Advertisement
E-Paper

ভিন্নতার নিধনযজ্ঞ

বাংলাদেশের একমাত্র সমকামিতা-মূলক পত্রিকার সম্পাদক ও তাঁহার সহকর্মী বন্ধু ঢাকায় আততায়ীর হাতে নিহত হইলেন। হত্যার দায় স্বীকার করিয়া আল কায়দা দলের পক্ষ হইতে জানানো হইল যে, অ-ইসলামিক জীবনযাপনের অপরাধে তাঁহাদের হত্যা করা হইল।

শেষ আপডেট: ২৮ এপ্রিল ২০১৬ ০০:০৫

বাংলাদেশের একমাত্র সমকামিতা-মূলক পত্রিকার সম্পাদক ও তাঁহার সহকর্মী বন্ধু ঢাকায় আততায়ীর হাতে নিহত হইলেন। হত্যার দায় স্বীকার করিয়া আল কায়দা দলের পক্ষ হইতে জানানো হইল যে, অ-ইসলামিক জীবনযাপনের অপরাধে তাঁহাদের হত্যা করা হইল। কয়েক দিন আগে রাজশািহ শহরে যে অধ্যাপক নিহত হইয়াছিলেন, তিনিও ব্লগার বা তথাকথিত ‘মুক্তমনা’ কট্টরবাদী ছিলেন না, তবে প্রচলিত ধর্মপালনে অবিশ্বাসী মুসলিম ছিলেন। তাঁহার ঘাতকরা জানাইয়াছে, ‘যথার্থ’ ইসলামি জীবনযাপন না করিবার অপরাধে তাঁহার প্রাণ গেল। দুইটি ঘটনার মধ্য দিয়া বাংলাদেশের সাম্প্রতিক যুক্তি-মুক্তি-বিরোধী সন্ত্রাস একটি অন্য তলে উন্নীত হইল। বার্তা আসিল: কেবল নাস্তিকতা কিংবা ধর্মবিরোধিতা নয়, ইসলামের মধ্যেও ভিন্ন মত ভিন্ন জীবনযাপনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জারি হইয়াছে। বাংলাদেশের অতি-ঘটনাবহুল ইতিহাসেও এমন সুস্পষ্ট বার্তা খুব বহুশ্রুত নয়। এ বার এই দেশকে বুঝিয়া লইতে হইবে, তাহারা নিজেদের সমাজ-সংস্কৃতির ভিতরের স্বাভাবিক ভিন্নতা রক্ষা করিতে ততটাই ইচ্ছুক কি না, যাহার দ্বারা আল কায়দা বা (সম্ভবত) ইসলামিক স্টেট-এর মতো মারাত্মক প্রতিপক্ষের বিরোধিতা করা সম্ভব। এই প্রেক্ষিতে ‘দেশ’ কথাটির অর্থ, দেশের শাসক সরকার, দেশের রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী, দেশের সাধারণ নাগরিক সমাজ, এবং দেশের প্রতিটি ব্যক্তি-নাগরিকের ব্যক্তিগত পরিসর। অত্যন্ত কঠিন লড়াই, সন্দেহ নাই। কিন্তু লড়াইয়ে জিতিতে হইলে সকল পক্ষকেই নিশ্চিত, নির্দ্বিধ পদক্ষেপণ করিতে হইবে, কোনও পক্ষই হাল ছাড়িলে চলিবে না। নতুবা, পরাজয় কেবল সময়ের অপেক্ষা।

এই লড়াই বাংলাদেশের বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত জরুরি। ধর্ম লইয়া হিংসা-কারবারের বিশ্বায়নের সঙ্গে বিস্মৃত হইয়াছে যে, ধর্ম মানে শুধু অন্ধ ধর্মাচার পালন নয়, ধর্ম মানে ধর্ম বিষয়ে এক প্রকার নিরপেক্ষতাও বটে। বিপরীতে, ধর্মনিরপেক্ষতা শুধু ধর্মবিরোধিতা নয়, ধর্ম সম্পর্কে শ্রদ্ধামিশ্রিত সহনশীলতাও হইতে পারে। বাংলাদেশে আজও এই অর্থে ধর্ম ও ধর্মনিরপেক্ষতার ধারাটি যথেষ্ট বেগবতী। অপরিসীম দুর্ভাবনার বিষয়, এই মুহূর্তে ধারাটি ক্রমশই গভীর বিপন্নতায় নিমজ্জিত হইতেছে। একে তো সুশিক্ষিত, সুশীলিত, বিবেকবান, মুক্তমনা নাগরিকরা নিহত হইতেছেন বলিয়া সন্ত্রাসের জয়ের ভারা ভরিয়া উঠিতেছে। তাহার উপর, কোনও ঘটনার পরই অপরাধী ধরা না পড়ায়, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গৃহীত না হওয়ায় অপরাধের জয় আরওই অবশ্যম্ভাবী দাঁড়াইতেছে।

এই দিক হইতে প্রধান দায়টি কিন্তু সরকারের। ধর্ম বা ধর্মনিরপেক্ষতা লইয়া না ভাবিয়া বরং সাধারণ আইনশৃঙ্খলাটুকু রক্ষার চেষ্টাটি তাঁহারা করুন। ‘যুক্তি-বুদ্ধির উপর আক্রমণ ঠেকাইবার উপায় বা শক্তি আমাদের নাই, তাই নাগরিকরাই যুক্তি-বুদ্ধি সামলাইয়া নিজ নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন’, সর্বত্র প্রকাশিত এই প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গি অন্যায়েরও অনেক বেশি। ইহা সর্বনাশা। গত কয়েক বৎসরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার নানা ক্ষেত্রে দৃঢ়চিত্ততা দেখাইয়াছে, বিরোধীহীন সংসদে তাহা দেখাইবার পরিস্থিতিও রহিয়াছে। অজুহাত দর্শাইবার জায়গা নাই। সহনশীল ইসলামের ধারাটি বাংলাদেশ হইতে চিরতরে মুছিয়া দিবার কৃতিত্বের অন্যতম দাবিদার হইতে না চাহিলে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি-অন্বিত দলটিকে নড়িয়া বসিতে হইবে। গত্যন্তর নাই।

Advertisement
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy