নাস্তিকরা ছিলেন মার্কিন জনসংখ্যার ১৬%, ২০১৪ সালে তাহা বাড়িয়া হইয়াছে ২৩%, আর তরুণতরুণীদের ৩৫%-ই নাস্তিক, বা অজ্ঞেয়বাদী, বা ধর্ম লইয়া আদৌ উৎসাহী নহেন। অবিশ্বাসীরা ওয়াশিংটনে ‘যুক্তি মিছিল’ সংগঠিত করিবার চেষ্টাও করিতেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলিয়াছেন, নূতন আসনটি লইয়া অহেতুক উত্তেজিত হইয়া উঠিবার কোনও কারণ নাই, ঈশ্বরের ধারণা ব্যতীত চতুষ্পার্শ্বের পৃথিবীকে ব্যাখ্যা করিবার প্রয়াস বহু দিন ধরিয়াই চলিতেছে, ইহা তাহার বিন্যস্ত গবেষণা মাত্র, ইহা নাস্তিকতা প্রচারের যন্ত্র নহে। আবার অনেক পণ্ডিত উৎফুল্ল হইয়া বলিতেছেন, ধার্মিকতার সহিত নীতিনিষ্ঠতা গুলাইয়া ফেলিবার যে ঐতিহ্য রহিয়াছে, ইহা তাহাকে ভাঙিতে সক্ষম হইবে। অবশ্য, নিন্দুকে বলিতে পারেন, ভাঙিবার আগ্রাসী আকাঙ্ক্ষা থাকিলে কেহ নাস্তিকতার ঝাঁঝ কমাইতে সঙ্গে ‘মানবতাবাদ’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ জুড়িয়া দেয় না।
নাস্তিকতাকে কেবল নাস্তি-তে সীমাবদ্ধ না রাখিয়া, তাহার এক সুসংবদ্ধ ইতিহাস পড়িবার অভ্যাস ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে তৈয়ারি করিলে, নূতন ব্যাপার হইবে, সন্দেহ নাই। নাস্তিকতাকে অধিকাংশ সমাজে ও কালে মহাপাপ বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছে। তার্কিক, যুক্তিনিষ্ঠ, নাস্তিককে পরজন্মে শৃগাল হইয়া জন্মাইতে হইয়াছে, মহাভারতে এমন আখ্যান পাওয়া যায়। ধর্মশাস্ত্রগুলিতে স্বাভাবিক ভাবেই নাস্তিকদের ভয়াবহ শাস্তির কথা বলা হইয়াছে। অধিকাংশ মানুষ সমাজপতি ও ধর্মগুরুদের কথা অন্ধ ভাবে বিশ্বাস করিয়া চলে, প্রথাশান্ত অঞ্চলে অস্বস্তিকর প্রশ্নকর্তাকে কেহই ভাল চোখে দেখে না, তাই নাস্তিকদের প্রতি গোষ্ঠীর দ্বেষও বোধগম্য। কিন্তু ইহাও সত্য, যে কোনও দেশে কালে নাস্তিকতার অস্তিত্ব রহিয়াছে, প্রাচীন ভারতে চার্বাকপন্থী, লোকায়ত, বার্হস্পত্যপন্থী মানুষেরা বেদের গ্রহণযোগ্যতা লইয়া প্রশ্ন তুলিয়াছেন। প্রাচীন গ্রিসে আদি নাস্তিক এপিকিউরাস প্রশ্ন করিয়াছেন, ঈশ্বর যদি আছেন, তিনি পৃথিবীর অন্যায়গুলি থামাইতেছেন না কেন? তিনি অক্ষম হইলে ‘সর্বশক্তিমান’ নহেন, অনিচ্ছুক হইলে ‘মঙ্গলময়’ নহেন, অনিচ্ছুক এবং অক্ষম হইলে— ঈশ্বর নহেন। আধুনিক পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ অবশ্য কেবল কিছু ধর্মীয় অনুষ্ঠান যান্ত্রিক ভাবে পালন করিয়া চলেন, ঈশ্বর লইয়া মাথা ঘামাইবার বিশেষ সময় ও শখ অধিকাংশেরই নাই। ইঁহাদের বলা যাইতে পারে: উদাসীন। নাস্তিককে ইঁহাদের সহিত গুলাইয়া ফেলিলে চলিবে না, তিনি প্রবল সাধনা ও মনোযোগের সহিত সতত প্রমাণ করিতে সচেষ্ট যে ঈশ্বরের অস্তিত্ব কদাপি নাই। ঈশ্বর বিষয়ে গভীর ভাবনা ও আলোচনার সমান বয়সি এই নাস্তিকতার নিবিড় বিবরণ লইয়া পঠনপাঠন শুরু হইলে, ইহাও প্রতিভাত হইতে পারে: নাস্তিকতাও এক ধর্ম।