সংখ্যা সামান্য বস্তু নহে। দেখিতে ছোট হইলেও সংখ্যা-মাহাত্ম্য দেশ-মহাদেশের বর্তমান-ভবিষ্যৎ এক আঁচড়ে পাল্টাইয়া দিতে পারে। একান্ন আর ঊনপঞ্চাশের দূরত্ব যে কতখানি সুদূরপ্রসারী, ব্রেক্সিট তাহা চোখে আঙুল দিয়া দেখাইয়া দিল। একান্ন শতাংশ ব্রিটিশ নাগরিক ইউরোপীয় ইউনিয়ন হইতে বাহির হইয়া যাইতে চাহিয়াছেন বলিয়া, ঊনপঞ্চাশ শতাংশ, যাঁহারা বাহির হইতে চান নাই, তাঁহারা অপ্রাসঙ্গিক হইয়া বসিয়াছেন। প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরনকে পরিস্থিতির চাপে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পদত্যাগ করিতে হইয়াছে। অন্য উপায় ছিল না: শাসক কনজারভেটিভ পার্টি ইইউ-এ ব্রিটেনের ভবিষ্যতের প্রশ্নে দ্বন্দ্বদীর্ণ ছিল, একান্ন শতাংশের ঘায়ে সেই দলের ইইউ-পন্থীরা সম্পূর্ণ একঘরে হইয়া পড়িলেন। ২০১৫ সালে জাতীয় নির্বাচনে জিতিয়া আসিবার আগে দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক শিবিরের চাপে ডেভিড ক্যামেরন যখন গণভোটের প্রতিশ্রুতি দেন, তিনি হয়তো ভাবেন নাই যে সেই ভোটের কারণেই এক দিন এ ভাবে আসন ছাড়িতে হইবে। ১৯৬৭ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন তৈয়ারি হইবার পর ১৯৭৩ সালে ব্রিটেন সেই গোষ্ঠীতে যোগ দেয়। প্রায় সাড়ে চার দশকব্যাপী অন্তরঙ্গতা ছিন্ন হইবার পথে। ব্রিটেন তো বটেই, ইউরোপের অর্থনীতিও দ্রুত গভীর পরিবর্তনের মুখোমুখি হইবে বলিয়া আশঙ্কা। একটি গণভোটের ঘায়ে ইউরোপীয় রাজনীতি ও সমাজে বড় রকমের পরিবর্তনের এই সূচনা ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হইয়া রহিল।
বিচ্ছেদের পক্ষে ভোট মানেই বিচ্ছেদ ঘোষণা নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিচালন সম্পর্কিত লিসবন চুক্তির (২০০৭) ৫০ নম্বর অনুচ্ছেদের উপর ভিত্তি করিয়া ব্রিটেন প্রস্থানের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করিবার পরও বিচ্ছেদ-পদ্ধতিটি সম্পূর্ণ করিতে অন্তত দুই বৎসর লাগিবে। ফলে এই ভোটের ফল প্রত্যক্ষত টের পাইতে এখনও অনেক দিন বাকি। ব্রিটেনের পক্ষে সেই ফল কী দাঁড়াইবে, সে বিষয়ে ঐকমত্য নাই। ইউরোপের অভিবাসন ও উদ্বাস্তু সমস্যা হইতে ব্রিটেন কিছুটা ‘রেহাই’ পাইবে, তাহাই ছিল ব্রেক্সিট-এর অন্যতম উদ্দেশ্য। তবে ইউরোপীয় বাজারের সহিত দূরত্বের ফলে তাহার নিজের অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্ভাবনাও যথেষ্ট। পাউন্ড সাময়িক ভাবে দুর্বল হইবে। অর্থমন্ত্রী জর্জ অসবোর্ন এমনকী স্টক মার্কেট ট্রেডিং কিছু কাল বন্ধ রাখিবার প্রস্তাব করিয়াছেন। অর্থনৈতিক মন্দার সম্ভাবনাও অনেকে উড়াইয়া দিতেছেন না। পাশাপাশি, ইউরোপের নানা-সংস্কৃতিসমৃদ্ধ ঐতিহ্যের সুযোগ লইবার পরিস্থিতি যে ভাবে ব্রিটেনের হাতছাড়া হইল, তাহাতে ব্রিটিশ সমাজের নিজস্ব বুনটের স্থায়ী ক্ষতি হইতে পারে। ব্রেক্সিটের অভিঘাতে স্কটল্যান্ডে, এবং ক্রমে ওয়েল্স ও উত্তর আয়ার্ল্যান্ডেও সম্ভবত স্বাধীনতার দাবি ফের জোরদার হইবে। অর্থাৎ ইউরোপ হইতে বিচ্ছিন্ন হইবার অভিলাষী ‘ক্ষুদ্র’ ব্রিটেন ‘ক্ষুদ্রতর’ ইংল্যান্ডে পর্যবসিত হইবে, এমন আশঙ্কাকে অলীক বলা চলে না।
ইইউয়ের পক্ষে এই বিচ্ছেদ সুদূরপ্রসারী দুঃসংবাদ। ইতিমধ্যেই পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ইইউ-এর বিরুদ্ধ-জনমতে শান পড়িতেছে। নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স ইত্যাদি দেশে দক্ষিণপন্থী, অভিবাসনবিরোধী রাজনীতিকরা আস্ফালন জুড়িয়াছেন যে তাঁহাদেরও ব্রেক্সিটের তুল্য গণভোট চাই। বাস্তবিক, ইহা এখন একটি পুরাদস্তুর আন্দোলনে পর্যবসিত হইবার মুখে। অবশ্যই এমন আন্দোলন, যাহার কেন্দ্রে আছে জাতীয়তার স্বার্থ, এবং অপরাপর সংস্কৃতি-রাজনীতি-অর্থনীতি হইতে মুখ ফিরাইয়া লইবার প্রয়াস। এক অর্থে ইহা পরিচিতির রাজনীতির ধারার প্রবল বিকাশেরই আর একটি চিহ্নমাত্র। ইউরোপ এখন ক্রমশই ভিতরের দিকে মুখ ফিরাইয়া গুটাইয়া বসিবার উপক্রম করিতেছে। ব্রেক্সিট-ও আর এক প্রকার ‘ঘর ওয়াপসি’ ভিন্ন কিছু নয়।