Advertisement
E-Paper

বইয়ের পাঠক কি তবে হারিয়ে যাওয়া কোনও উপজাতি

আসলে পাঠক নই, তবু ভাবি পাঠক, এ-ও এক মিথ। লিখছেন জয়ন্ত ঘোষালআসলে পাঠক নই, তবু ভাবি পাঠক, এ-ও এক মিথ। লিখছেন জয়ন্ত ঘোষাল

শেষ আপডেট: ১৮ নভেম্বর ২০১৫ ০২:০০

বইপাড়া বাড়ছে না কমছে?

সরাসরি জবাব দিতে পারব না। এ ব্যাপারে কোনও সমীক্ষা-গবেষণালব্ধ রিপোর্ট আমার কাছে নেই। সে দিন দিল্লির খান মার্কেটের প্রাচীন বইয়ের দোকান বাহারি সন্‌সের কর্ণধার অনুজ বলেছিলেন, একটা সময় ছিল, বইয়ের সব চেয়ে বড় বাজার ছিল কলকাতা। তখন আমরা ঘন ঘন কলকাতা যেতাম। এখন বইয়ের সবচেয়ে বড় বাজার কিন্তু দিল্লি। তার পর মুম্বই, এমনকী, তার পর চেন্নাই। কলকাতায় বই বিক্রি তারও পরে।

এমনিতেই বই পড়ার অভ্যাস কমছে এমন অনুযোগ শুনছি অনেক দিন থেকেই। টেলিভিশন, সোশ্যাল মিডিয়া, ইউটিউব, কমিক স্ট্রিপ ও অ্যানিমেশন বই পড়ার চেয়ে অনেক বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।

Advertisement

এখন শুনছি, বইয়ের ব্যবসাতেও কলকাতা পিছিয়ে পড়েছে। অথচ, পশ্চিমবঙ্গে সাক্ষরতার গড় হার এখনও অনেক বেশি। ভারতের সমস্ত রাজ্যের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ ও কেরল এখনও সাক্ষরতায় শতকরা হারের প্রশ্নে শীর্ষে। কলকাতার বইমেলা আজও খুব জনপ্রিয়, তবু কেন অনুযোগ, বইয়ের ব্যবসায় বাঙালি পিছিয়ে পড়ছে? তবে কি এ শুধুই ইংরেজি বইয়ের ব্যবসা? বাঙালি কি বাংলা বই বেশি পড়ে? তাই ইংরেজি বইয়ের ব্যবসা কম হচ্ছে?


প্রগতি ময়দানে দিল্লি বইমেলা

বইকে যে ভালবাসে এবং বই পড়ে সেই মানুষটিও কি একই রকম এক উপভোক্তা, ঠিক যে ভাবে এক জন জামা-জুতো লিপস্টিক কেনে? সম্প্রতি দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস বুক রিভিউয়-এর থেকে সংগৃহীত নির্বাচিত রচনার এক অসাধারণ সঙ্কলন হাতে এল। বইটির নাম ‘বাই দ্য বুক’। বইটিতে পৃথিবীর বিভিন্ন বিশিষ্ট লেখক ও সাহিত্যিকের সাক্ষাৎকার আছে বই পড়া নিয়ে। সে সব সাক্ষাৎকার পড়লে বোঝা যায় মানুষ কিন্তু এখনও খুব বেশি ঘটমান দুনিয়ার বাসিন্দা। তাই এ হল ব্রেকিং নিউজের যুগ। ফলে সংবাদপত্রে বা সংবাদমাধ্যমের যে ঘটনা এখন দেশে-বিদেশে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে মানুষ বই পড়ার সময় সেই ‘টপিক্যালিটি’-কে বিশেষ ভাবে মাথায় রেখে চলেছে। ফলে প্যারিসের সন্ত্রাস নিয়েই এখন মানুষ চাইছে, এ ব্যাপারে বই প্রকাশিত হোক। আইএসআইএস নামক সংগঠনটি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। আইএসআই-এর সঙ্গে এই সংস্থার সম্পর্ক কতটা ঘনিষ্ঠ এ সবই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ ব্যাপারে বই লিখলেই সেটা হয়ে যাবে বেস্ট সেলার। খবরের মতো বইকেও এখন ভাবতে হয় টাইমিং। সবাই তো কিশোর কুমারের মতো অলটাইম ফেভারিট হয় না।

‘বাই দ্য বুক’ গ্রন্থটিতে লেখিকা Donna Tartt এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তিনি কখনওই one book at a time person নন। তিনি এক সঙ্গে অনেকগুলো বই পড়তে ভালবাসেন। এ জন্য ভ্রমণ করার সময় তাঁর সুটকেশ খুবই ভারী হয়ে যায়। উপন্যাস লেখার বিশেষ মজা কী, জিগ্যেস করলে তিনি বলেন, এক বিকল্প জীবন দেওয়াই লেখিকার কাজ। আমার মনে হয় শুধু লেখকই নন, এক জন পাঠকও সেই রচনার মধ্যে এক বিকল্প জীবন খুঁজে পান। তার পর সেই বিকল্প জীবনের মধ্যে নিজেকে নিজেই হারিয়ে ফেলেন। আমেরিকায় আজ থেকে ১৫-২০ বছর আগেও দেখেছি রাস্তায় রাস্তায় বার্নস অ্যান্ড নোবেলস বা এ ধরনের বহু বইয়ের দোকান। দোকানের চেন। দোতলা কাচের বাড়ি। বাড়ি ভর্তি বই। রাস্তা দিয়ে সে সব বই দেখতেও কী ভাল লাগত। আজকাল গেলে রাস্তার ধারে সে সব বইয়ের দোকান দেখাই যায় না।। মলে বা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের এক কোণে ওষুধের মতো কিছু বই থাকে। বইয়ের দোকান উঠে গিয়েছে বলব না, কিন্তু হয়ে উঠেছে অভিজাত এক বিষয়। আমজনতার বিষয় নয়। আবার কোন ধরনের বই সব চেয়ে বেশি সংখ্যক লোক পড়ে, আমেরিকার বইবিক্রেতাকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, সেল্ফ হেল্প, স্বাস্থ্য, যৌনতা এবং তার পর উপন্যাস। ঝুম্পা লাহিড়ীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে আপনি সেল্ফ হেল্পের বই পড়েন? তিনি জবাব দিয়েছিলেন, literature has always been and will forever be my only love of self-help.

দিল্লির দরিয়াগঞ্জে প্রতি রবিবার রাস্তার উপর ঢেলে পুরনো বই বিক্রি হত। আমি তো পুরনো বইয়ের গাদা থেকে এক বার মাইকেল মধুসূদনের ব্রজাঙ্গনা কাব্য (আড়াই আনা দাম লেখা) খুঁজে পেয়েছিলাম। সম্প্রতি এক রবিবার সেই দরিয়াগঞ্জে গিয়ে দেখলাম মূলত টেক্সট বই এবং পরীক্ষার বইয়েরই দাপট। দেখলাম, কিলো দরে লাভ স্টোরি বিক্রি হচ্ছে।

বুঝতে পারছি না, আমাদের সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের জন্য দায়ী কি আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা। লখনউ শহরে হজরতগঞ্জে এক প্রাচীন বইয়ের দোকানের নাম আডবাণী। আডবাণীর বাবা বইয়ের দোকানটি চালান। খুবই বাছাই লখনউ ও অবধের ইতিহাস ও সমসাময়িক প্রবন্ধের বইয়ের সঙ্কলন পাবেন সেখানে। এমনকী, অন্তরা দেবসেনের লিটল ম্যাগাজিনও পাওয়া যায় সেখানে। কিন্তু আডবাণীও বললেন যে, বই বিক্রির গুণগত মান বজায় রাখা আজ এক বড় চ্যালেঞ্জ।

আসলে বইয়ের পাঠক কি তবে এক হারিয়ে যাওয়া কোনও উপজাতির মতো হয়ে যাচ্ছে? শঙ্খ ঘোষের একটি বাক্যে সম্প্রতি আমি খুব মজা পেয়েছি, আমরা যে আদৌ পড়ছি না সেটাও আমরা অনেকেই জানি না। মানে, ভাবছি আমরা পড়ছি। বই-ও কিনি আমরা। যেমন ভাবে কিনি আরও অনেক ভোগ্যপণ্য। আসলে পাঠক নই, তবু ভাবি পাঠক, এ-ও এক মিথ। এ-ও এক ‘ভার্চুয়াল রিয়েলিটি।’

বইয়ের পাঠক— এটা এক বিচিত্র জাতিসত্ত্বা। কত পুরনো বই নতুন করে পড়ি, সময়ের হাত ধরে ভাললাগা ও ভালবাসা বদলায়, অনেক ভালবাসার বই আবার ভালবাসার জনকে, প্রিয়জনকে পড়াতে ইচ্ছে করে।

আর এ সবের মধ্যেও দিল্লি দরবারে দেখি বই বিক্রিরও আধিপত্য। বিশ্ব বইমেলা যেন এক মহাকাব্য। দিল্লির প্রগতি ময়দানের পাশে কলকাতা বইমেলা কি ছোট গল্প?


কলকাতার কলেজস্ট্রিট পাড়া

কিন্ডল বা অ্যামাজন কি বইয়ের দোকানো আসা বা বই কেনা কমিয়ে দিয়েছে? হয়তো সত্য। হয়তো নয়। হয়তো দু’টোই থেকে যাবে। যখন ফ্যাক্স মেশিন আসে তখন টেলিপ্রিন্টার অচল হয়ে যায়। এক স্টেশনারি দোকানের মালিক বলেছিলেন, তখন আমরা টেলিপ্রিন্টারের কাগজের রোল বিক্রি বন্ধ করে ফ্যাক্স রোল বিক্রি করতে শুরু করলাম। এখন কম্পিউটার প্রিন্টারের কাগজ বিক্রি করি। বাজার ও সময়ের দাবি হাত ধরাধরি করে চলবে। তাতে পাঠকের মৃত্যু হবে কেন? A Beautiful Mind-এর লেখক Sylvia Nasar বলছেন, ‘I love buying (cheap) first editions of books I use for research. I did not see the point of a kindle until my friend Trish Evans pointed out that I could carry the collected works of every nineteenth and early twentieth century writer with me, Being able to travel with an entire library is amazing.’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy