Advertisement
E-Paper

রাখেন মোদী মারে কে

বৃহস্পতিবার রাত্রে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এক সর্বভারতীয় নেতার জন্ম হইল। এমন এক নেতা, রাষ্ট্রযন্ত্রের নিষ্পেষণ যাঁহার সাহস বাড়াইয়া দিয়াছে। সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে চ্যালেঞ্জ ছুড়িয়া দিতেও যিনি ভীত নহেন।

শেষ আপডেট: ০৫ মার্চ ২০১৬ ০০:৪৩

বৃহস্পতিবার রাত্রে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এক সর্বভারতীয় নেতার জন্ম হইল। এমন এক নেতা, রাষ্ট্রযন্ত্রের নিষ্পেষণ যাঁহার সাহস বাড়াইয়া দিয়াছে। সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে চ্যালেঞ্জ ছুড়িয়া দিতেও যিনি ভীত নহেন। যিনি শাসকদের বিরুদ্ধে যুক্তির আঙুল তোলেন, যিনি বিরোধীদের ‘শত্রু’ বলিতে অসম্মত, তাঁহাদের সহিত আলোচনায় জড়াইতে চাহেন। এক মাস পূর্বেও যিনি ছিলেন এক সাধারণ ছাত্রনেতা, আজ সেই কানহাইয়া কুমার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রতিস্পর্ধী হইয়াছেন। এই উত্থান যাঁহার কারণে সম্ভব হইয়াছে, তাঁহার নাম নরেন্দ্র মোদী। ২০০২ সালে তিনি রাজধর্ম পালন করিতে পারেন নাই, ২০১৬ সালেও পারিলেন না। সঙ্ঘের হিন্দুত্ববাদী উগ্র জাতীয়তাবাদের নেশা সম্ভবত তাঁহাকেও আচ্ছন্ন করিল। অথবা, নিজের রাজনৈতিক কাণ্ডজ্ঞান বিষয়ে তিনি যতখানি আত্মবিশ্বাসী, কাণ্ডজ্ঞানটি সম্ভবত ততখানি মজবুত নহে। ‘মনরেগা’-র প্রশ্নে যেমন তিনি নিজের কথা গিলিতে বাধ্য হইয়াছেন, জেএনইউ-তেও তিনি প্রতিরোধের প্রাবল্য আঁচ করিতে পারেন নাই। তাঁহাদের বোধহীন দাপাদাপি যে দেশের ধর্মনিরপেক্ষ উদার শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিক ভাবে এতখানি উদ্বেল করিয়া তুলিবে, গোটা দেশ যে কার্যত দুই ভাগে ভাগ হইয়া যাইবে, তিনি বোঝেন নাই। জেএনইউ-তে তিনি রাজনৈতিক আত্মহত্যা করিলেন। তাঁহার অবিবেচনাই কানহাইয়া কুমারকে তাঁহার প্রত্যক্ষ প্রতিস্পর্ধী করিয়া তুলিল।

বস্তুত, আকবর রোড অথবা জনপথ হইতেও নরেন্দ্র মোদীর নিকট ধন্যবাদসূচক বার্তা আসিতে পারে। সনিয়া গাঁধী যাহা পারেন নাই, দলের আরও ৪২ জন সাংসদ যাহা পারেন নাই, নরেন্দ্র মোদী হেলায় সেই কাজটি করিলেন— তিনি রাহুল গাঁধীকে জননেতা বানাইলেন! পশ্চিমবঙ্গেও জেএনইউ-প্রশ্নে কংগ্রেস-সিপিআইএম হাত ধরাধরি করিয়া মিছিল করিয়া ফেলিল। যাহার কেহ নাই, তাহার নরেন্দ্র মোদী আছেন। যাঁহারা নিজেদের রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা হারাইয়াছিলেন, অথবা কখনও অর্জনই করিতে পারেন নাই, মোদী তাঁহাদের সেই গৌরব ফিরাইয়া দিলেন। এবং, সেখানেই থামিয়া থাকেন নাই। রাহুল, ইয়েচুরি, কেজরীবাল আদি নেতাদের নামে দেশদ্রোহিতার পাইকারি অভিযোগ ঠুকিয়া বিজেপি নিজেদের রাজনীতির অসারতা একেবারে খোলসা করিয়া দিল।

ইহাই সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিপদ। যে সরকারের যত লোকবল, তাহার পদস্খলনের সম্ভাবনাও তত। যে কারণে ইন্দিরা গাঁধী পথভ্রষ্ট হইয়াছিলেন, নরেন্দ্র মোদীও তাহারই শিকার। সংখ্যার দাপটে তাঁহারা গণতন্ত্রের শর্তগুলিকে অবজ্ঞা করিয়া বসেন। ভাবিয়া লন, যে কোনও বিরুদ্ধ মতের উপরই রোডরোলার চালাইয়া দেওয়া যায়। এই প্রবণতাই ছত্রভঙ্গ বিরোধী শক্তিকে কেলাসিত করে। ইন্দিরা গাঁধী না থাকিলে জয়প্রকাশ নারায়ণের পুনর্জন্ম হইত না, তাঁহার ‘সম্পূর্ণ ক্রান্তি’ও দিনের আলো দেখিত না। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সংখ্যাগরিষ্ঠতার দম্ভটিকে গোপন করিতে পারিলে নবান্নের সর্বোচ্চ তলটি সম্ভবত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অধরাই থাকিত। নরেন্দ্র মোদী একই ভুল করিলেন। সংখ্যাগরিষ্ঠতার বরাভয়ে তিনি ‘ঘর ওয়াপসি’-তে নীরব ছিলেন, দাদরি হত্যাকাণ্ড দেখিয়াও দেখেন নাই। রাজনাথ সিংহকে দাপাইতে দিয়াছেন, স্মৃতি ইরানিকে নিয়ন্ত্রণ করেন নাই। জেএনইউ-এ আসিয়া সকল ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটিল। রাজনীতির না়ড়ি বুঝিতে এমন ভুল শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতার অহঙ্কারে অন্ধ হইলেই করা সম্ভব। ইন্দিরা গাঁধী জয়প্রকাশ নারায়ণের জন্ম দিয়াছিলেন। নরেন্দ্র মোদী কানহাইয়া কুমারের। ‘বর্বর জয়ের উল্লাসে’ নিজের ঘরে মৃত্যু ডাকিয়া আনা এক প্রাচীন ব্যাধি।

Advertisement
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy