এমন কাণ্ড বুঝি কেবল বিজ্ঞানে সম্ভব। গত বৎসর ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি দুই কৃত্রিম উপগ্রহ মহাকাশে প্রেরণ করিয়াছিল রুশ সয়ুজ রকেটের সাহায্যে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, উপগ্রহ দুইটির বৃত্তাকার কক্ষপথে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করিবার কথা ছিল। রকেট ভুলক্রমে উহাদের উপবৃত্তাকার কক্ষপথে প্রেরণ করে। ফলে উপগ্রহ দুইটি নির্ধারিত দায়িত্ব পালনের অযোগ্য বিবেচিত হয়। কিন্তু উদ্দিষ্ট কার্যে নিযুক্ত না হইলেও দুই উপগ্রহ এক বিশেষ প্রয়োজনে ব্যবহৃত হইবে। আলবার্ট আইনস্টাইন আবিষ্কৃত জেনারেল থিয়োরি অব রিলেটিভিটি কত দূর নির্ভুল, তাহা পরীক্ষা করিবে দুই উপগ্রহ। ওই তত্ত্ব মহকর্ষকে ব্যাখ্যা করে নূতন ভাবে। আইজ্যাক নিউটন বলিয়াছিলেন, মহাকর্ষ দুই বস্তুর মধ্যে ক্রিয়াশীল আকর্ষণ বল। আইনস্টাইনের তত্ত্ব অনুযায়ী, মহাকর্ষ আকর্ষণ বল নহে, স্থান ও কালের জ্যামিতি বদলের খেলা। নিউটন ভাবিয়াছিলেন সময় সর্বত্র সমান বেগে বহমান। আইনস্টাইন দেখাইয়া দেন সময়ের মাপদণ্ডটি স্থির নহে। অর্থাৎ, সময় সর্বত্র সমবেগে বহমান নহে। ভারী বস্তুর নিকটে সময় ধীরগামী, দূরে দ্রুতগামী। উপবৃত্তাকার পথে ভ্রাম্যমাণ দুই উপগ্রহ যেহেতু এক বার পৃথিবীর খুব কাছে, এক বার খুব দূরে যাইবে, সেহেতু উহাদের মধ্যে রক্ষিত ঘড়িতে দূরত্বের তারতম্য হেতু সময়ের গতির পার্থক্য ধরা পড়িবে। জেনারেল থিয়োরি অব রিলেটিভিটি আইনস্টাইন আবিষ্কার করিয়াছিলেন ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে। প্রায়-পরিত্যক্ত উপগ্রহে বিশেষ পরীক্ষা ওই তত্ত্বের শতবর্ষপূর্তিতে আলাদা মাত্রা দান করিয়াছে।
তৎসঙ্গে উদ্ভাসিত হইয়াছে বিজ্ঞানের বিশেষ দিক। বিজ্ঞান যে চূড়ান্ত দাবি কিংবা প্রশ্নোর্ধ্ব জ্ঞান নহে, বরং সতত সংশয় আর সংশোধনের উপযোগী উপস্থাপনা, তাহাই প্রমাণিত হইতেছে। ভারী বস্তুর নিকটে এবং দূরে সময়ের গতির তারতম্য ইতিপূর্বে পরীক্ষিত। তবু বিজ্ঞানীরা চাহেন সূক্ষ্মতর পরীক্ষা, জানিতে চাহেন কত দূর নির্ভুল আইনস্টাইনের তত্ত্ব। আজিকার পৃথিবীতে চতুস্পার্শ্বে মৌলবাদের সদম্ভ বিচরণের পাশে বিজ্ঞানের এই বিনম্র আচরণ সম্ভ্রম উদ্রেক করে। মৌলবাদ যদি বিজ্ঞান হইতে শিক্ষা লইত, যদি মানিত সে যাহাকে চূড়ান্ত সত্য জ্ঞান করে, তাহা নিছকই দাবি, সুতরাং পাল্টা যুক্তির আলোকে সংশোধনযোগ্য, তাহা হইলে পৃথিবী এত সমস্যাকীর্ণ হইত না। মৌলবাদ কেন যে সর্বদা পশ্চাদগামী, আর বিজ্ঞান সতত অগ্রসরমাণ, তাহা ওই দুইয়ের দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রমাণ হয়।
বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গির উজ্জ্বল প্রমাণ স্বয়ং আইনস্টাইন। তিনি অলোকসামান্য প্রতিভার অধিকারী, কিন্তু তিনিও সর্বদা সত্যের সন্ধান দিতে পারেন নাই। স্বীয় দর্শনে অত্যধিক আস্থা স্থাপনের নিমিত্ত একাধিক বার প্রজ্ঞাভ্রষ্ট হইয়াছেন। যেমন, তাঁহার আবিষ্কৃত ফর্মুলায় ইঙ্গিত থাকিলেও আইনস্টাইন বুঝিতে পারেন নাই যে, বহু পূর্বে এক মহাবিস্ফোরণে এই ব্রহ্মাণ্ডের জন্ম হইয়াছিল। ব্ল্যাক হোল যে বাস্তবে সম্ভব, তাহাও তিনি বুঝিতে পারেন নাই। সমালোচকদের মতে আইনস্টাইনের সর্ববৃহৎ ত্রুটি: অণু-পরমাণুর আচরণ ব্যাখ্যার শাস্ত্র বা কোয়ান্টাম মেকানিক্স তিনি মানিতে পারেন নাই। এই যুক্তিতে যে, কণা-রাজ্যে কোনও ঘটনা ঘটিবার নিশ্চয়তা নাই, কেবল আছে ঘটিবার সম্ভাবনা। গ্রহ-নক্ষত্র আজ কোথায় আছে জানা থাকিলে বলা যায় কাল উহারা কোথায় থাকিবে। কণাদের ক্ষেত্রে এরূপ পূর্বাভাস যে অসম্ভব, তাহা আইনস্টাইন মানিতে পারেন নাই। তথাপি তিনি মগ্ন ছিলেন সেই অদ্বিতীয় নিয়মের সন্ধানে, যাহা চালনা করে গ্রহ-নক্ষত্র এবং অণু-পরমাণু সব কিছুকে। তিন দশকের চেষ্টা সত্ত্বেও সে নিয়ম আবিষ্কারে তিনি সফল হন নাই। তাঁহার উত্তরসূরিরা আজ তাহার সন্ধানে রত। আইনস্টাইনের ব্যর্থতায় তাঁহারা বিচলিত নহেন। হইবেনই বা কেন, বিজ্ঞান যে স্থবির নহে, ক্লান্তিহীন যাত্রী।
য ৎ কি ঞ্চি ৎ
জেতার জন্যে খেলা— তাই পিচটাকে ইচ্ছেমত কুৎসিত করব: বুক ফুলিয়ে বলছেন ভারতীয় ক্রিকেট ক্যাপ্টেন। উপায়টাকে নিয়ে মাথা ঘামাবার দরকার নেই, লক্ষ্যটাই আসল— এ প্রবণতায় যুগে যুগে নীতিহীনতা ও অসভ্যতার গন্ধ ছাড়ে। এই যুক্তিতেই অসাধু ব্যবসায়ী খাদ্যে ভেজাল দেয়, প্রফিট-টাই তো আসল! খেলার সৌন্দর্য নিয়ে হেলদোল নেই, প্রতিযোগিতার স্পিরিট নষ্ট হল কি না থোড়াই কেয়ার, শুধু ট্রফি তুলে হুররে, তুমি খেলোয়াড় না জাত-খোয়ানো জেতোয়াড়?